কায়িক শ্রম ছাড়াই ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভনে মিয়ানমারে গিয়ে নির্যাতনের শিকার আট বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মিয়ানমারের মায়ো সট এলাকার একটি ‘স্ক্যাম সেন্টার’ থেকে উদ্ধার পাওয়া এই আট বাংলাদেশি গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে বিমানের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরেছেন। অবতরণের পর সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের বিভিন্ন সহায়তা দিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক।
ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের মিয়ানমারে নিয়ে জিম্মি করে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে কাজ করানোর অভিযোগ উঠেছিল আগেই। ওই আট বাংলাদেশিকেও পাসপোর্ট ও মোবাইল কেড়ে নিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন করে সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হত।
ভুক্তভোগীদের পরিবারের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানায়, এদের কাউকে দুবাই, মালয়েশিয়া বা সরাসরি ঢাকা থেকে থাইল্যান্ডে কম্পিউটার সংক্রান্ত ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায়। এরপর থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা মায়ে সট হয়ে তাদের জোর করে মিয়ানমারে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বিদেশের মাটিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় এবং নির্যাতন করে নানা ধরনের সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হত। খবর বিডিনিউজের।
বৃহস্পতিবার মিয়ানমার থেকে ফিরে আসা আটজনের মধ্যে রয়েছেন লালমনিরহাটের মো. আব্দুল মালেক, হাবিবুর রহমান, ঢাকার রহিম বাদশা, খুলনার এসকে মিনহাজুল হোসেন, নরসিংদী মেহরাজ হাসান, ফরিদপুর রিয়াজ ফকির, গাজীপুর রিপন মিয়া এবং বান্দরবানের উলহাসায় মারমা।
তাদের মধ্যে মেহরাজ হাসান বলেন, ঢাকার বাসা থেকে দুবাই ও পরে থাইল্যান্ডে কম্পিউটার সংক্রান্ত কাজের প্রলোভনে যান তিনি। পরে তাকে মিয়ানমারে নিয়ে জোর করে দেড় বছরের চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়। প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফোন নম্বর সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে তাকে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া হত–যার মধ্যে ছিল রোদের মধ্যে মাঠে দৌড়ানো, ২০ লিটার ওজনের পানির পাত্র বহন করা এবং দীর্ঘ সময় অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা।
রিয়াজ ফকির বলেন, প্রথমে ট্যুরিস্ট ভিসায় থাইল্যান্ডে প্রবেশের পর তাকে মায়ে সট সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকেও একইভাবে জোর করে কাজের চুক্তিতে বাধ্য করা হয় এবং প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হত। মালয়েশিয়া প্রবাসী রিপন মিয়াও লোভে পড়ে উন্নত কাজের আশায় থাইল্যান্ডে যান। তিনি বলেন, থাইল্যান্ডে আসার পর তাকে মিয়ানমারে নিয়ে আটকে রাখা হয়। তার পাসপোর্ট ও মোবাইল কেড়ে নিয়ে জোর করে কাজের চুক্তিতে বাধ্য করা হয়।
মিনহাজুল হোসেন জানান, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে থাইল্যান্ডে আসার পর মায়ে সট এলাকায় আটকা পড়েন। এক বছরের চুক্তি শেষ হওয়ার পরও তাকে মুক্তি না দিয়ে দেশে ফেরার বিনিময়ে মোটা অংকের অর্থ দাবি করা হয়।
প্রত্যেকের নির্ধারিত কাজ ছিল মূলত ফেইসবুকের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর সংগ্রহ করা। এই টার্গেট পূরণে সামান্য ভুল বা ব্যর্থতা হলেই চলত চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ব্র্যাক জানায়, এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছিলেন। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় কম্পিউটার বা ইন্টারনেটে বিদেশে চাকরির বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ব্র্যাক।












