ভালোবাসা দিবস : আবেগ, দায়বদ্ধতা ও মানবিক পুনর্জাগরণের প্রতিচ্ছবি

শাহিদা জাহান | শনিবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ

বসন্তের মাতাল হাওয়ায় প্রকৃতি নতুন রঙে সাজে! কচি পাতার ভাঁজে ভাঁজে যখন জন্ম নেয় নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি। ঠিক তখনই ক্যালেন্ডারের পাতায় নীরবে এসে দাঁড়ায় ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবস। বসন্ত এলে প্রকৃতি যেমন নিজেকে নতুন করে চিনিয়ে দেয়, তেমনি ১৪ ফেব্রুয়ারি মানুষের বুকের ভেতরেও নড়ে ওঠে এক অদৃশ্য আলো, নবজন্মের স্পন্দন। মানুষের হৃদয়ে তার নাম ভালোবাসা। ফুলের রঙ, প্রতিশ্রুতির শব্দ আর আবেগের উচ্ছ্বাসে দিনটি বিশ্বজুড়ে এক উৎসবের আবহ তৈরি করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, ভালোবাসা কি সত্যিই একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো অনুভূতি, নাকি এটি মানুষের অস্তিত্বের গভীরে প্রবাহিত এক অনন্ত জীবনবোধ?

বর্তমান সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট, ডিজিটাল সংস্কৃতির আগ্রাসন এবং ভোগবাদী মানসিকতার চাপে ভালোবাসা দিবস যেন তার মৌলিক অর্থ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। আজ ভালোবাসা অনেক সময় লাল গোলাপ, দামি উপহার কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাজানো ছবির প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

করপোরেট সংস্কৃতি ভালোবাসাকে এমন এক বাণিজ্যিক মায়াজালে আবদ্ধ করেছে, যেখানে উপহারের মূল্য দিয়ে হৃদয়ের গভীরতা মাপার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে। অথচ ভালোবাসা কখনোই কোনো পণ্য নয়, এটি একটি দীর্ঘ আত্মিক সাধনা, যা সময়, ধৈর্য এবং নিঃস্বার্থতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

ভালোবাসা কি আদৌ কোনো পণ্যের নাম হতে পারে? যার দাম আছে, মেয়াদ আছে, আর ট্রেন্ড ফুরোলেই ফেলে দেওয়ার অধিকার আছে? না, ভালোবাসা কোনো করপোরেট কৌশল নয়। এটি সময় চায়, ধৈর্য চায়, চায় একে অপরকে বুঝে নেওয়ার সাহস। প্রিয় মানুষকে যেন চোখ বন্ধ করে বলতে পারে ভালোবাসি অনেক ভালোবাসি।

আমরা বাস করছি এক ‘ইনস্ট্যান্ট’ যুগেইনস্ট্যান্ট কফি, ইনস্ট্যান্ট আনন্দ, ইনস্ট্যান্ট প্রেম। একটি সোয়াইপে প্রেমের সম্পর্ক শুরু হয়, একটি ব্লকে শেষ। এই সহজলভ্যতার ভেতরেই ভালোবাসা তার গভীরতা হারায়, আমরা অপেক্ষা করতে ভুলে গেছি। ভুলে গেছিভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়, ভালোবাসা মানে টিকে থাকা। ভালোবাসা মানে সম্মান, শ্রদ্ধা।

ভালোবাসা দিবসে আমরা ছবি তুলি, হাসি সাজাই, ক্যাপশন লিখি। কিন্তু ক্যামেরার বাইরে অনেক ঘরে জমে থাকে নীরবতা, কষ্ট। একই ছাদের নিচে থেকেও দু’জন মানুষ হয়ে ওঠে দূর দ্বীপ। এই দূরত্ব কোনো পোস্টে ধরা পড়ে না। বুকের ভেতরে তার শব্দ খুব তীব্র।

ভালোবাসা কেবল প্রেমিকপ্রেমিকার গল্প নয়। এটি বাবামায়ের ক্লান্ত চোখের ভাষা, ভাইবোনের নীরব আগলে রাখা, বন্ধুর বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি সহমর্মিতাসবকিছু মিলেই ভালোবাসার পূর্ণতা তৈরি হয়। ভালোবাসা হলো সেই জায়গা, যেখানে ‘আমি’ ধীরে ধীরে ‘আমরা’ হয়ে ওঠে।

একটি সুস্থ সমাজ গঠনে ভালোবাসার ভূমিকা অপরিসীম। মানুষ নিঃস্বার্থভাবে অন্য মানুষকে ভালোবাসতে শেখে, তখন তার ভেতর থেকে ঘৃণা, হিংসা এবং অসহিষ্ণুতা দূর হয়ে যায়। তবু ভালোবাসার এই উৎসব সবার জন্য সমান নয়বিশেষ করে নারীর জন্য। নারীর ভালোবাসা আজও অনেক সময় আনন্দ নয়,একটি দায়িত্ব।

ভালোবাসার নামে নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহ, শাসনএসব যেন খুব স্বাভাবিক। ভালোবাসি বলেই বাধা দিই এই বাক্যের ভেতর লুকিয়ে থাকে একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল। আমরা হাত ধরে হাঁটার ছবি দেখি, কিন্তু সেই হাতের চাপ অনুভব করি না। যে চাপ নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত করে। আমরা গোলাপ দেখি, কিন্তু নারীর চোখের জল দেখি না, যে ভালোবাসার মানুষটির কাছেই সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত।

নারীর ভালোবাসা এখনো শর্তসাপেক্ষ। ভালোবাসতে হলে তাকে মানিয়ে নিতে হবে, চুপ থাকতে হবে, ভেঙে পড়লেও শক্ত থাকতে হবে। এই অসমতার ভেতরে দাঁড়িয়ে ভালোবাসা দিবস অনেক নারীর কাছে উৎসব নয়, একটি চাপ।

সত্যিকারের ভালোবাসা দিবস সেদিনই সম্ভব হবে, যেদিন ভালোবাসা মানে হবে নিরাপত্তা। যেদিন, না বলার অধিকার থাকবে ভয় ছাড়া, অপরাধবোধ ছাড়া। যেদিন ভালোবাসা মানে হবে দখল নয়সহযাত্রা।

আজকের সমাজে আরেকটি বড় সংকট হলো ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ সম্পর্ক। সামান্য ভুলেই সম্পর্ক বদলে ফেলা। অথচ ভালোবাসা মানে সবকিছু নিখুঁত হওয়া নয়। ভালোবাসা মানে ভাঙলে মেরামত করা, ক্ষমা করা, আবার নতুন করে গড়ার চেষ্টা করা। ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়ভালোবাসা দায়িত্ব।

ইংরেজি সাহিত্যের লেখক ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন, কেউ কেউ পুরোহিতের কাছে যায়, কেউ কবিতার কাছে, আমি যাই বন্ধুর কাছে। এই পৃথিবীতে মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান প্রয়োজন। পাশাপাশি সমাজে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও ভালোবাসা।

বন্ধুত্বের মায়ামমতা এত শক্তিশালী যে, প্রিয় বন্ধুর প্রয়োজনে কিংবা বন্ধুর জন্য নিজের প্রাণ বা জীবন দিতে দ্বিধা বোধ করে না। পক্ষান্তরে, যদি বন্ধুত্বের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়, তাহলে মানুষ প্রাণ দিতে দ্বিধা করে না।

বন্ধুত্ব এমন একটি পবিত্র সম্পর্ক যা পরম নির্ভরতা, সহযোগিতা ও ভালোবাসার মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত। এই পারস্পরিক বন্ধুত্ব, মায়ামমতা আল্লাহর এক অশেষ বিশেষ নিয়ামত। তবে এর যথার্থ বন্ধু নির্বাচন করা অনেক কঠিন।

পুরুষ ও নারীর মধ্যে বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হলেও তা প্রায়শই ভালোবাসায় পরিণত হয়। এটি বিয়ে, প্রেম বা কখনও কখনও পরকীয়ার আকার নেয়। আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা বলছে, বিপরীত লিঙ্গের সংস্পর্শে ছেলেদের হরমোনাল রেসপন্স তীব্র হয়। অর্থাৎ প্রাকৃতিকভাবে ছেলেমেয়ের মধ্যে আকর্ষণ তৈরি হয়। সত্যিকারের ভালোবাসা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন ভালোবাসা মানে হবে সম্মান, সমতা এবং সম্মতির সম্পর্ক, যখন একে অপরকে ভালোবাসবে ভয় ছাড়া, লজ্জা ছাড়া এবং শর্তের বেড়াজাল ছাড়া।

ভালোবাসা দিবসকে যদি সত্যিকার অর্থে অর্থবহ করতে হয়, তবে এটি কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের উৎসব নয়, বরং এটি হতে পারে মানবিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার দিন। এই দিনটি হতে পারে সমাজের একাকী মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর দিন, বৃদ্ধাশ্রম বা এতিমখানার নিঃসঙ্গ মুখগুলোতে হাসি ফোটানোর দিন, কিংবা যাদের জীবনে ভালোবাসার অভাব রয়েছে তাদের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার দিন। ভালোবাসা আসলে এক দীর্ঘ প্রতিশ্রুতির নাম, যেখানে সময়ের সাথে সাথে আবেগ পরিণত হয় দায়িত্বে, আকর্ষণ রূপ নেয় শ্রদ্ধায়, আর সম্পর্কের ভেতর জন্ম নেয় এক অদৃশ্য নিরাপত্তা। ভালোবাসা মানে কাউকে বদলে ফেলার চেষ্টা নয়, বরং তাকে তার স্বকীয়তা নিয়ে গ্রহণ করার ক্ষমতা।

ভালোবাসা দুর্বলতা নয়, বরং মানবতার সবচেয়ে আবেগময়, শক্তিশালী ভিত্তি। যদি আমরা ভালোবাসাকে কেবল ব্যক্তিগত সুখের গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে নিঃস্বার্থ, মানবিক এবং গঠনমূলক শক্তিতে রূপ দিতে পারি, তবে এই পৃথিবী আরও সুন্দর, সহনশীল এবং শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধ‘যতই দেখি তারে ততই দহি, আপন মনোজ্বালা নীরবে সহি’
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে