ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। ইরানজুড়ে নতুন করে বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। তেহরানে নতুন করে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত অন্তত ১২৩০ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননেও আক্রমণ জোরালো করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচী অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বেসামরিক এলাকায় হামলা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী বাজারে এই হামলার প্রভাব পড়েছে, দাম বেড়েছে জ্বালানির, মুদ্রার বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এবং বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমেছে। আমাদের ইরানিদের জন্য এই যুদ্ধের মূল্য পরিমাপের বাইরে, নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষকে। কারণ হামলাকারীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বেসামরিক এলাকা এবং এমন সব স্থানকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, যেখানে সর্বোচ্চ পরিমাণ প্রাণহানি ও দুর্ভোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
গত শনিবার থেকে ইরানজুড়ে দুই সহস্রাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে প্রায় দুইশজন নিহত হয়েছে। গতকাল ইরানের আধা–সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র তেহরানের দক্ষিণ–পশ্চিমে অবস্থিত পারান্দ শহরের দুটি স্কুলে আঘাত হেনেছে। হামলার কারণে আশেপাশের বেশ কিছু আবাসিক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলছে সংবাদমাধ্যমটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের আক্রমণের মধ্যে ইরানের স্বাস্থ্য অবকাঠামো বা হাসপাতালে ১৩টি হামলার সত্যতা তারা পেয়েছে। এসব হামলায় চারজন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত ও ২৫ জন আহত হয়েছেন। ইরানে চারটি অ্যাম্বুলেন্সও হামলার শিকার হয়েছে। কাছাকাছি এলাকায় বোমা হামলায় বেশকিছু হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে হামলার ফলে তেহরানের একটি হাসপাতাল খালি করতে হয়েছে বলে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে।
যুদ্ধের ষষ্ঠ দিন গতকাল বৃহস্পতিবার তেহরানে বোমাবর্ষণ আরও তীব্র হয়েছে বলে সেখানকার বাসিন্দারা জানাচ্ছেন। বিস্ফোরণের মধ্যেই তেহরান থেকে মোবাইল ফোনে ৩৬ বছর বয়সী মোহাম্মদরেজা রয়টার্সকে বলেন, আজকের (বৃহস্পতিবার) পরিস্থিতি গতকালের চেয়েও খারাপ। তারা (ইসরায়েল) উত্তর তেহরানে আঘাত হানছে। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। এটি একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আমাদের সাহায্য করুন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সমপ্রচারমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি) জানিয়েছে, তেহরানের একটি ক্রীড়া স্টেডিয়াম হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের জ্বালানিমন্ত্রী আব্বাস আলিবাদি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশের বিভিন্ন অংশে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা নজরদারি সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ইরানে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট শাটডাউন এখন পঞ্চম দিনে প্রবেশ করেছে। সাধারণ সময়ের তুলনায় সেখানে ইন্টারনেট ব্যবহার এখন ১ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে।
২০টি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ক্ষতির : গত ছয় দিন ধরে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। ইরানের বিপ্লবী রক্ষা বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, তাদের আক্রমণে কুয়েত, বাহরাইন ও আমিরাতে ২০টি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বড় ক্ষতি হয়েছে। তাদের নিশানায় ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন স্থাপনাগুলো রয়েছে। ইরাকের ইরবিলে মার্কিন সেনাদের একটি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
লেবাননে চারদিনে নিহত ৭৭ : লেবাননে গত সোমবার থেকে যে ইসরায়েলি হামলা চলছে, তাতে এ পর্যন্ত ৭৭ জন নিহত হয়েছে। এ চারদিনে ৫২৭ জন আহত হয় বলেও খবর দিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আল জাজিরা লিখেছে, গতকাল অন্তত আটজন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে এক পরিবারের চারজন আছেন। এদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে গত সোমবার হিজবুল্লাহ সক্রিয় হলে লেবাননে আক্রমণ চালাচ্ছে ইসরায়েল। বৈরুতের দক্ষিণে শহরতলি, দক্ষিণ লেবানন ও পূর্ব লেবাননের বিভিন্ন স্থানে তারা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গতকাল বৈরুতের দক্ষিণের শহরতলির বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়তে বলেছে। তাদের লেবাননের রাজধানীর উত্তর ও পূর্ব দিকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
