জন্ম থেকে শৈশবে যে হাতটি ধরে আমরা হাঁটতে শিখেছি, যে বুকটি ছিল সন্তানের সব ভয় আর আবদারের পরম আশ্রয়, জীবনের শেষ অপরাহ্নে এসে সেই মানুষগুলো কেন একা হয়ে যান? এই প্রশ্নটি আজ আমাদের আধুনিক সভ্যতার কাঠগড়ায় প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে আমাদের জীবন। বরফ বিক্রেতার যেমন সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে পুঁজি নিঃশেষ হয়, হায়াতও ঠিক তেমনি। শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং প্রৌঢ়ত্বের ধাপ পেরিয়ে অবধারিতভাবে আসে বার্ধক্য। শৈশব কাটে বাবা–মায়ের স্নেহের ছায়ায়, আর যৌবন কাটে অদম্য স্বাধীনতায়। কিন্তু বার্ধক্যে এসে মানুষ আবার সেই শৈশবের মতোই পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ধর্মীয় ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাবা–মায়ের অধিকার সবচেয়ে উপরে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন ইবাদতের পাশাপাশি বাবা–মায়ের প্রতি উত্তম আচরণ করার জন্য। বাবা–মায়ের সেবার সুযোগ পাওয়া একজন সন্তানের জন্য অনেক বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার।
একজন বাবা–মায়ের কাছে তাঁর ঘর শুধু ইট–কাঠের দেয়াল নয়, এটি তাঁর জীবনের প্রতিটি স্মৃতি, সন্তানের প্রথম কথা বলা, তার বড় হয়ে ওঠা এবং হাজারো ত্যাগের নীরব সাক্ষী। বৃদ্ধ বয়সে যখন তাঁদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তখন তাঁরা কেবল ঘরই ছাড়েন না, নিজের অস্তিত্ব ও শিকড় থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। হাজারো মানুষের মাঝেও তাঁরা নিজেদের পরজীবী, অসহায় মনে করেন। তাঁদের চিন্তা–চেতনায় প্রশ্ন জেগে ওঠে, আমরা কি তবে সারাজীবন সন্তানের কাছে বোঝা হয়েই থাকবো? এই আত্মগ্লানি তাঁদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থাকে দ্রুত অবনতির দিকে নিয়ে যায়। তাঁদের মনে পড়ে, এক সময় তাঁরাই ছিলেন এই পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
আমারা ভুলে যাই আজকের এই অবস্থান বাবা–মায়ের সেই সময়ের বিনিয়োগের ফসল যখন তাঁদের নিজেদের কোনো ‘পার্সোনাল লাইফ’ ছিল না। সারাজীবনের অর্জন সন্তানের জন্য ব্যয় করে তাঁরা গড়েছেন সন্তানের ভবিষ্যৎ। অথচ অনেক সন্তান প্রতিষ্ঠিত হয়ে ভুলে যায় বাবা–মায়ের এই ত্যাগের কথা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁরা অসহায় হয়ে পড়েন, নীরবে রাতে প্রার্থনায় দু’হাত তুলে কাঁদেন সন্তানের মঙ্গল কামনায়। তাঁদের অন্তরাত্মা নীরবে কাঁদে। প্রজন্মের দূরত্ব ও মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে সন্তানরা বাবা–মায়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয় বৃদ্ধাশ্রম। কিছু ক্ষেত্রে অসুস্থতা বা বিশেষ সেবার প্রয়োজনে বৃদ্ধাশ্রম জরুরি হতে পারে, তবে দায়িত্ব এড়ানোর একটি ‘ভদ্রোচিত মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এখন। আমরা সন্তানদের জন্য সেরা স্কুল খুঁজি, কিন্তু বাবা–মায়ের জন্য সেরা সেবা নিশ্চিত করতে পারি না। ভুলে যাই, এক সময় তাঁরাও আমাদের জন্য সেরা পথটি খুঁজেছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের প্রকৃত ওষুধের নাম হলো ‘সময়’ এবং ‘আপনজনের সান্নিধ্য’। শত কষ্ট সহ্য করেও তাঁরা প্রিয় সন্তান ও নাতি–নাতনিদের সান্নিধ্যে থাকতে চান।
বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা একমাত্র নেতিবাচক নয়। নির্যাতিত, নিঃসঙ্গ বা সম্পূর্ণ অসহায় প্রবীণদের জন্য এটি অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ আশ্রয়। উন্নত দেশগুলোতে প্রবীণ নিবাস সুসংগঠিত সামাজিক কাঠামোর অংশ। তবে আমাদের বাস্তবতায় এটি প্রায়ই সহজ সমাধান হয়ে ওঠে। খাদ্য, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করলেই দায়িত্ব শেষ, এমন ভাবনা গভীরভাবে ভ্রান্ত। কারণ বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বস্তুগত নয়, প্রয়োজন মানসিক সংযোগ, কথোপকথন, আদর, মায়া, স্পর্শ, সম্মান এবং অনুভূতির অংশীদারিত্ব।
মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব শারীরিক অসুস্থতার মতোই ক্ষতিকর। বার্ধক্যে নিঃসঙ্গতা বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশ এবং নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রবীণরা যখন নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে করেন, তখন তাঁদের আত্মমর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিবার যদি তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে অগ্রাহ্য করে, তবে তাঁরা ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাই পরিবারে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রবীণদের মতামত নেওয়া উচিত। এতে তাঁরা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। সজ্জিত কক্ষ বা নিয়মিত ওষুধ সেই আবেগঘাটতি পূরণ করতে পারে না।
সমাধান কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ নয়, প্রয়োজন সুসংগঠিত সামাজিক উদ্যোগ ও পারিবারিক সচেতনতা। পারিবারিক শিক্ষায় দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ জরুরি। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে, বাবা–মা বোঝা নন, কোনো ব্যবহার্য বস্তু নন, যাঁদের প্রয়োজন শেষে সরিয়ে রাখা হবে। তাঁরাই এই পরিবারের শিকড়, বটবৃক্ষ।
বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রকেও প্রবীণবান্ধব নীতিমালা জোরদার করতে হবে। সর্বজনীন পেনশন, সহজপ্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা ও কমিউনিটি সাপোর্ট সেন্টারের সমপ্রসারণ অপরিহার্য। নগর পরিকল্পনায় বহুপীড়ী বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে প্রবীণরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন না হন। আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের তরুণই আগামী দিনের প্রবীণ। আমরা যে আচরণকে স্বাভাবিক করছি, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেটিই অনুসরণ করবে। পরিবারে অবহেলার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে তা ধারাবাহিকভাবে সমাজে ছড়িয়ে পড়বে। তাই এটি কেবল একটি প্রজন্মের সংকট নয়, এটি নৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন।
বৃদ্ধাশ্রম সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা বাস্তবসম্মত নয়, এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয় সহায়ক ব্যবস্থা। কিন্তু সেটি যেন হয় বিকল্প, প্রথম সিদ্ধান্ত নয়। বাবা–মায়ের জীবনের শেষ অধ্যায় হোক সম্মান, সান্নিধ্য ও ভালোবাসায় পূর্ণ। একটি জাতি তখনই সত্যিকারের উন্নত হয়, যখন তার প্রবীণরা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও আবেগগতভাবে সংযুক্ত জীবনযাপন করেন। উন্নয়নের পথে এগোতে গিয়ে যদি বাবা–মায়ের চোখের জল আড়ালে পড়ে থাকে, তবে সেই অগ্রগতি অপূর্ণ। কারণ মানুষ তার সম্পদ বা অর্জনে বড় হয় না, মানুষ বড় হয় তার দায়িত্ব পালনে, মা–বাবাকে সম্মানিত করতে পারলে।
বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারের ভালোবাসাই হোক বাবা–মায়ের শেষ আশ্রয়, শেষ ভরসা, শেষ আলো। বাবা–মায়ের শেষ বয়সটা হোক নাতি–নাতনির গল্পে, চেনা বারান্দার আড্ডায় আর পরম মমতায় ভরা। বৃদ্ধাশ্রম হোক নিরাশ্রয় মানুষের জন্য, কিন্তু কোনো সন্তানের কাছে যেন এটি বাবা–মাকে বিদায় করার সহজ রাস্তা না হয়। মনে রাখা প্রয়োজন, সময় চক্রাকার। আজ আমরা আমাদের বাবা–মায়ের সঙ্গে যে আচরণ করছি, কাল আমাদের সন্তানরাও তা–ই শিখছে এবং একই আচরণ একদিন আমাদের সঙ্গেও হবে। সব বৃদ্ধাশ্রম অবহেলার ফল নয়, কিছু ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবা। নিঃসন্তান বা সম্পূর্ণ অসহায় প্রবীণদের জন্য এটি আশ্রয় হতে পারে। কিন্তু যখন বাবা–মা সন্তান থাকা সত্ত্বেও সেখানে আশ্রয় নেন, তখন বিষয়টি কেবল সামাজিক নয়, নৈতিক সংকটও বটে।
আমাদের সংবিধান পরিবারকে সমাজের মৌলিক একক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একইভাবে টহরঃবফ ঘধঃরড়হং প্রবীণদের অধিকার সুরক্ষায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু আইন ও নীতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো পারিবারিক মূল্যবোধ, নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারে বসবাসকারী প্রবীণরা তুলনামূলকভাবে কম বিষণ্নতায় ভোগেন। নাতি–নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানো প্রবীণদের জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। প্রবীণরাই পারিবারিক ইতিহাস। পরিবারে প্রবীণবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, কর্মব্যস্ত জীবনে নির্দিষ্ট সময় বাবা–মায়ের জন্য বরাদ্দ রাখা, সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে প্রবীণদের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা সমপ্রসারণ জরুরি। সন্তানের ঘর যদি ভালোবাসা, সম্মান ও যত্নে পূর্ণ হয়, তবে সেটিই হবে বাবা–মায়ের প্রকৃত স্বর্গ। একটি জাতি তখনই উন্নত হয়, যখন তার প্রবীণরা অবহেলার নয়, সম্মানের প্রতীক হয়ে ওঠেন। আধুনিকতার সঙ্গে মানবিকতাকে যুক্ত করি। বাবা–মায়ের জন্য আলাদা একটি কক্ষ নয়, আলাদা একটি হৃদয় তৈরি করি, যেখানে তাঁরা নিরাপদ, সম্মানিত এবং ভালোবাসায় আবদ্ধ থাকবেন। ঘরই হোক বাবা–মায়ের শ্রেষ্ঠ স্বর্গ। এই স্লোগানে মুখরিত হোক প্রতিটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র।
লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক।









