আমাদের পাড়ায় পাঁচটি ফুটফুটে কুকুর ছানার জন্ম লাভ করেছে। ছানাদের মা সময়ে সময়ে আসে। বাচ্চাদের দুধ পান করায়। আবার নিজের খাবারের খোঁজে এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। ছানাগুলো মাকে পেলে নিজেদের আনন্দে ছুটোছুটি করে। আবার কখনো একটুখানি মাকে অনুসরণ করে ফিরে আসে নিজেদের জায়গায়।
পাড়ার মধ্যিখানে বিশাল মাঠ। সারাবেলা পাড়ার ছেলেমেয়েরা এই মাঠে হই চই আনন্দে মশগুল থাকে। কখনো মাঠে বসে শীতের সকালে মিষ্টি রোদের তাপ অনুভব করে বুড়োরা। ছোটদের কেউ কেউ ক্রিকেট খেলে, কেউবা ফুটবলে পা ছুঁয়ে ছুটোছুটি করে। সবার বিশেষ নজর থাকে কুকুর ছানাদের গায়ে যেনো বল বা খেলনাপাতি গায়ে না পড়ে। এমনিতে নাদুস–নুদুস প্রাণি, তার ওপর তারা বেশ অবুঝ। দেখতে দেখতে ছানাগুলো শিশুদের সাথে খেলার মেলায় যোগ দিতে শুরু করে। এদের তিড়িং বিড়িং নাচ আর মৃদুস্বরে ডাক সকলের ভালো লাগে। কিন্তু ছানাদের মা কুকুরটিকে কেউ ভালোবাসে না, যে কোনো কারণ ছাড়াই মাঠে ঘাস খেতে আসা ছাগল, বেড়াকে কামড়ে দেয়, কারো পালিত মুরগিকে ধরবে বলে তাড়া করে ফিরে। পাড়ার লোকেদের প্রিয় বিড়াল মিশুকে কতবার তাড়া করেছে। মিশু প্রাণ ভয়ে ছুটতে ছুটতে কখনো গাছের ডালে চড়ে বসে, কখনো বা ঝোঁপ ঝাঁড়ে লুকিয়ে প্রাণে রক্ষা পায়। শেষমেশ ক’দিন আগে মিশুর বেখেয়ালে কুকুরটি তাকে সজোরে কামড়ে ধরে আছাড় মারে। ও সময় মাঠের শিশু কিশোররা ছুটে এসে কোনমতে মিশুকে রক্ষা করে।
অথচ মিশু অতি শান্ত, মা কুকুর যখন বাইরে যায় তখন মিশু অনেকটা মায়ের মমতায় কুকুর ছানাগুলোকে দেখে রেখেছে। মুখে করে খাবার কুড়িয়ে এনে খাইয়েছে। কখনো ছোটখাট আঘাতে ব্যথায় ঘেউ ঘেউ করলে মিশু ছুটে এসে ব্যথাতুর ছানাকে জিহ্বা চেটে স্নেহ করেছে। যখন মা কুকুর ছুটে আসে অমনি মিশু প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যায়।
মিশুর মিউ মিউ ডাক পাড়ার লোকেদের অনেকটা চেনা। পাড়ার লোকেরা একে মাছের ছাটাছুটো কিংবা দুধ মাখা ভাত দিলে তা মুখে করে ছানাদের কাছে রেখে আসে। ছানাগুলো তা জিহ্বা চেটে খায়। কখনো মা কুকুর গন্ধ শুঁকে তার কিছু খেয়ে নেয়।
একদিন অঝোর ধারার বৃষ্টি শুরু হলো, এমনিতেই শীতকাল। তার ওপর এই বৃষ্টিতে শীতের মাত্রা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মা কুকুরটি কোথায় যে গেছে ফেরার নাম গন্ধ নাই। এদিকে বৃষ্টি জমে মাঠে পায়ের পাতা ডোবার মত জল জমে গেছে। ছানাগুলো ঘেউ ঘেউ শব্দ করছে আর শীতে বেশ কাঁপছে।
বেলা গড়িয়ে আসে। তবু ফিরেনি মা কুকুর। এ সময় কী যেন ভেবে মিশু ছানাগুলোকে মুখ দিয়ে টেনে টেনে মাঠের এককোণে তুলনামূলক শুকনো স্থানে নিয়ে আসে। আর মুখে করে খাবার কুড়িয়ে এনে ছানাদের দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু একটি ছানাকে কিছুতেই খাওয়ানো যাচ্ছে না। সে শুধু কেঁপে কেঁপে বৃষ্টি জলে গড়িয়ে পড়ছে। এভাবে রাত্রি নেমে এলো। সারা রাত ঝিঁ ঝঁ ভাড়া করে। ছানাদের ঘেউ ঘেউ স্বর আর হালকা বৃষ্টির শব্দ ভেসে আসে।
পরদিন অতি ভোরে মা–কুকুরের আর্তনাদ করা শব্দ শুনে প্রতিযোগীরা জেগে ওঠে। মা কুকুরটি তার দুটি ছানাকে খুঁজে পাচ্ছে না। অপর তিনটি ছানা মায়ের দুধ পান করছে আর একটু একটু কাঁপছে। এসব মা কুকুরের কান্নার স্বর বাতাস ভারী করে তোলে। গ্রামবাসীদের কেউ কেউ বৃষ্টি জলে পা নাড়িয়ে দেখছে হারানো ছানা দুটি ডুবে গেলো কিনা। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না।
ক্রমে রাস্তা আলো ছড়িয়ে সূর্য মামা সময়ের সাথে ছুটছে। কেউ কেউ কুকুর ছানা দুটির জন্য হায় হায় করছে। এ সময় একজন লোকের চোখ পড়ে অদূরে। পাড়ার সবার পছন্দের বিড়াল মিশু অনেকটা নিঃশব্দে কী যেন ঠোঁটে চেপে টানছে। অমনি লোকটির ডাকে পাড়ার লোকে এসে দেখল কাছের এক ঢেবায় ডুবতে বসেছে কুকুর ছানা দুটো। এদের টেনে তোলার জন্য মিশু একটি ছেড়া কাপড় এগিয়ে ধরেছে, ছানা দুটো এতে উঠতে চেষ্টা করেও পারছে না। দেখা মাত্র কয়েকজন ছেলে ঢেবায় নেমে হারিয়ে যাওয়া কুকুর ছানাটি তুলে আনে। ছানা দুটি অনেকটা কষ্টে নিজেদের স্বরে ডাকতে শুরু করে। মা কুকুর ছানাদের শব্দ শুনে কোথা হতে ছুটে চলে এলো। বিড়াল ছানা মিশু অনেকটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেল। পাড়ার লোকে তাকেও কোমল হাতে তুলে নিল। বুঝতে পারলো, তার অক্লান্ত চেষ্টায় ছানা দুটি বেঁচে গেছে। লোকের সেবায় মিশু এ ছানা দুটি সুস্থ হয়ে ওঠে। এরপর থেকে আর কখনো কুকুরটি মিশুকে দেখে আর তেড়ে আসেনি।






