কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম উজানটিয়া লঞ্চঘাটের জেটিটি পুনর্নির্মাণ হয়নি সাড়ে সাত বছরেও। উজানটিয়ার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ করিয়ারদিয়া, মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইলে যাতায়াতে স্থানীয়রা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এছাড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাছ, কাঁকড়া, লবণ ও সবজি পরিবহনে ভোগান্তির শেষ নেই। এই ঘাটের ওপর নির্ভরশীল উজানটিয়ার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ করিয়ারদিয়া ও মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি দ্বীপের অন্তত ২০ হাজার মানুষ। প্রতিদিন যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবিকা–সবকিছুই যেন এই ভাঙা জেটি ঘাটের কাছে এসে থমকে যাচ্ছে।
পেকুয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের নভেম্বরে পাথরবাহী একটি বাল্কহেডের ধাক্কায় পশ্চিম উজানটিয়ার পাকা জেটিটি ধসে পড়ে। এরপর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবউল করিম বাল্কহেডটি আটক করে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেন। পরে সেই টাকা দিয়ে অস্থায়ী একটি কাঠের জেটি নির্মাণ করে দেন। ২০২২ সালের মাঝামাঝি অস্থায়ী সেই জেটিটিও ভেঙে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাকা জেটিঘাটটির একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিকল্প হিসেবে পাশে কাঠের একটি অস্থায়ী জেটি থাকলেও সেটি ঝুঁকিপূর্ণ। নৌকা ও ট্রলার নোঙর ২০ থেকে ৩০ ফুট দূরে ফেলতে হয়। যাত্রীদের হাঁটু সমান কাদা মাড়িয়ে জেটিতে উঠতে হয়। এ অবস্থায় পণ্য পরিবহন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। ফলে এলাকার উৎপাদিত চিংড়ি, লবণ ও কাঁকড়া নৌপথে পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয়রা জানান, উজানটিয়ার বেশিরভাগ মানুষ মহেশখালীর মাতারবাড়িতে শুষ্ক মৌসুমে লবণ ও বর্ষায় চিংড়ি চাষ করেন। কুতুবদিয়ার উৎপাদিত সবজি এই জেটি দিয়ে নামে। এরপর ট্রাকে ভরে চট্টগ্রাম আড়তে নেওয়া হয়। মাতারবাড়ির উত্তর অংশ, উজানটিয়ার পশ্চিম অংশ ও মগনামার দক্ষিণ অংশে উৎপাদিত লবণ এই জেটি দিয়ে ট্রলারে করে নারায়নগঞ্জ, ঝালকাঠি, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ঈদগাঁওর ইসলামপুর, পটিয়ার ইন্দ্রপুল ও বোয়ালখালীর লবণ মিলে নেওয়া হয়। এছাড়া এলাকার উৎপাদিত মাছ ও কাঁকড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয় এই ঘাট দিয়ে।
উজানটিয়ার বাসিন্দা মোকতার আহমদ বলেন, একসময় কক্সবাজার ও চট্টগ্রামগামী লঞ্চ ভিড়ত এখানে। মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালামাল ওঠানামাও হতো এই ঘাট দিয়ে। জেটিঘাটটি ভেঙে পড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বিচ্ছিন্ন দ্বীপ করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উৎপল কান্তি নাথ প্রতিদিন ঘাট পার হয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া–আসা করেন। তার বাড়ি উপজেলার বারবাকিয়া ইউনিয়নে। তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে কোনো রকম কাদা মাড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু বর্ষায় কোনোভাবে করিয়ারদিয়ায় যাওয়া যায় না। নৌকা ভিড়তে না পারায় এবং নদীতে স্রোত থাকায় সহজে নৌকা নোঙর করা যায় না। যাতায়াতের যে কী কষ্ট, যাঁরা ভুক্তভোগী তারা ছাড়া আর কেউ বুঝেন না। তিনি বলেন, যাতায়াতের অসুবিধার জন্য কেউ সেখানে শিক্ষকতা করতে যেতে চায় না।
উজানটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) আবু তৈয়ব বলেন, ২০০৪ সালে কক্সবাজার জেলা পরিষদ জেটিঘাটটি নির্মাণ করেছিল। জেটিটি ভেঙে পড়ার ফলে করিয়ারদিয়া, মাতারবাড়ি ও আলী আকবর ডেইল যাতায়াতে সমস্যার মুখে পড়ছে স্থানীয় জনসাধারণ। তাদের দুর্দশা লাঘবে জেটিটি দ্রুত নির্মাণ করতে হবে। তিনি বলেন, এ ইউনিয়নের পুরো একটি ওয়ার্ড বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে। ওয়ার্ডের বাইরে যেতে হলে তাদের এই জেটিঘাট ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
পেকুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উজানটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্রশাসক নুরুল আকতার নিলয় বলেন, আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। জেটিঘাটটির কারণে অন্তত ২০ হাজার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পেকুয়া উপজেলা প্রকৌশলী সৌরভ দাশ বলেন, খোঁজ নিয়ে জেনেছি–পশ্চিম উজানটিয়ায় ১০০ মিটারের একটি জেটি নতুন করে নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল আরও সাড়ে তিন বছর আগে। মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এখন আরেকবার চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।