ইরানের হামলার কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করে বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিকটস্থ নিরাপদ ভবনে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দেশটির সরকার। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার জবাব দেওয়ার কথা বলার প্রায় এক ঘণ্টা পর এই সতর্কতা জারি করা হল। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত বলেছিল, তারা বৃহস্পতিবার ইরান থেকে আসা ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৩১টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি ড্রোন দেশটির ভূখণ্ডে আছড়ে পড়ে বলেও তারা নিশ্চিত করে।
চুপ থাকলে ইইউ দেশগুলোকে মূল্য দিতে হবে : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো নীরব থাকলে আগে বা পরে হোক এর মূল্য দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র। স্পেনের সমপ্রচার মাধ্যম টিভিইকে গতকাল মুখপাত্র ইসমাইল একথা বলেন।
তবে ইরানে ক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করে হামলা চালানোর অনুমতিও দেননি। চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন মানুষকে আশ্বস্ত করার জন্য আজ এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার ওই সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করেন। সেখানে তিনি বলেন, আমার লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থে শান্ত ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব দেওয়া। যত চাপই থাকুক, আমাদের মূল্যবোধ ও নীতির পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর শক্তি থাকতে হবে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার একটি লক্ষ্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। তিনি আরো জানান, ইউক্রেন সংকট, তথ্য নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল হুমকি নিয়ে আয়োজিত রাষ্ট্রদূতদের এক গোলটেবিল বৈঠকে বোঝা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের মধ্যেই মতপার্থক্য রয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা ২০ হাজার নাবিক ও ১৫ হাজার যাত্রী : যুদ্ধের মধ্যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার নাবিক ও ১৫ হাজার ক্রুজ শিপ যাত্রী আটকা পড়েছেন বলে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্রবিষয়ক সংস্থা (আইএমও) জানিয়েছে। সংবাদ সংস্থা এএফপিকে একথা জানিয়েছে আইএমও। জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী এ সংস্থার মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ বলেছেন, আক্রান্ত নাবিকদের নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে আইএমও সকল অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। শনিবার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আইএমও ওই অঞ্চলে জাহাজে হামলা সংক্রান্ত সাতটি ঘটনা রেকর্ড করেছে। যার ফলে দুইজনের মৃত্যু ও সাতজন আহত হয়েছেন।
হরমুজ প্রণালি : ইরান এরই মধ্যে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি প্রায় অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ইরান এবং ওমানের মাঝের এই সরু জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ দিয়ে কোনও জাহাজ যাওয়ার চেষ্টা করলেই তাতে হামলা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে ইরান। ড্রোন হামলা চালিয়ে কয়েক মাস তা ধরে অচল করে রাখার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দারা এমন কথাই বলছেন। তবে যেভাবে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইরান, তা আর কতদিন তারা চালিয়ে যেতে পারবে, সেটি এখনও স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যে ৬টি জাহাজে হামলার পর বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
ইরানের যদি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ফুরিয়েও যায়, তবে তারা সমুদ্র মাইন ব্যবহারের পথে হাঁটতে পারে। সমুদ্রপথের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা গোয়েন্দা সংস্থা ‘ড্রায়াড গ্লোবাল’–এর মতে, ইরানের কাছে ৫ থেকে ৬ হাজার মাইন রয়েছে। যদি হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিছানো হয়, তবে তা পরিষ্কার করে পথটি নিরাপদ করতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। সেটিই হবে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মূল কারণ। চলতি সপ্তাহেই অপরিশোধিত তেলের দাম ১২ শতাংশ এবং ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।












