‘ব্লু স্প্যারো’ মিসাইল ছুড়ে যেভাবে হত্যা করা হয় খামেনিকে

| শনিবার , ৭ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের শুরুতেই ‘নিখুঁত’ অভিযান চালিয়ে হত্যা করা হয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ কয়েক ডজন নেতাকে। খামেনিকে হত্যার সেই অভিযানে ইসরাইল ‘ব্লু স্প্যারো’ নামে শক্তিশালী একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, যেটি আকাশ থেকে ছোড়ার পর পৃথিবী মণ্ডলের বাইরে মহাশূন্য ঘুরে আবার পৃথিবীতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।

নিউ ইয়র্ক পোস্ট লিখেছে, ইসরায়েলের তৈরি ‘ব্লু স্প্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্রটি ১ হাজার ২৪০ মাইল পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার আগে সেটি বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করে মহাশূন্য ঘুরে আসে। ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটির আঘাত এতটাই তীব্র যে এর ধ্বংসাবশেষ পশ্চিম ইরাকেও খুঁজে পাওয়া গেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা গেছে ওই অঞ্চলে। খবর বিডিনিউজের।

খামেনিকে হত্যার সেই অভিযান চালানো হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিনই। দিনটি ছিল শনিবার, যা মূলত ইসরায়েলে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। এ দিনটিকে ঘিরেই ইসরায়েলি কর্মকর্তারা একটি ধারণা তৈরি করেন যে, তাদের বাহিনী সাপ্তাহিক ছুটির কারণে কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। এভাবেই খামেনিকে হত্যায় আকস্মিক হামলার পরিকল্পনা করা হয় বলে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) এক কর্মকর্তা।

বিবিসির তথ্যের বরাতে নিউ ইয়র্ক পোস্ট বলছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা এমন কিছু ছবি ও তথ্য প্রচার করেছিলাম, যা দেখে মনে হচ্ছিল আইডিএফ কর্মী ও উচ্চপদস্থ কমান্ডারেরা সাবাত ডিনারের (শনিবারের রীতি) জন্য বাসায় চলে যাচ্ছেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সাপ্তাহিক ছুটির দিন উপভোগের জন্য যখন সদর দপ্তর ত্যাগ করার নাটকীয়তা দেখান। ঠিক তখনই তারা দ্রুত ছদ্মবেশ ধারণ করে অত্যন্ত গোপনে পুনরায় দপ্তরে ফিরে যান এবং খামেনির কম্পাউন্ডে হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেন। ইসরায়েলের সেই অভিযান সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, মূলত রাতেই হামলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের শনিবার সকালের একটি বৈঠকের তথ্য পেয়ে যায় গোয়েন্দারা। সে কারণে সময়সূচিও পাল্টে ফেলা হয়। হামলার আগে ধারণা করা হত খামেনি আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষায় অধিকাংশ রাত ভূগর্ভস্থ বাংকারে কাটাতেন। আইডিএফ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তেহরানের কেন্দ্রস্থলে পাস্তুর স্ট্রিটে অবস্থিত খামেনি কম্পাউন্ডে যখন ইরানের জ্যেষ্ঠ নেতাদের দেহরক্ষীরা এসে পৌঁছান, তখন ইসরায়েলের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তাদের ওপর তীক্ষ্‌ণ নজর রাখছিল। মোসাদের কাছে ইরানি কর্মকর্তাদের রক্ষীদের গতিবিধির তথ্য ছিল। পাস্তুর স্ট্রিটে বসানো একটি ক্যামেরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সব তথ্য চলে যায় তেল আবিবে। এর ফলে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা হামলার জন্য উপযুক্ত সময় ঠিক করে ফেলেন।

ইরানের সময় অনুযায়ী, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় এফ১৫ জেট ও অন্যান্য যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করে ইসরায়েল। এর প্রায় দুই ঘণ্টা পর খামেনির কম্পাউন্ডের কেন্দ্রস্থল নিশানা করে বিমানগুলো থেকে ‘ব্লু স্প্যারোসহ’ ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ‘ব্লু স্প্যারো’ আকাশ থেকে ছোড়া এমন এক সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র, যা মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘স্কাড’ ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে তৈরি, যেমনটি পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক ব্যবহার করেছিল।

ইসরায়েলের ‘ব্লু স্প্যারো’ সাধারণত যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া হয়। এরপর সেগুলো মহাকাশ পর্যন্ত উঠে আবার পৃথিবীর দিকে ঘুরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সময় এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রচণ্ড গতি পায়। প্রচণ্ড গতির কারণে সেগুলোকে আকাশে ধ্বংস করে ফেলা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানে হামলার সময়ও ইসরায়েল এগুলো ব্যবহার করেছিল বলে ধারণা করা হয়।

বৃহস্পতিবার সেই আইডিএফ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম দফার হামলার সময় আইডিএফ ও মার্কিন বাহিনী সরাসরি যুক্ত ছিল, যাতে ইরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যায়। একই সময়ে খামেনির কম্পাউন্ড এলাকায় একডজন মোবাইল ফোন টাওয়ারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে আইডিএফ, যাতে খামেনির নিরাপত্তা বাহিনী কোনো ধরনের আগাম সতর্কবার্তা না পায়। এই হ্যাকিং ও গোয়েন্দা তৎপরতা ছিল খামেনিকে হত্যার জন্য মোসাদের বছরের পর বছর ধরে চালানো পরিকল্পনা ও অভিযানের অংশ।

নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, তেহরানে সেই বৈঠকের নতুন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার আগেই সিআইএ ৮৬ বছর বয়সী খামেনির চলাফেরা ও দৈনন্দিন রুটিন সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেয়ে গিয়েছিল। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি, খামেনি ছাড়াও এই হামলায় ইরানের ৪০ জনেরও বেশি শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ ও দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা আব্দুর রহিম মুসাভি, খামেনির মেয়ে, নাতিনাতনি, পুত্রবধূ ও জামাতাও নিহত হন ওই পরিকল্পিত হামলায়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাদকদ্রব্যসহ গ্রেপ্তার ৩৭
পরবর্তী নিবন্ধরাতে চলে টিলা কাটা, দিনে পলিথিনের আড়াল