ভালো থাকুক গফুর চাচারা

রবিন শাহ | শুক্রবার , ১৩ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

সকালে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে যখন মেসের বাজারের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হলাম। তখন মোবাইলের ঘড়ির কাঁটায় নয়টা বাজে। আজ মেসে আমার বাজার। মাসে চার দিন প্রত্যেক সদস্যকে বাজার করতে হয়। তখনও আকাশের মাঝে সূর্যের কোনো দেখা সাক্ষাৎ নেই। কয়েক সাপ্তাহ যাবত ঢাকা শহরে ঠাণ্ডার অবস্থা নিদারুণ বলা যায়। শীতের মোটা কাপড় ছাড়া বাইরে বের হওয়া রীতিমতো অন্যায় বলা যায়। শীতের মোটা গেঞ্জি পরিধান করে যখন রামপুরা উলন বাজারের উদ্দেশ্যে মাছ কিনে রওনা করলাম। তখনি ষাটোর্ধ্ব এক লোককে দেখে চোখ আটকে যায়। জাগতিক কী কারণে জানি চোখকে সংবরণ করতে পারলাম না। হয়তো সেটা মানুষের প্রতি মানুষের আত্মিক ঠান বা অন্য কিছু। সালাম দিয়ে যখন চাচার পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা আপনার বাসা কোথায়? চাচা গায়ে পুরানো ময়লাযুক্ত কম্বল। শরীর থেকে কেমন বিদঘুটে একটা গন্ধ নাকে এসে লাগছে। তখন উনি বললেন, আজ এখানে তো আর ঐখানে। আমার প্রশ্নকাতুর মন ততক্ষণে চাচার বিষয়ে অনেক কিছু জেনে নেওয়ার সম্ভব হয়েছে। চাচার নাম গফুর মিয়া। স্থায়ী কোনো বসতি নেই। এই দুনিয়ার চাচার আপন বলতে কেউ নেই। পদ্মার পেটে নিজের যতটুকু বসতভিটা ছিলো ততটুকু হারিয়ে সর্বশান্ত। তিনবেলা আহারের সন্ধান না করতে পারায় বউ চলে গেছে। রাস্তায় রাস্তায় বোতল কুড়িয়ে বিকেলে বিক্রি করে যা পায় তা দিয়ে কোনোমতে একবেলা অথবা কোনোসময় দুইবেলা চালিয়ে নেয়। রাত হলে মাদুরের বিছানা বিছিয়ে রাস্তা ঘুমিয়ে পড়েন। এইভাবে শুরু হয় গফুর মিয়াদের প্রতিদিনের রুটিন। আমার বাজারের বিলম্ব হয়ে যাওয়ার কারণে গফুর চাচার কাছ থেকে দ্রুত প্রস্থান করতে হয়েছে। শুধু চাচার জন্যে আমার অবুঝ মন আহত হওয়ার ছাড়া কিছুই করার ছিলো না। চারদিকে ভিতরে বসে যখন লেখাটি লিখতে বসেছি। তখন বাহিরে গা কাঁপুনি দেওয়ার মতো ঠাণ্ডা। গফুরা চাচা হয়তো তখন রাস্তায় বোতলের সন্ধানে ছুটছে। নয়তো বোতল পরিমাণ মতো না পেয়ে মন খারাপ করে ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্যে ময়লা কম্বল গায়ে দিয়ে গামোড়া দিয়ে বসে আছে। গোটা বাংলাদেশে এমন সহস্র পরিমাণ গফুর চাচা রয়েছে। যাদের এই দুনিয়ায় আপন বলতে কেউ নেই। বাসায় গিয়ে স্ত্রীর হাতে রান্না খাওয়ার সৌভাগ্য এদের হয় না। বাসায় গিয়ে সন্তানের মুখে আব্বা ডাক শুনার মতো ললাট এদের হয় না। তবুও এরা বেঁচে আছে দু’মোটো আহারের সন্ধানে। এদের কোনোদিন শীত অনুভব হয় না। শত দুঃখকষ্টে থাকতে থাকতে ভুলেই গেছে দুঃখ কী জিনিস! শুধু জানে ভোর হলেই ছুটতে হবে বস্তা নিয়ে আহারের খোঁজে। ভালো থাকুক গফুর চাচারা। জীবন যেখানে যেমন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঈদ আনন্দে বঞ্চিতদের পাশে থাকা চাই
পরবর্তী নিবন্ধউপহার হিসেবে উত্তম বস্তু হলো বই