যেকোনো ধরনের প্রচার বিজ্ঞাপন নয়, বিজ্ঞাপন একধরনের প্রচার। মিডিয়া যখন কোনো নির্দিষ্ট শব্দবন্ধনী ব্যবহার করে তা কি প্রচার নাকি বিজ্ঞাপন? ভাববার বিষয় বটে। যোগাযোগ ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে থিউরিগুলো অনেকটা আচারের মত। পাঁচফোড়ন থাকে। মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞানের মতো হরেক বিষয়ের মিশেল। তবে যোগাযোগই আদিরূপ হওয়ায় এর গূঢ় সত্যটা হলো, মানুষ এবং তার মন। যদিও কয়েক ডজন থিউরিতেই দর্শককে সক্রিয় ধরা হয়, বাকি সব ক্ষেত্রে দর্শক নিষ্ক্রিয়। খেয়াল করলে দেখা যায়, সেখানেও দর্শককে সক্রিয় দেখানো হয়েছে কেবল স্বার্থ রক্ষার্থে। অর্থাৎ দর্শক ততটাই সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় যতটা প্রয়োজন। হুজুগে মানুষদের ক্ষেত্রে এটা খাটে ‘মাসি শিশুকে ভাত গেলাচ্ছেন’ ধারায়। এ সমস্ত থিউরির বাস্তব রূপ দেখা যায় ‘ক্লিক বেইট জার্নালিজম’–এ।
বিজ্ঞাপন কলা, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতার স্নাতকোত্তরের ক্লাস চলছে। শিক্ষিকা শুরু করলেন অনেকটা এভাবে, রবি ঠাকুর প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞাপন তৈরির সাথে যুক্ত ছিলেন। যখন বাজারে নতুন ব্রিটিশ কালি খুব চলছে, দেশীয় কালির মার্কেট পেতে রবি ঠাকুরের কাছে হাত পাতা হলো। যথারীতি তিনি লিখলেন, সুলেখা কালি। এই কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো।
হুরহুর করে বাজারে বেড়ে গেলো বিক্রি। ক্লাসিক বিজ্ঞাপনের উদাহরণ টেনেছিলেন শিক্ষিকা। কিন্তু বাঙালির কলঙ্কের ধারণাকে এত সুন্দর করে বিজ্ঞাপনে কাজে লাগানো সত্যিই দুরূহ। কিন্তু কলঙ্কের রঙ লাল না হয়ে কালোই হলো কেন?
সুযোগের অভাবে আমরা ভালো, সকল কুকীর্তি করার ক্ষেত্রেও পাক্কা। সমস্যা শুধু লোকলজ্জায়। লোকে কি বলবে। ধরুন ঘুষ নেওয়া, দুর্নীতি করা, অন্যকে অপহরণ কিংবা চুরি ডাকাতিকে সচারাচর খারাপ কাজ বলে গণ্য করা হয় কিন্তু ঐ যে সুলেখা কালির তীব্র কালো দাগ তখনই পড়ে যখন সেটা হয় প্রেম বা বলা যায় যৌন সম্পর্কিত বিষয় হলে।
দিন–দুপুরে হোটেল রুমে নারী–পুরুষ আটক, অবৈধ প্রেম, মেলামেশা, পরকীয়া, দ্বিতীয় স্ত্রী রেখে পালালেন স্বামী, প্রবাসী স্ত্রীর প্রেমিককে হত্যা, সুগার ড্যাডি…ইত্যাদি শব্দব্যবহার, ফলে মিডিয়ায় প্রচার হওয়া স্বাভাবিক। কেননা লোকে এগুলো খায়, এসবে একধরনের হরমোনাল ডিসচার্জ হয়। পেছনে রয়েছে সমাজে কলঙ্কের ধারণাকে এস্টাব্লিশমেন্টের রাজনীতি।
বিয়ে বিষয়টা একধাপ এগিয়ে আছে এখানে। সম্পূর্ণ সমাজকাঠামোকে পরিচালনার সূক্ষ্ম চাবি বিয়ে। সামাজিক আচারের অক্ষুণ্নতা বজায় থাকে বিয়েতে। কিন্তু বিয়ে খুব অসুন্দর বিষয়ও না তাই আধুনিকতার ছাঁচে এর নানাবিধ পরিশোধিত রূপ আমরা দেখি। বিয়ের বিজ্ঞাপনও ফলে বিচিত্র। পোশাক, ডেকোর, বাজনা, সাজ সবকিছুতেই বিজ্ঞাপনের সাহায্যে নতুন ধারাগুলোর এস্টাব্লিশমেন্ট হচ্ছে কিন্তু পুরানো কিছু প্রচারপ্রথাও জিইয়ে রাখা হয়েছে।
‘বিয়ের আসর থেকে পালালেন কনে’, ‘যৌতুকের টাকা না পাওয়ায় বিয়ের আসরে দুই পক্ষের সংঘর্ষ’, ‘পরকীয়া থেকে বিয়ে, যেভাবে বদলে গেল অমুকের জীবন’… এইসব ক্ষেত্রে সমাজের দৃষ্টিকোণে কলঙ্কের দাগকে আরো গভীর থেকে টান দেওয়া হয়। ফলে আপনি চাইবেন না বিয়ে সম্পর্কিত এমন কোনো নিউজের কভারে আসতে। কারণ এইসকল ঘটনাগুলোতে সম্মানহানি হয়। কিন্তু বিয়ের তৈজসগুলো আদতে কী?
আমাদের এখানে বিয়ের অর্থই আমৃত্যু অববাহিকায় উন্মুক্ত তরী বাওয়া একটি পরিবার। যেখানে দুজনের একান্ত কামরা নেই। যে নদীর পানি কখনো শুকাতে নেই, যে নদীতে তরী ডুবতে নেই। ফলে স্বামী–স্ত্রী দুজনের একান্ত সময়গুলো গোগ্রাসে গিলে ফেলে পাড়া–পরিবার, নদীর ধারে বসে হৈ–হুল্লোড় করে বাদাম চিবিয়ে। স্থবির সময়তে জন্ম নেওয়া স্মৃতিগুলো কখনো বিষে ভরে ওঠে, কখনো সুখেও।
বিয়ের তৈজসের প্রথম উপকরণ হওয়া উচিত ছিল সম্মতি। চাহিদা থেকে সম্মতির এই পথে দ’জনের পথচলা হতে পারতো একান্ত। দুটো গোষ্ঠীর মেলবন্ধনের চাহিদা মেটাতে সম্মতির মত জরুরি উপকরণ ঢাকা পড়ে গেছে, তরুলতার মতো ভরে গেলো ‘অনুমতি’–র ডালপালা।
এখানে একটু স্বার্থপরের মতো বলাই বাহুল্য, ডালপালায় থাকা সবচেয়ে নাজুক পাতাটি নারী। তার কলঙ্কই এখানে খাঁটি কলঙ্ক। কি জানি, রবি ঠাকুর নিশ্চয় কালির নামের সাথে মিলিয়েই ভেবেছিলেন ক–তে কালি, ক–তে কলঙ্ক। আর সুলেখাতে সুন্দরী রমণী।
ধীরে ধীরে আমরা ফিরেছি। অনেক প্রথা থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। কিন্তু যৌতুক, বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ থেকে আমাদের ফেরা হয়নি। সে তরী মরা নদীতেই ভেসে চলছে বহুকাল।
বিয়ের তৈজসের প্রথম এবং অন্তিম উপকরণ হতে পারতো ভালোবাসা। রবি ঠাকুরই লিখেছিলেন, ‘এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না। শুধু সুখ চলে যায়। এমনি মায়ার ছলনা’ প্রেম–ভালোবাসার সন্ধানে, চিরকাল সুখী হতেই লোকে বিয়ে করে না। বিয়ে এখানে একটি বিজ্ঞাপন। একটি এস্টাব্লিশমেন্ট। মায়ায় জড়ালে ফলে সম্মতিটুকুই লাগে, অনুমতি অনুমেয়। ‘জিনিস যেটা ভালো, দাম তার একটু বেশি’–র মতো প্রচারগুলো চালানোই হয় আমাদের বোঝাতে ভালো কিছুর জন্যে বিসর্জনটাও বেশি, অল্পতে ভালো জিনিস মেলে না, নির্ভরযোগ্য নিশ্চিত প্রাপ্তি বলে কিছু নেই। দাম দিয়ে কিনে নাও। কিন্তু বিয়ে তো নদীর মত সুন্দর, দরকষাকষি করে নিশ্চয় মাঝি তরী বাইতে পারেন না। স্রোতের অনুকূলে প্রতিমুহূর্তে মন–প্রাণ দিয়েই তো মাঝি ঘাটে ফিরেন বারে বারে।
হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, প্রত্যেক প্রেমই প্রথম প্রেম। অর্থাৎ প্রেমে পড়া স্বচ্ছ–সুন্দর অনুভূতি। কিন্তু তিনি বিয়ের ক্ষেত্রে এমনটা বলতে পারতেন না। কেননা ফর্দ করে সই হওয়া মানেই একধরণের চুক্তি। চুক্তিতে শর্ত থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। বিড়ম্বনা বরং এতে যে, মানুষ সকল শর্তের ঊর্ধ্বে ভালোবাসা চায়।
চুক্তির শর্তে ফলে সমাজের সুবিধা হয়, সম্মতি থেকে অনুমতির রাস্তাটা পার হওয়া যায়।
ভালোবাসায় সম্মতি লাগে, জানান দিতে হয় এগোতে চাই তোমার সাথে। কিন্তু সভ্য–সুন্দর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে লাগে অনুমতি। অনুমতি ফলে বিয়ের তৈজসের অত্যাবশ্যকীয় সাপ্লিমেন্টারি অপশন হতে পারে। এখানে শর্ত হলো এই অনুমতি একান্ত দুজনের। পাড়া–পরিবারের নয়। প্রশ্ন থাকতে পারে, দুজনের একজন তো অনুমতি নাই দিতে পারে তাই বলে কি দমবন্ধে থেকে যাব? বেশি কিছু না, পরামর্শ দেওয়া যায় কাপল কাউন্সেলিং–এর। ফলে এখানেও সম্মতি ক্রমে অনুমতি আদায় হওয়াই মুখ্য।
ঐ যে বললাম, এই সম্মতি বনাম অনুমতিতেও সমাজের প্রচার আছে,বিজ্ঞাপনের সুপারিশ আছে। বাঁধাধরা গল্প আছে।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির বিষয়টিকে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ওপর দেওয়াকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট মামলা করেছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতির আবেদন করেছিলেন।
আইনজীবীদের মতে, এতে ওই আইনজীবী কার্যত মুসলিম পারিবারিক আইনে বহুবিবাহকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়টিকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন। কিন্তু রিটটি গত বছর ২০শে অগাস্ট খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। (বিবিসি)
