বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করার পদক্ষেপ নিতে হবে

| বৃহস্পতিবার , ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

ঋণাত্মক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের নাজুক পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থবিরতা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। বলা যায়, দেশের অর্থনীতি নানামুখী সংকটে জর্জরিত। নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দা চলছে। চালু কলকারখানাও একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেকারের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির এমন নেতিবাচকতার প্রভাব পড়ছে কর আদায়ে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে ক্ষয়িষ্ণু ব্যবসায়িক অবস্থার প্রেক্ষাপটে নানান চ্যালেঞ্জ নিয়ে চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি দুরবস্থায় থাকলে তার অপছায়া পড়ে জনজীবনে। ভালো থাকে না সাধারণ মানুষ। রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা থাকলে অর্থনীতির জন্য দুঃসংবাদ বয়ে আনে। অর্থনীতি ভালো না থাকলে অসুস্থ রাজনীতি দেশ ও জাতির জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ী মহল ও অর্থনীতিবিদরা আশা করছেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলে অর্থনীতি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, ২০২৫২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাইডিসেম্বর) রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকটএই তিন চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ২০২৪২৫ অর্থবছরের শুরুতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে শ্লথগতি দেখা দিয়েছিল, তার রেশ এখনো চলছে। শিল্পবিনিয়োগের এমন দুরবস্থার জন্য অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মূলত দায়ী করছেন ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং ঋণপ্রবাহ অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়াকে। এ ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মুদ্রাস্ফীতি, বিদ্যুৎজ্বালানি সংকটসহ আরো অনেক কারণেই দেশের শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্য ধুঁকছে। অর্থনীতি ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বরাত দিয়ে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। অথচ এ সময় রাজস্ব আয়ের তিনটি খাতে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৪৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে।

এই খাতে ঘাটতি ২৩ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। আমদানি পর্যায়ে ঘাটতি হয়েছে ১২ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। ভ্যাট খাতে ঘাটতি হয়েছে ১০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের রাজস্ব আয়ের এমন চিত্র ভোগাবে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারকেও। তথ্যউপাত্ত বলছে, মানুষের আয় বাড়ছে না। সরকারি হিসাবে বিদায়ি বছরের ডিসেম্বর মাসেও মূল্যস্ফীতি আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। নভেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশ ছিল, ডিসেম্বরে যা আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে। অর্থাৎ মাসিক ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদহার বহাল রেখে মূল্যস্ফীতি কমানোর যে নীতি, তা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের ব্যবসায়ীউদ্যোক্তারা বলছেন, সার্বিক অর্থনীতির গতিই মন্থর। এখানে প্রবৃদ্ধি কমবে, রাজস্ব কমবেএটিই স্বাভাবিক। একটি অস্থির সময়ের অর্থনীতি স্বাভাবিক সময়ের মতো উচ্চ বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটবেএমন ভাবার কোনো কারণ নেই। তাঁরা জানান, সামনেই নির্বাচন। ওই সময় পর্যন্ত সবাই অপেক্ষা করছে। রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সার্বিক ব্যবসা ও অর্থনীতিতে একটা গতি আসতে পারে। তখন রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বেকারত্ব কমানো। কর্মসংস্থান বাড়াতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের সুফল এখনো দৃশ্যমান নয়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি, শিল্প খাতে মন্দা এখনো প্রকট। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ যথেষ্ট কম। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়েনি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি বাড়ানোর সঙ্গে এগুলো সম্পর্কিত।

দেশে গড়ে ২৪ দশমিক ০৫ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। এ পরিস্থিতিতে দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি দেশের টেকসই উন্নয়নেও নিতে হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। জরুরি ভিত্তিতে দেশের সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে