সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি আরো চাপের মুখে পড়বে। তেলের দাম বাড়বে, মানুষ কাজ হারাবে ও স্বাভাবিক সরবরাহ বিঘ্নিত হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিকে চাঙা করে চলমান রাখতে ব্যবসায়ীদের জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। গত শনিবার রাজধানীর এফডিসিতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে এক ছায়া সংসদ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বেশির ভাগ ব্যবসায়ী দেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগের জন্য কাজ করতে চায়। আমাদের সংস্কৃতিতে যখন রাজনৈতিক পালাবদল হয় তখন আগের সময়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। ফলে সবার প্রতি সুবিচার করা হয় না। ঢালাওভাবে ব্যবসায়ীদের ওপর কালিমা দেওয়া ঠিক না।’ হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা, দেশে ফিরে ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারা, ব্যাংক হিসাব জব্দ করাসহ নানা কারণে ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে মধ্যপ্রচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি দেশের ব্যবসার পরিবেশ কতটা সহায়ক, তা নির্ভর করে নানা বিষয়ের উপর। যেমন: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক কাঠামো, আইন–কানুন, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। এসব উপাদান মিলে গড়ে তোলে একটি দেশ বা অঞ্চলে ব্যবসা গড়ে তোলার ও পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ। আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে যে কোনো দেশের জন্য একটি শক্তিশালী ও উদ্যোক্তা–বান্ধব ব্যবসা পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও সেই লক্ষ্যেই শিল্প উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ টানতে নানা ধরনের নীতিমালা গ্রহণ করেছে। তবে বাস্তবে ব্যবসা শুরু করা বা পরিচালনা করা এখনো সহজ নয়। প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং অর্থপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধকতা অনেক ব্যবসায়ীকে পিছিয়ে দিচ্ছে। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা করার পরিবেশে যেমন একদিকে রয়েছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ, তেমনি অপরদিকে আছে সম্ভাবনার দ্বারও। প্রশাসনিক জটিলতা, কর ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা– সব মিলিয়ে অনেক বাধা এখনো বিদ্যমান। তবে ডিজিটাল পেমেন্ট, নারী উদ্যোক্তা সহায়তা, স্থানীয় শিল্পে রপ্তানি প্রণোদনা ও ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছে এমন এক স্টপ সার্ভিসের মতো ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আশা জাগায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি ব্যবসায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। ব্যবসায়ীরা যেসব হয়রানির শিকার হন, সেগুলো দূর করা। তাঁরা বলেন, ব্যবসায়ীরা পূঁজি, বিদ্যুৎ, গ্যাস পেতে হয়রানির শিকার হন। কাস্টমস–এনবিআরেও নানাবিধ অব্যবস্থাপনার শিকার হন তাঁরা। সরকার নির্ধারিত ট্যাক্স–ভ্যাট দিয়েও হয়রানির শিকার হতে হয়। বন্দরে আমদানিকৃত মালামাল মাসের পর মাস আটকিয়ে রাখা হয়। আইনের সুযোগে অনেক ঝামেলা চাপিয়ে দেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের ওপর। এ সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। তাঁরা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নানা রকম হয়রানিসহ হত্যা মামলাও করা হয়েছে। আর মামলাকে হাতিয়ার বানিয়ে কয়েকটি চক্র হাতিয়ে নিয়েছে বিপুল অঙ্কের টাকা। এ নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা।
অনেকে ব্যবসায়িক কাজে বিদেশ গিয়ে ফেরত আসতে চাইলেও পরিস্থিতি অনুকূল মনে করছেন না। এই পরিস্থিতিতে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা যেমন রয়েছেন, তেমনি নিরীহ মানুষও রয়েছেন। ফলে দেশের সার্বিক ব্যবসা–বাণিজ্যে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক না কাটলে সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি থেকে ব্যবসায়ীদের রেহাই দিতে পারে একমাত্র নির্বাচিত সরকার। এ বিষয়ে যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।








