নতুন সরকারের আগমনে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সুর বেজে উঠেছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারিগর দেশের নারী সমাজ। রাজপথের লড়াই থেকে শুরু করে জনমত গঠন–সর্বত্রই নারীদের উপস্থিতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও সাহসী। দীর্ঘদিনের রুদ্ধশ্বাস পরিবেশ, রাজনীতিতে মৌলবাদের দাপট এবং সামাজিক শেকল ভেঙে নারীরা আজ যে কলুষমুক্ত প্ল্যাটফর্মের দাবি তুলেছে, তা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের প্রধান শর্ত। যে নারীরা বুক চিতিয়ে লড়াই করে আজ একটি পোক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন, তারা আর কোনোভাবেই পিছু হটতে রাজি নন। নতুন সরকারের কাছে নারী সমাজের প্রত্যাশাগুলো তাই এখন অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং জোরালো।
বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি কীভাবে উগ্রবাদ ও মৌলবাদী চিন্তাধারা নারীর অগ্রযাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। সমাজ ও রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা এই অশুভ শক্তির দাপটকে উপেক্ষা করেই নারীরা রাজপথে নেমেছিলেন। নতুন সরকারের কাছে প্রথম এবং প্রধান দাবি–একটি অসামপ্রদায়িক, উদারতান্ত্রিক ও নিরাপদ রাষ্ট্রকাঠামো নিশ্চিত করা। কোনো গোষ্ঠী যেন ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে বা সামাজিক প্রথার অজুহাতে নারীর স্বাভাবিক চলাচল, কর্মসংস্থান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করতে না পারে, সরকারকে সে বিষয়ে আপসহীন অবস্থান নিতে হবে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল পুলিশের দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার হওয়া প্রয়োজন।
নারী সমাজ কেবল ভোটার বা মিছিলের মুখ হিসেবে ব্যবহৃত হতে চায় না। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা হলো, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিটি পর্যায়ে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী পদগুলোতে নারীদের সুযোগ দিতে হবে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী টেবিলে নারীর কণ্ঠস্বর যত জোরালো হবে, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার পথ ততটাই মসৃণ হবে।
একটি দেশের প্রকৃত সংস্কার তখনই টেকসই হয়, যখন তার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নারীর অধিকার সুরক্ষিত থাকে। শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে আধুনিকায়ন করতে হবে যেন পাঠ্যপুস্তক থেকে নারীবিদ্বেষী বা রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন যেকোনো বিষয় বাদ দিয়ে সেখানে নারীর বীরত্ব ও সফলতার জয়গান গাওয়া হয়। একইসঙ্গে, প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বুলিং এবং যৌন হয়রানিমুক্ত করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারও সমান জরুরি। নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পিরিয়ডকালীন পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সামাজিক ‘ট্যাবু’ ভাঙতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সুলভ করা এবং উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে কাউন্সিলিং সেবার ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। গ্রামীণ নারীদের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আরও আধুনিক ও নারীবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।
নারীর মুক্তির পথ সুগম করতে বিদ্যমান আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সাইবার স্পেসকে নারীবান্ধব করা এখন অপরিহার্য। পাশাপাশি, নারীরা আজ উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করছেন। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা–ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সহজ শর্ত এবং বাজারজাতকরণের বিশেষ সুবিধা প্রদান করা। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারীই পারে একটি শোষণমুক্ত সমাজ নিশ্চিত করতে।
নারীরা আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন, তা দীর্ঘ লড়াই আর ত্যাগের ফসল। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহলের চোখরাঙানি দিয়ে এই অগ্রযাত্রাকে থামানো সম্ভব নয়। নতুন সরকারের আগমনকে নারীরা একটি ‘কলুষমুক্ত প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই প্ল্যাটফর্ম যেন কোনোভাবেই আবার সেই পুরনো সংকীর্ণতা বা অপশক্তির কবলে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নারীরা এগিয়ে এসেছেন বলেই আজ এই নতুন ভোরের দেখা মিলেছে। এই সূর্য যেন কোনোভাবেই অন্ধকারের কালো মেঘে ঢাকা না পড়ে–এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা। একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার মিছিলে নারীই হোক অগ্রপথিক।












