বিষুব চৈত্র সংক্রান্তিতে ফোরাচেঙ্গি মেলা

রশীদ এনাম | সোমবার , ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

ইতিহাস শুধু যে জীবনের আয়না তা নয়, একটা জাতির কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও আচারআচরণ, এলাকার ইতিকথা ইত্যাদির পরিমাপকও বটে। এটা চলমান জীবনকে প্রতিবিম্ব করে বছরের পর বছর। ইতিহাস অতীতের কথা বলে অজনাকে জানার কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। পটিয়া নামের উৎপত্তি ইতিহাস জানতে গিয়ে দেখা যায় চক্রশালা গ্রামের নামটি সবার আগে চলে আসে। চাষকোলা থেকে চক্রশালা আবার ফাহিয়ান বলেন, বুদ্ধ আরাকানের চারি স্থানে চারটি ধর্মচক্র স্থাপন করেন। অনেকের মতে এ হস্তী গ্রামেই অন্যতম চক্র স্থাপিত হয়। চক্র হতে চক্রশালা রাজ্য নাম গ্রহণ করে বলে অনুমিত। দশম শতকে চট্টগ্রাম পুনরায় আরাকানের চন্দ্র রাজবংশের অধিকারভুক্ত হয় ৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানরাজ সুলত ঈং চন্দ্র নিজ অধিকৃত রাজ্যেও উত্তরাংশে চট্টগ্রামের সুলতান বিদ্রোহ দমন করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিজয়স্তম্ভে উৎকীর্ণ চিৎতৌৎ গৌং বাণী থেকে এসেছে চট্টগ্রাম। এই শতকে চট্টগ্রামে পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থাপিত হয়। পটিয়া থানার চক্রশালার নিবাসী ধর্মান্তরিত ব্রাহ্মণ সন্তান তিলপা বা প্রজ্ঞাভদ্র ছিলেন পণ্ডিত বিহারের অধ্যক্ষ। চক্রশালা গ্রামে বুদ্ধদেব এসেছিলেন। চক্রশালায় ধর্মপ্রচার ও প্রার্থনার জন্য স্থাপন করেছিলেন ধর্মশালা। বৌদ্ধদের কাছে যা তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরী বলেন, বুদ্ধ হস্তীগ্রামে (হাইদগাঁও) ধর্মচক্র প্রবর্তন করেছিলেন বলে তাঁরই স্মারকরূপে চক্রশালা নামের উৎপত্তি। বুদ্ধের জীবিতকালে চক্রশালার হস্তী গ্রামে একটি চৈত্য নির্মিত হয়েছিল। তা ফরাচেংগী/ফোরাচেঙ্গি চৈত্যে নামে খ্যাত হয়। ফরা অর্থ বুদ্ধ, চেংগী অর্থ সংঘ, বুদ্ধ সংঘ। ডক্টর প্রণবকুমার বড়ুয়া বলেন, কথিত হয় যে, প্রাচীনকালে ফরাচেংগী চৈত্য বিক্রমপুরের বহু ভিক্ষু বাস করতেন। তাঁদের মধ্যে অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞানর আত্মীয় ছিলেন। তিন তিব্বত যাত্রার প্রাক্কালে তাঁর জ্ঞাতি ও শিষ্যগণের সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্য হাইদগাঁও ফরাচেংগী চৈত্যে যাতায়াত করতেন। এক সময় ফরাচেঙ্গী চৈত্যে ধ্বংস হয়ে গেলে হাইডগম নামক একজন প্রভাবশালী আরাকানি বৌদ্ধ সেখানে বসবাস করতেন এবং তিনি আবার ফরাচেঙ্গী স্তম্ভটি নির্মাণ করেন। দেশে ফিরে একদা তিনি তাঁর ভক্তরাসহ অরণ্যরাণী শ্রীমতির তীরে হাইডমজা নামক জনৈক প্রভাবশালী ব্যক্তি আমবাগানে এসে পৌঁছলে তাকে আপন বিহারে নিয়ে যান এবং তিনদিনব্যাপী ধর্মসভা করেন। উক্ত চন্দ্র জ্যোতিঃ ওখান থেকে ফেরার পথে হাইডমজা চক্রসখানি পেতে চাইলে তিনি হাইডমজাকে সানন্দে দিয়ে দেন। পরবর্তীতে এই চক্রাসহ স্থাপনের জন্য হাইডমজার প্রচেষ্টায় হাইদগাঁও গ্রামে যে মন্দির নির্মিত হয় তাই চক্রশালা মন্দির। মন্দিরটি পরলোকগত সংরাজ আচার্য্য সংক্রান্তিতে মহামেলো বসে। যা ফোরাচেঙ্গি মেলা হিসেবে পরিচিত।