মূলত কিছুদিন যাবত বেশকিছু সংবাদমাধ্যম “ফটোকার্ড”–এর মাধ্যমে ক্লিকবেইট নিউজ ছড়িয়েছে এমন, “দ্বিতীয় বিয়েতে লাগছে না প্রথম স্ত্রীর অনুমতি।” হুজুগে বাঙালি মুহূর্তেই ভাইরাল করে দেয় এই নিউজ। আদতে খারিজ হওয়া সেই প্রতিবেদনে একান্ত সেই রিট খারিজ হয়েছে, বিয়ের সানাই বাজেনি।
বিবিসি জানাচ্ছে, ফৌজদারি দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা অপরাধ ও শাস্তির বিধানও আছে। তবে সালিশি পরিষদের সিদ্ধান্ত থাকলে এটি কার্যকর হবে না।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করে তাহলে তাকে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হবে।
“এভাবে পরিশোধ না হলে বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হইবে; এবং এই অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হইলে এক বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় প্রকার দণ্ডের’’ বিধান আছে।
আবার ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী পুনরায় বিয়ের জন্য আরবিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিশি পরিষদের অনুমতি নিতে হবে এবং এই পরিষদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করা যাবে না।
কিন্তু ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন অনুযায়ী বিবাহ রেজিস্ট্রেশন না করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশে বিয়ের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি করার জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর রেজিস্ট্রি করতে হলে সালিশি পরিষদের অনুমতি নিতে হবে। আবার এ অনুমতির আবেদনের শর্তগুলোর মধ্য একটি হলো বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে মুসলিমদের যে আইনের আওতায় বিয়ে সম্পন্ন হয় সেটি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন। এই আইনে বলা আছে পুনরায় বিয়ের আবেদনের সাথে তিনটি বিষয় থাকতে হবে।
এগুলো হলো–সরকারি ফি, কেন তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাচ্ছেন সেই ব্যাখ্যা আর বলতে হবে যে বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি আছে কি–না ।
এসব বিষয়ের ভিত্তিতে আরবিট্রেশন কাউন্সিলে আলোচনার পর কাউন্সিল আবেদনটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত মনে করলে পুনরায় বিয়ের জন্য শর্তহীন বা শর্তযুক্ত অনুমতি দিতে পারে।
কিন্তু কোনো বিশেষ কারণে সালিশি এই অনুমতি দেয়? এক্ষেত্রে বিষয় তিনটি, বন্ধ্যাত্ব, শারীরিক–মানসিক অক্ষমতা, নিখোঁজ থাকা। হায়, নারীর জন্যেও কি এমন আইন আছে? নাকি দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও নারী থেকে যাবেন সংসারে? কেননা এই সমস্ত কিছু যদি নারীর দ্বারা হতো, তাহলে কি কলঙ্কের কালি সুলেখার কালিকে হার মানাতো না?
নিশ্চয় হার মানাতো, কেননা দু’জনের একান্ত অনুমতির বিষয়টাও সমাজ একপাক্ষিকভাবে পুরুষ আর মোড়লের হাতে তুলে দিয়েছে। সমাজের খাতায় কোনো ক্রমেই নারীর জন্যে এই অনুমতি নেই। তাদের জন্য আছে শুধু ভর্ৎসনা।
বলি কি, বিয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ তৈজসগুলো নিজেই বাছাই করুক নারী। নিজের রুচি নিয়ে, ইচ্ছা নিয়ে।
সম্মতির পর যে যাত্রা শুরু হয়, সেখানে তো জোরাজোরির কিছু থাকে না, উভয়ক্ষেত্রের জন্যেই তো কিছু নির্দিষ্ট সীমানা, ভাবনা নিজেরাই তৈরি করা যায়। কতদূর দেব পাড়ি?
যেকোনো সামাজিক–ধর্মীয় আইনেই নারীর সম্মতির চেয়ে অনুমতির একটা নাটক সাজানো থাকে। যে যেতে চায়, যার মন নেই তাকে সম্মতিরই বা কি আছে? কিইবা আছে অনুমতির?
আপাতত নারীদেরই বলছি, প্রচার, প্রচারণা, বিজ্ঞাপনের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসুন। হারানোর চেয়ে, পাওয়ার কষ্টটাই এখানে বেশি।












