ব্যাংক বাঁচলে বাঁচবে দেশ

রোকসানা বন্যা | সোমবার , ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:২০ পূর্বাহ্ণ

একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তার ব্যাংকিং খাত। মেরুদণ্ড যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে পুরো শরীর যেমন অচল হয়ে যায়, একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তার সামগ্রিক অর্থনীতিও তেমনি মুখ থুবড়ে পড়ে। বর্তমানে আমরা এক ক্রান্তিকাল পার করছি, যেখানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট এবং খেলাপি ঋণের ভারে অর্থনীতি কার্যত এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে হলে ব্যাংকিং খাতের আমূল সংস্কার ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।

ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অস্থিরতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো সুশাসনের অভাব এবং বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ। বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী মহলের ঋণ জালিয়াতি এবং ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার উপরে (সেপ্টেম্বর ২০২৫এর তথ্য অনুযায়ী)। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩%। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি এর চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগজনক।

সর্বশেষ তথ্য (প্রায়)

মোট খেলাপি ঋণ ,৪৪,৫১৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক (সেপ্টেম্বর ২০২৫/জানুয়ারি ২০২৬ আপডেট)

খেলাপি ঋণের হার ৩৫.৭৩%

আগের তথ্য (মার্চ ২০২৪)-,৮২,২৯৫

তবে বিশ্লেষকদের মতে, পুনঃতফসিল করা এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ হিসাব করলে এই অঙ্ক বাস্তবে আরও অনেক বেশি। যা এখনকার বাস্তবতায় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পাহাড়সম খেলাপি ঋণ আদায় করার ব্যাপারে তৎপর।

শরিয়াহ ভিত্তিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকের চ্যালেঞ্জ

সামপ্রতিক সময়ে দেশের আর্থিক খাতে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কয়েকটি শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকের তারল্য সংকট। মানে হলো, ব্যাংকের কাছে তার আমানতকারীদের চাহিদামতো নগদ টাকা ফেরত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তহবিল না থাকা।

এক সময় দেশের ব্যাংকিং খাতে আদর্শ হিসেবে বিবেচিত এই ব্যাংকগুলো এখন বড় ধরনের ঋণ অনিয়ম এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকটে ভুগছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চয় তুলতে গিয়েও হিমশিম খাচ্ছে। যখন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে যায়, তখন সেই খাতের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (চঈঅ) কাঠামোর আওতায় এসব দুর্বল ব্যাংককে চিহ্নিত করা হলেও, আমূল পরিবর্তন না এলে সাধারণ মানুষের সংশয় দূর হওয়া কঠিন।

অর্থনীতির ভঙ্গুর দশার আরেকটি বড় সূচক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। গত কয়েক বছরে রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে বর্তমানে (বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী) ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে অবস্থান করছে। এর ফলে আমদানিকারকরা এলসি খুলতে গিয়ে ডলার সংকটে পড়ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের দামে। বর্তমানে দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার প্রায় ৯ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় করে তুলেছে। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে হলে আমাদের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে কঠোর সুশাসন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে ব্যাংকগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তারা আইন অমান্যকারী ব্যাংক ও বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে আপসহীন ভূমিকায় যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করছে না, তাদের জন্য বিশেষ আদালত গঠন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ঢালাওভাবে ঋণ পুনঃতফসিল বা মওকুফ সুবিধা বন্ধ করা প্রয়োজন।

শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকে বিশেষ নজরদারি: শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে শক্তিশালী অডিট এবং পরিচালনা পর্ষদে দক্ষ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে হবে। অর্থনীতিকে সচল করতে হলে কেবল বড় শিল্পপতিদের নয়, প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদেরও আর্থিক সুরক্ষা দিতে হবে।

অর্থনীতি যখন খাদের কিনারায় পৌঁছায়, তখন কেবল জোড়াতালি দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দক্ষ আমলাতন্ত্রের সমন্বয়ে যদি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার করা যায়, তবেই বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

মনে রাখতে হবে, ব্যাংকিং খাত সচল হওয়া মানেই হলো দেশের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হওয়া। তাই সময় থাকতে কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে ভবিষ্যতে এই অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এক ভয়াবহ সংকটের রূপ নিতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতাই হবে মূল ভিত্তি।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসবার আগে মানুষকে ভালোবাসতে হবে, সম্মান করতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধমহান একুশে : বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা