নিজেকে এত প্রয়োজনীয় ভাবা উচিৎ নয়। জীবনে এমন কী গুরুত্বপূর্ণ মহৎ কাজ করা হয়েছে, অনিবার্য ভাবতে হবে। শিল্প– সাহিত্যেজনেরা কখনোই অর্থ সম্পদের নিরিখে অপরের অহংবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বা আত্মশ্লাঘার মূল্যায়ন করেন না। এটি অনর্থক বিভ্রম তৈরি করে।
গাড়ি, বাড়ি, জায়গা, জমি কিংবা জমিদারি বন্দোবস্ত লেখক কবির সাথে দেখিয়ে কোনও ফায়দা নাই। এ–সব ভাবা মানে বোকার স্বর্গে বাস করা। কথায় কথায় ফ্যাসিস্ট আচরণ ; কথা বলা বন্ধ করা হবে–
কবিতা বা কোনও রচনা পাঠ থেকে বিরত থাকা হবে। আবার ফেসবুক কিছুদিন বন্ধ রেখে পুনরায় খুলে দেওয়া স্রেফ হাস্যকর খেলা। ভাবা হচ্ছে একটানা নীরব মনোলগে কাজ হবে। যে মনোলগে মানবতা জীবন যাপন সুস্থ সংস্কৃতি অনুপস্থিত কিংবা অর্থ দেমাগে সংকটের জায়গা স্ফীত করা থাকে ; সেটি শিল্প সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরা কখনোই গণনার মধ্যে আনে না। এ–সব অনেকটা প্যারানয়েড পারসোলাটি ডিসঅর্ডার এর মতো। এমন কথা কী হয় প্রতিদিন যা বন্ধ করতে হবে! কী আসে যায় যদি কথা বলা বন্ধ থাকে। বেশি কথা বলা হলে কাজের কাজ কিছুই হয় না। কথা, কখনো – সখনো মূল কাজের ব্যত্যয় ঘটায়। কথা কম হলে কাজ বেশি হবে, নিশ্চিত। তবে ভাবনা – চিন্তার জন্য ধ্যানস্থ হওয়া দরকার। ধ্যানে বসে ঊর্ধ্বপানে চেয়ে নিরাকার ও শূন্য হতে পারলে বশ্যতা আসে। ধন সম্পদের ভাগবাটোয়ারার মোহ কাজ করে না। তখন শূন্যতা সম্পদ হ‘য়ে ওঠে।
ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে বড়াই করা কোন মানুষই পূর্ণাঙ্গ মানুষ না। বরং মানুষ নামের কলঙ্ক। লেখক কবিরা বাজারের পণ্য নয় নগ্ন পুঁজির কদর্য চেহারা দেখিয়ে ঠাণ্ডা করা যাবে। চিনতে না পারার হুমকি ধমকি দিয়ে লাভ কী হবে! একজন লেখকের পাঠক চিনতে হবে কথা নাই, উল্টো পাঠকের লেখক চেনা উচিৎ। কিছু কিছু পাঠক শব্দের প্রতি ম্যানিয়া আক্রান্ত যেমন, ‘নাদুসনুদুস’, ‘সোনা’ লেখার প্রতি ঘোরতর আপত্তি। শব্দটা সুন্দর নয়, উচ্চারণে অসৌজন্যমূলক, এ রকম ধারণা। অথচ অভিধানে বলা আছে, হৃষ্টপুষ্ট, গোলগাল বা স্বাস্থ্যবান তারাই ‘নাদুসনুদুস’ স্বর্ণ‘ – শব্দ তৎসম সংস্কৃত শব্দ থেকে আগত। সোনা – স্বর্ণের তদ্ভবরূপ। এর মধ্যে অশ্লীলতা কিংবা ব্যবহার বিধির দুর্বলতা কী? অর্থ ও উৎপত্তিগত বিকাশ না–জেনে না বোঝে তর্কে জড়িয়ে যাওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
বছর দুয়েক পূর্ব থেকে লিখতে এসে এমন কেউ কেউ লেখালেখিকে পণ্য গণ্য করে জঘন্য মনোবৃত্তি শুরু করেছে। তাদের মধ্যে ফেসবুক লেখক এবং কিছু অন্যান্য পত্রিকার লেখকেরাও আছেন। বাণিজ্যিক লেখকদের বাদ রেখে সিরিয়াস ধর্মী কিছু লেখকদের দুর্বল মন মানসিকতায় এমত ধারণা বিকাশ ঘটছে, যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। লেখাপড়ার কাঠামো দুর্বল হলে এ–সব ভাবনা মস্তিষ্কে ভোঁ ভোঁ করে। এটাও অহংবাদী কাঠামোজনিত রোগ। লেখালেখির সবটা ওপর থেকে পড়ে না প্রাকৃতিক বৃষ্টির মতো। অন্তত ৭৫ শতাংশ আসে গভীর চর্চার ফল থেকে। নিয়মিত অভ্যাসগত চর্চা অনেকটা প্রাগ্রসর করে তোলে একজন লেখক কবিকে। অন্তত এটুকু বোঝার মানসিক শক্তি অর্জন করতে হবে। এখানে কোন রকমের চালাকি চলবে না। চালাকি করা মানে নিজেকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করা। একজন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ হক, শহীদ কাদরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, শওকত ওসমান , রশীদ করিম, কায়েস আহমদ, সেলিনা হোসেন, রেজিয়া রহমান, আবুল মোমেন, আহমদ শরীফ, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যতীন সরকার, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ময়ুখ চৌধুরী প্রমুখ একদিন বা এক বছরে তৈরি হয়নি। যুগ যুগান্তরের চিন্তাদর্শন চর্চায় আকণ্ঠ ডোবা পাঠক ও লেখক এ–সব সম্মানিতরা। লেখাপড়ার অভ্যাস একটা চলমান প্রক্রিয়া। ইদানীং লেখক না হ‘য়ে উঠার পূর্বে অসৌজন্যমূলক অভব্য আচরণ করতে দেখা যায় অনেককে। জানে কম অথচ বেশি জানা ভান করা পুচ্ছ লেখকের সয়লাব শহর, গ্রাম, গঞ্জ। একেকজন বিদ্যার জাহাজ হয়ে নির্বিঘ্নে হাঁকিয়ে যাচ্ছে নিজেদের মূল্য। তারা একেকজন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও পেতে চায়। মূল্যবোধহীন এ–সব লেখকের লেখা অনুবাদও হচ্ছে প্রচুর। সে–ই হিসেবে পশ্চিমা উন্নত বিশ্বের এ ওয়ান গ্রেডের লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা আমাদের সাহিত্য নিয়ে একটা বাজে ধারণা পাচ্ছে। আমাদের লেখক বিশ্বমানের নয়, এ ধারণাও পেয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত বাজে লেখা অনুবাদের ফলে। সবল লেখকদের পর্দার অন্তরালে রেখে অপেক্ষাকৃত দুর্বল লেখকদের লেখা যদি লেখকের প্রদেয় অর্থের বিনিময়ে ছেপে বাজারজাত করা হয়, সাহিত্য সংস্কৃতির দুরবস্থা হবে নিশ্চিত। এ কারণে পাশ্চাত্য লেখকের ধারণা দক্ষিণ এশিয়ার দু‘একটা দেশের লেখকবৃন্দ লেখার ক্ষেত্রে ইউনিভারসেল ওয়ান্নেসে আসতে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক সমৃদ্ধ লেখার সাথে আমাদের লেখা এটপার হচ্ছে না। প্রকাশক নীতিমালার অভাবে টাকার বিনিময়ে লেখক সৃষ্টি ও যত্রতত্র পুরস্কারের ছড়াছড়িতে লেখা হ‘য়ে ওঠছে যা – তা এবং সংস্কৃতি পরিপন্থী।
আমাদের মূলধারার সম্মানিত লেখকদের কাজ সরিয়ে রেখে আমরা সাংস্কৃতিক অবক্ষয় তৈরি করছি। তাঁদের কাজ জাতি হিসেবে আমাদের শ্লাঘার বিষয়, আমাদের রক্ত দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ঊনসত্তরের গণ জাগরণ। এ–সব আন্দোলন বিজাতীয় অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক শোষণ, শাসন ও উৎপীড়ন থেকে মুক্তি এনে দিয়েছে। এটি একটি সংগ্রামী জাতির আলেখ্য।
এই কলামের শুরু অর্থ সম্পদের বড়াই থেকে। তা কতটা ছোট করে ফেলে একজন লেখক ও পাঠককে, উর্দু ও হিন্দি কবিতার কিছু নমুনা না দিলে লেখাটি তাৎপর্য হারাবে। অর্থ সম্পদ নিয়ে অহংকার এবং এর নশ্বরতা, মানুষের লোভ লালসা আধ্যাত্মিকতার তুলনামূলক বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। মির্জা গালিব, কবির দাস, তো আছেনই। কালী প্রসন্ন সিং গুলজারের মতো আধুনিক কবিরাও মানুষের নগ্ন আকাঙ্ক্ষা বৈষয়িক সম্পদ অর্জনের দুষ্কার্য কে চিহ্নিত করেছেন। কিংবা সতর্কবার্তাও বলা চলে।
১) ‘আগাহ্ আপনি মওত কা, কোই বাশার নেহি / সামান সও বারাস কা, পাল কী খবর নেহি ’ মানুষ যে–ভাবে অস্থির হয়ে একশো বছরের সম্পদের দিকে নজর দেয়। অথচ পরের মুহূর্তের খবর রাখে না
‘(কবিরদাস) ‘সাঁই ইতনা দিজিয়ে, জামে কুটুম সমায় / ম্যায় ভি ভুখা না রহু, সাধু ন ভুখা যায়’ হে ঈশ্বর আমাকে যতটা না হলে চলে না ঠিক ততটাই দাও, যেন আমার পরিবার ও আমি ক্ষুধার্থ না থাকি।
(কবিরদাস)‘ মির্জা গালিব লেখেন, হাজা রোঁ খোয়াহিষেঁ অ্যায়সি, কি হার খোয়াহিশ পে দম নিকলে / বহুত নিকলে মেরে আরমা,/ লেকিন ফির ভি কম নিকলে’ সম্পদের পাহাড় গড়ার জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে, তারপরও মনে হয় খুব কম। এটিই অঢেল সম্পদ অর্জনের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা। এই কবিতার মর্মার্থ এটিই। সৃজনশীল লেখক ও পাঠকরা, কিংবা মানুষেরা কেন এত সম্পদ গড়ার আকাঙ্ক্ষা, আর সে–সব অর্থ সম্পদ নিয়ে কেন এত বড়াই!
সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিকগুণপনা যেমন একজন প্রকৃত লেখক কবি‘র মানস সম্পদ তেমনি পাঠকেরও বিস্ময়কর মানস চরিত্র পরিবর্তনের সহায়ক শক্তি। কবি স্রেফ কবি নয় একজন প্রকৃত গভীর পাঠকও বটে। পাঠক শুধু পাঠক নয় অদৃশ্য লেখকের মন ও মননশীলতার সেতু।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।












