ভবিষ্যতে যেন এমন জাদুঘরের প্রয়োজন আর না হয়

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে প্রধান উপদেষ্টা এই জাদুঘর দিশেহারা জাতির পথ খুঁজে দেবে

| বুধবার , ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে বানানো জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ভবিষ্যতে যেন এমন জাদুঘর তৈরির প্রয়োজন আর না হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জাদুঘরের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন প্রধান উপদেষ্টা।

প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মুহাম্মদ ইউনূস বিকেল ৩টার দিকে জাদুঘরে পৌঁছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনের ইতিহাস, আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এবং শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে সংঘটিত দমনপীড়নের চিত্র ঘুরে দেখেন। এ সময় জাদুঘরের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজের অগ্রগতি তাকে অবহিত করা হয়। তিনি বলেন, আমরা চাই না ভবিষ্যতে কোথাও আর এমন জাদুঘর তৈরির প্রয়োজন হোক। যদি আমাদের জাতি কখনো কোনো কারণে দিশেহারা হয়, তবে এই জাদুঘরে পথ খুঁজে পাবে। খবর বিডিনিউজের।

সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নেতৃত্বে জাদুঘরের কিউরেটর তানজীম ওয়াহাব, মেরিনা তাবাসসুম খান, জুলাই জাদুঘরের গবেষকসহ দায়িত্বশীল অন্যান্যরা প্রধান উপদেষ্টাকে পুরো জাদুঘর ঘুরিয়ে দেখান। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাদুঘরে অভ্যুত্থানের ছবি, শহীদদের পোশাক, চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সে সময়কার পত্রিকার কাটিং, অডিওভিডিওসহ নানা স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্যও সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টা ১৫ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখেন, যেখানে বিগত শাসনামলে গুম, রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন, বিরোধীদের ওপর হামলা এবং চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই জাদুঘর জুলাই শহীদদের রক্ত তাজা থাকতেই করা সম্ভব হয়েছে, এটা গোটা পৃথিবীর এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।

দেশের নাগরিকের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিত হবে এখানে এসে একটি দিন কাটানো, শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে এই জাদুঘরে আসবেন। এই জাদুঘরে একটা দিন কাটালে মানুষ জানতে পারবে কী নৃশংসতার মধ্য দিয়ে এ জাতিকে যেতে হয়েছে।

আওয়ামী লীগ আমলে আয়নাঘর নামে পরিচিতি পাওয়া গোপন নির্যাতনকেন্দ্রের প্রসঙ্গ ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এখানে যে আয়নাঘরগুলো তৈরি হয়েছে, সেখানে কিছু সময়, কয়েক ঘণ্টা অথবা একটা দিন কেউ যদি থাকতে চায় সে যেন থাকতে পারে। আয়নাঘরে বসে পরিদর্শনকারীরা যেন উপলব্ধি করতে পারে, কী নৃশংসতার মধ্যে বন্দিরা ছিল! এ ধরনের নৃশংস ঘটনা না হওয়ার পক্ষে কীভাবে আমরা সবাই এক থাকতে পারি, সেটা মনের মধ্যে আনতে হবে। এই একটা মতে আমরা সবাই এক থাকব যে এই ধরনের নৃশংস দিনগুলোতে এ জাতি আর ফিরে যাবে না।

জুলাই অভ্যুত্থানের কথা তুলে ধরে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নৃশংস একটা কাণ্ড হচ্ছিল। তরুণরা, ছাত্ররা এটার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, প্রতিহত করেছে। তাদের কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছিল না, কিছু ছিল না। সাধারণ মানুষও যে এমন নির্ভয়ে, সাহসিকতার সঙ্গে অস্ত্রের মুখে দাঁড়াতে পারেএটাই আমাদের শিক্ষা।

সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীসহ জাদুঘরের কাজে নিয়োজিত সকলকে ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় সংস্কৃতি উপদেষ্টা বলেন, অল্প সময়ে এই জাদুঘরের কাজ এই পর্যায়ে এসেছে এটা একটা রেকর্ড। এটা সম্ভব হয়েছে অনেক ছেলেমেয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে। আট মাস ধরে বিনা পারিশ্রমিকে এখানে কাজ করেছেন অনেকে। তাদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমাদের আরও বেশ কিছু সেকশনের কাজ আগামী কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হবে। এবং নির্বাচনের আগেই সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। জুলাই জাদুঘর ইতিহাসের চিহ্ন বহন করে দাঁড়িয়ে থাকবে। বাংলাদেশের অতীতবর্তমানভবিষ্যতের রাজনীতির আকর হয়ে থাকবে এটা। ভবিষ্যত রাজনৈতিক ডিসকোর্সশিক্ষাগবেষণায়, শিল্পসাহিত্য চর্চায়ও এই জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা জাদুঘর পরিদর্শনের সময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন। উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার এসডিজি সমন্বয়ক লামিয়া মোর্শেদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম।

গুমের শিকার পরিবারেরগুলোর সংগঠন মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা তুলি ও গুম থেকে ফেরত ভিকটিম ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান, জুলাই অভ্যুত্থানে সম্মুখসারীতে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও হাসনাত আব্দুল্লাহ এসময় উপস্থিত ছিলেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউদার না উগ্রপন্থা সেই পরীক্ষা হবে নির্বাচনে : ফখরুল
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