প্রতিবছর বিষুব চৈত্র সংক্রান্তি তিথিতে ৩০ চৈত্র ১৩ এপ্রিল এ মেলা বসে। উক্তমেলায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন চক্রশালা তীর্থ প্রাচীন মঠ ফোরাচেঙ্গি (হাইদগাঁও) মেলায় এসে পুণ্য লাভ, আধ্যাত্মিক উন্নতির উদ্দেশ্য পূজা অর্চনা করে থাকে। চক্রশালায় একটি মন্দির ছাড়া কোনো মন্দির ছিল না। ১৯৮৭ সালে চক্রশালা বৌদ্ধতীর্থ সংরক্ষণ কমিটি হাইদগাঁও ফরাতারা স্তূপ নবতর পর্যায়ে সংস্কার করে। কথিত আছে চক্রশালায় বুদ্ধের বত্রিশ লক্ষণ ও অশীতি অনুরঞ্জন অঙ্কিত বুদ্ধ চক্র নামক পাষাণ, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আচায্য শীল ভদ্র মহাস্থিবিরের শিষ্য দীপঙ্কর স্থবির কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে জন্য একে চক্রশালা বলা হয়। তিব্বতের তাঞ্জুর গ্রন্থে পটিয়া চক্রশালার ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে।

অনেকে মনে করত হাইডগম থেকে হাইদগাঁও। জ্ঞানতাপস ডক্টর আহমদ শরীফ বলেন হাইডগ্রাম থেকে হাইদগাঁও নামটি বিভ্রান্তিকর। হাইডগ্রাম আরাকানি নাম নয়। প্রাচীনকালে পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতি ঘোরাফেরা করত বলে এর নামকরণ হয় হস্তীগ্রাম হস্তীগ্রাম থেকে হাইদগাঁও। তবে অনেকে বলেন, সুফিসাধক হামিদ উদ্দিন গৌড়ি প্রথম বসতি স্থাপন করেছিলেন বলে তাঁর নামে হাইদগাঁও গ্রামের নামকরণ হয়।

চক্রশালা গ্রামের মধ্যেযুগের কবি কোরেশি মাগন ঠাকুরের জন্মস্থান। তাঁর পূর্বপুরুষ মক্কার কোরাইশ বংশোদ্ভূত ও পরবর্তীতে গৌড়ের অধিবাসী ছিলেন। কোরেশী মাগনে তার প্রকৃত নাম পীর বখশ খান। গৌড় থেকে চক্রশালায় এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল বড়ো ঠাকুর বড় খান রোসাঙ্গে যান। সেসময় আরাকানের রাজসভায় মুসলিম প্রভাব ছিল। মাগনের পিতা রাজদরবারের সৈন্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পিতার প্রভাবে মাগন ঠাকুর দরবারে রাজকর্মচারী পদে নিযুক্ত পান এবং বিপুল প্রতিপত্তির অধিকারী হন। মাগন ঠাকুর ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। কবি আলাওল মাগন ঠাকুরের গুণের বর্ণনা দিয়েছেন, বহুভাষাবিদ, সংস্কৃতিবান, নাট্যকার, চিকিৎসক, পিরভক্ত, দানবীর, সদালাপী, অকৃপণ, ধার্মিক, পরোপকারী ও দয়ালু হিসেবে। কোরেশি মাগন রোসাঙ্গে অবস্থানকালে চন্দ্রাবতী কাব্যখানি রচনা করেন। শাহ সুজা ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানে আশ্রয় গ্রহণের পূর্বে তিনি রোসাঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন। সেখানে মাগন সুজাউল নামে পুত্র ও ভিকন নামে ভাই ছিল। সুজাউল পরবর্তীতে রাউজানের নওয়াজিশপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। চক্রশালার হস্তীগ্রাম বা হাইদগাঁও ফরাচেংগীতে প্রতিবছর বিষুব সংক্রান্তিতে বৌদ্ধমেলা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন বৌদ্ধরা সেখানে বুদ্ধপদে পিণ্ডদান করেন। প্রাচীনকালে মনি ভদ্র নামক একজন হিন্দু রাজার রাজধানী ছিল চক্রশালা। কবি দ্বিজ ভবানী নাথ রচিত “লক্ষ্মণ দিগ্বিজয়” কাব্যসূত্রে জানা যায়, আরাকানি সামন্ত রাজা জয়চ্ছন্দের (১৪৮২১৫৩৭ খ্রি.) রাজধানীও চক্রশালায় অবস্থিত ছিল।

তথ্যঋণ : চট্টল গবেষক আবদুল হক চৌধুরী, লেখক ও গবেষক আহমদ মমতাজ

লেখক: সমন্বয় সহকারী ইতিহাসের খসড়া

পূর্ববর্তী নিবন্ধআধুনিকতায় হারিয়ে গেলো বৈশাখের মাটির গন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধইসলামী ফ্রন্ট বৃহত্তর বোয়ালখালী উপজেলা শাখার মতবিনিময় সভা