‘বোর্ড অফ পিস’ ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ : ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য সম্ভাব্য হুমকি

এস এম ওমর ফারুক | বুধবার , ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত তথাকথিত ‘বোর্ড অফ পিস’ উদ্যোগটি কেবল গাজা যুদ্ধপরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার জন্য একটি গভীর চ্যালেঞ্জ। জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো যখন এই বোর্ডে যোগ দিতে অস্বীকার করে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় সমস্যাটি কেবল গাজা বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক আইন এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রসঙ্গ জড়িত। এটা জাতিসংঘ কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অবমূল্যায়ন। আজকের লেখায় আমি এ বিষয়ের বিভিন্ন দিক সংক্ষেপে আলোচনার প্রয়াস নিচ্ছি।

এক. ১৯৪৫ সালের পর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার মূল ভিত্তি ছিল জাতিসংঘ। এর সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জাতিসংঘ ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি ন্যূনতম সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছিল। ‘বোর্ড অফ পিস’এর চার্টার যদি সত্যিই জাতিসংঘকে বাইপাস করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দাবি করে, তবে সেটি কার্যত বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার পরিবর্তে একধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ক্লাব শাসন প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়।

ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি একটি বড় হুমকি, কারণ জাতিসংঘে তারা অন্তত ভোট, কূটনৈতিক জোট এবং আন্তর্জাতিক আইনকে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু ‘বোর্ড অফ পিস’এর মতো কাঠামোতে সিদ্ধান্ত হবে মূলত অর্থ, সামরিক শক্তি ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠ প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে।

দুই. ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিশ্বরাজনীতির বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা:

ট্রাম্প নিজে এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিক। আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ, ব্যক্তি নয়। কিন্তু ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শন বরাবরই উল্টো তিনি প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও দরকষাকষিকে প্রাধান্য দেন।

যদি একজন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান আন্তর্জাতিক শান্তি ও যুদ্ধোত্তর শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা হন, তবে ভবিষ্যতে অন্য বড় শক্তির নেতারাও একই দাবি তুলতে পারেন। এতে বিশ্বব্যবস্থা ধীরে ধীরে নিয়মভিত্তিক (rules-based order) থেকে ব্যক্তিভিত্তিক (personality-driven order) ব্যবস্থায় রূপ নেবে যা ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি।

তিন. অর্থের বিনিময়ে বৈধতা ‘১ বিলিয়ন ডলারের সদস্যপদ’:

এই বোর্ডে তিন বছরের জন্য বিনামূল্যে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ১ বিলিয়ন ডলার ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ভয়ংকর নজির স্থাপন করে যেখানে শান্তি, শাসন ও বৈধতা অর্থের পণ্যে পরিণত হয়।

ছোট ও দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে এ ধরনের অর্থনৈতিক শর্ত পূরণ করা অসম্ভব। ফলে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এটি ঔপনিবেশিক যুগের এক আধুনিক সংস্করণ যেখানে সামরিক দখলের বদলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শর্ত আরোপ করা হয়।

চার. নির্বাচিত নয়, আমন্ত্রিত শাসন: সার্বভৌমত্বের সংকট

বোর্ড অফ পিস’ গাজায় অস্থায়ী শাসন তত্ত্বাবধান করবে এমন প্রস্তাব সরাসরি একটি জনগোষ্ঠীর স্বনিয়ন্ত্রণের অধিকার (right to self-determination) প্রশ্নবিদ্ধ করে। আজ গাজা, কাল অন্য কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল।

ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত। ভবিষ্যতে যদি কোনো দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সংঘাত দেখা দেয়, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো একই যুক্তিতে সেখানে ‘আন্তর্জাতিক বোর্ড’ বসিয়ে দিতে পারে। এতে সার্বভৌমত্ব আর অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে বিবেচিত হবে না বরং শক্তিধরদের অনুমতির বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

পাঁচ. শাস্তিমূলক কূটনীতি ও বাণিজ্যিক অস্ত্রায়ন এর উদ্যোগ:

ফ্রান্সের প্রত্যাখ্যানের পর ট্রাম্প যে ২০০% ট্যারিফের হুমকি দিয়েছেন, তা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় রাজনৈতিক মতভেদের শাস্তি অর্থনৈতিকভাবে দেওয়া হবে। যদি ইউরোপের মতো শক্তিশালী অর্থনীতিও এ ধরনের হুমকির মুখে পড়ে, তবে ছোট রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

এ ধরনের শাস্তিমূলক কূটনীতি ছোট দেশগুলোকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখবে। তারা বাধ্য হবে শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রস্তাবে ‘না’ বলার আগে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করতে। এটি কার্যত রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের একটি বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি করবে।

ছয়. স্বার্থভিত্তিক জোট ও দ্বৈত মানদণ্ড:

বোর্ডে রাশিয়া, বেলারুশ, হাঙ্গেরির মতো রাষ্ট্রগুলোর আমন্ত্রণ এবং একই সঙ্গে ‘শান্তি”র দাবি একটি বড় দ্বন্দ্ব তৈরি করে। এটি দেখায় যে নৈতিকতা বা আন্তর্জাতিক আইন নয়, বরং ভূরাজনৈতিক স্বার্থই সদস্য নির্বাচনের মূল মানদণ্ড।

ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এর অর্থ হলো আজ আপনি গুরুত্বপূর্ণ হলে অন্তর্ভুক্ত, কাল অপ্রয়োজনীয় হলে উপেক্ষিত। এই অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।

সাত. দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক প্রভাব:

এই উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে ভবিষ্যতে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার কোনো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে একই ধরনের ‘বোর্ড’ গঠনের পথ খুলে যাবে। জাতিসংঘ ধীরে ধীরে একটি প্রতীকী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, আর বাস্তব ক্ষমতা চলে যাবে অনানুষ্ঠানিক, অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্মগুলোর হাতে।

ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এর অর্থ আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় কমে যাওয়া, শক্তিধর রাষ্ট্রের ইচ্ছার উপর অতিনির্ভরশীলতা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্রমাগত সংকুচিত হওয়া।

পরিশেষে বলতে চাই, ‘বোর্ড অফ পিস’ উদ্যোগটি প্রথম দেখায় শান্তি ও পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও গভীরে এটি একটি নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার নীলনকশা। জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের প্রত্যাখ্যান তাই কেবল কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয় বরং একটি সতর্ক সংকেত।

ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় হুমকি হলো: নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ক্ষয়, সার্বভৌমত্বের দুর্বলতা এবং অর্থ ও শক্তির কাছে ন্যায়বিচারের পরাজয়। ভবিষ্যৎ বিশ্ব যদি সত্যিই শান্তিপূর্ণ হতে চায়, তবে তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বোর্ড নয়বরং জাতিসংঘের মাধ্যমে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব।

লেখক : প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কায়সার নিলুফার কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধপ্রবাহ