রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাইনি তোমায়।’ এই এক লাইনের ভেতরেই যেন মানুষের সারাজীবনের না বোঝার গল্প, দেরি করে উপলব্ধি করার যন্ত্রণা আর হাতের কাছ থেকে ফসকে যাওয়া ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস জমে আছে। মানুষ বড় অদ্ভুত। সে নিজের অনুভূতিকে নিজেই চিনতে পারে না। চায় কী, কাকে চায়, কেন চায়–এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই কখন যে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা পেরিয়ে যায়, সে টেরও পায় না। মানুষ সত্যিই খুব আনপ্রেডিকটেবল। কখনো সে সুতোর মতো জট পাকিয়ে যায়, কখনো কুয়াশার মতো অধরা হয়ে ওঠে। নিজের কাছেই সে ধাঁধা। যে মানুষটি সারাক্ষণ হাসে, সে হয়তো সবচেয়ে বেশি কাঁদে। যে মানুষটি খুব কম কথা বলে, তার ভেতরেই হয়তো সবচেয়ে বেশি কথা জমে থাকে। আর যে মানুষটি ভালোবাসার কথা উচ্চারণ করে না, তার বুকের ভেতরেই হয়তো সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা নিঃশব্দে বাসা বাঁধে।
ভালোবাসা খুব কম মানুষই প্রথম দেখায় চিনতে পারে। অধিকাংশ মানুষ ভালোবাসাকে চিনতে শেখে হারানোর পর। কেউ অভ্যাসকে ভালোবাসা ভেবে বসে, কেউ ভালোবাসাকে দায়িত্ব মনে করে ভয় পায়। আবার কেউ কেউ সামান্য মায়া, সামান্য যত্নকেই সারাজীবনের প্রতিশ্রুতি ভেবে নেয়। মানুষের সমস্যা এখানেই– সে অনুভূতির গভীরে যাওয়ার আগে তার ভবিষ্যৎ হিসাব করতে বসে।
একটা মেয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। জানে না কেন তাকিয়ে থাকে, শুধু জানে ওই সময়টায় ফোন না বাজলে বুকের ভেতর অদ্ভুত ফাঁকা লাগে। সে নিজেকে বোঝায়, এটা কিছু না। অভ্যাস মাত্র। কিন্তু কোনো একদিন ফোনটা আর আসে না। তখন সে বুঝতে পারে, অভ্যাস নয়–ওটা ছিল ভালোবাসা। কিন্তু তখন আর ফোন করার অধিকারটুকুও তার নেই।
মানুষ বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। কষ্ট পেলে মাথা নামিয়ে নেয়। ভাবে, বুঝি এটাই তার প্রাপ্য। যে মানুষটি তাকে সর্বস্ব দিতে চায়, যে বিনিময়ে কিছু না চেয়েই পাশে থাকতে চায়, তাকেই সে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করে। আর যে মানুষটি তাকে চায় না, যার চোখে তার কোনো মূল্য নেই, তাকেই সে বুকে পুষে রাখতে চায় গোটা জীবন।
মানুষের মন বড় নিষ্ঠুর। সে অনুপস্থিত মানুষের জন্য কাঁদে, উপস্থিত মানুষটিকে অবহেলা করে। যে প্রতিদিন খোঁজ নেয়, তার খোঁজ নেওয়াটাই একসময় বিরক্তিকর লাগে। আর যে মাসের পর মাস কোনো খবর দেয় না, তার একটি ছোট মেসেজেই বুকের ভেতর আলো জ্বলে ওঠে।
ভালোবাসা দিবস আসে। চারদিকে লাল রঙ, ফুল, চকলেট, হাসি, ছবি। মানুষ স্ট্যাটাস দেয়, ক্যাপশন লেখে, ভালোবাসার ঘোষণা দেয়। কিন্তু এই দিনটা অনেক মানুষের জন্য হিসাবের দিন। কী পেলাম, কী পাইনি–তার নীরব অঙ্ক কষার দিন।
অনেক মানুষ আছে, যারা ভালোবাসা দিবসে সবচেয়ে বেশি একা থাকে। তাদের হাতে কেউ গোলাপ দেয় না। কেউ চকলেট পাঠায় না। কিন্তু তাদের বুকের ভেতর ভালোবাসার অভাব নেই। বরং সেই ভালোবাসা এত বেশি, এত গভীর যে কাউকে দেওয়ার জায়গা খুঁজে পায় না। এতটুকু ভালো না বেসেও কেউ কেউ এক আকাশ সমান পাওয়া পেয়ে যায়। আবার এক সমুদ্র ভালোবেসেও কেউ কেউ একবিন্দুও পায় না। এই বৈষম্যের কোনো যুক্তি নেই। ভালোবাসা এখানে কোনো অঙ্ক মানে না, কোনো ন্যায্যতার ধার ধারে না। মানুষ জানে না কোথায় থামতে হবে। কতটা অপেক্ষা করলে অপেক্ষা সুন্দর থাকে, আর কতটা অপেক্ষা করলে সেটা নিজের অপমান হয়ে দাঁড়ায়–এই হিসাব সে রাখে না। সে জানে না ঠিক কখন কারো বুকে মাথা রেখে বলা মিথ্যে কথাগুলো আর বলা যাবে না। জানে না কোন এক বিকেলে কারো চোখে চোখ পড়লে, তারপর আর কোনোদিন একা বাড়ি ফেরা হবে না।
একটা ছেলে প্রতিদিন একই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরে, কারণ ওই রাস্তায় একটা পরিচিত জানালার আলো জ্বলে ওঠে সন্ধ্যেবেলা। সে নিজেকে বোঝায়, এটা কাকতাল নয়, সামান্যই একটা ব্যাপার। কিন্তু যেদিন সেই জানালার আলো আর জ্বলে না, সেদিন সে প্রথমবার বুঝতে পারে–কিছু আলো নিভে গেলে শহরটাও বদলে যায়।
ভালোবাসা বেশিরভাগ সময় খুব নীরবে আসে। কোনো গান বাজে না, কোনো ঘোষণা দেয় না। হঠাৎ করেই কেউ একজন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তার অনুপস্থিতি অস্বস্তি তৈরি করে, তার উপস্থিতি শান্তি দেয়। কিন্তু মানুষ তখনও বোঝে না। ভাবে, এটা সাময়িক। ভাবে, সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সময় সব ঠিক করে না। কিছু কিছু জিনিস সময়ের সাথে আরো জটিল হয়ে যায়। কিছু কিছু মানুষ দূরে সরে যায়। আর কিছু কিছু ভালোবাসা বোঝার আগেই হারিয়ে যায়। মানুষ ভাবে, সে পরে বলবে। পরে সময় দেবে। পরে গুরুত্ব দেবে। এখন না হয় অপেক্ষা করাই ভালো। এখন না হয় অন্য সবকিছু আগে সামলানো যাক। ভালোবাসা তো থাকবেই। কিন্তু ভালোবাসা অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সে একদিন কোনো অভিযোগ না করেই সরে যায়। কোনো বড় ঝগড়া হয় না। শুধু একদিন দেখা যায়, যাকে ছাড়া দিন শুরু হতো না, সে আর নেই। তখন মানুষ বুঝতে শুরু করে। বুঝতে পারে, যে মানুষটি সবসময় পাশে ছিল, সে আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যে ফোন কলগুলো বিরক্ত লাগতো, সেগুলোই এখন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। কিন্তু তখন বড় দেরি হয়ে যায়। ভালোবাসা সবসময় দ্বিতীয়বার সুযোগ দেয় না। কিছু মানুষ আর ফিরে আসে না। কিছু সম্পর্ক আর আগের জায়গায় দাঁড়াতে পারে না। যাকে ভালো লাগে, তাকে বলা উচিত। যার জন্য মন খারাপ হয়, তাকে জানানো উচিত। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বিশেষ দিনের দরকার নেই। কিন্তু দেরি হয়ে গেলে হাজার দিনেরও কোনো মূল্য থাকে না।
ভালোবাসা দিবস আসুক। প্রতিবছর। ফুল ফুটুক। মানুষ ভালোবাসুক। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন, মানুষ যেন সময় থাকতে ভালোবাসাকে চিনতে শেখে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক












