যুদ্ধ ছাড়া এক দেশের রাষ্ট্রপতি ও তার স্ত্রীকে আরেক দেশ সামরিক শক্তি বা গোয়েন্দা অভিযানের মাধ্যমে তুলে নিয়ে যায়। তারপর ব্যাখ্যা করা হয় বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলা ইত্যাদি শব্দে। আইনের ভাষা কি আসলে শক্তির রাজনীতিকে ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে?
যদি শক্তিশালী রাষ্ট্র দুর্বল বা বিরোধী রাষ্ট্রের শাসককে এভাবে তুলে নিতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জাতিসংঘ এসব ধারণা কোথায় দাঁড়ায়? নাকি এসব শুধু কাগজে লেখা কিছু শব্দ, যেগুলো ক্ষমতাবানদের প্রয়োজন হলে মানা হয়, আর প্রয়োজন না হলে উপেক্ষা করা হয়? ভেনিজুয়েলার ঘটনা আবারও প্রশ্ন তোলে, এই বিশ্ব কি নিয়মের দ্বারা চলে, নাকি নিয়ম তৈরি হয় ক্ষমতার সুবিধামতো? ‘জাতিসংঘের কথাকে পাত্তা দেই না’ ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে গত ২০২৪ সেপ্টেম্বরে এমন মন্তব্য করেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
জাতিসংঘের মতে পৃথিবীতে ১৯৫টি দেশ আছে। এর মধ্যে ৬০ এর মতো দেশে কম বেশি তেল পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, আরব আমিরাত, রাশিয়া এবং বাকি অন্যান্য আরও কিছু দেশ আছে যাদের তেল আছে। এদের সবার কাছে সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট তেলের ৮২% আছে। অন্যদিকে বিশ্বের মোট তেলের ১৮% একাই আছে ছোট্ট এই লাল ভূখণ্ডটাতে। যেখানে ৬০ দেশ মিলিয়ে ৮২% আর এদের একার কাছেই আছে ১৮%। তেলের দিক থেকে এদের ধারের কাছেও কেউ নেই। তেলের বাজারে বিশ্বে সবচেয়ে পরিচিত যে মুখ সেই সৌদি আরবের কাছে আছে ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল তেল। আর এই ভূখণ্ডে আছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল।
ভেনিজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বড় তেল মজুতের দেশ। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের তেল নীতি, ডলার নির্ভরতা এড়ানোর চেষ্টা, এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তির কারণ। তেল বাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা, বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার এবং লাতিন আমেরিকায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ভূরাজনৈতিক খেলাই কি আসল কারণ? তেল ছাড়াও এই ভূখণ্ডে রয়েছে: ১৬০ টনের মতো স্বর্ণ (কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর খনিজ সম্পদ মিলিয়ে)। সারাবিশ্বে মোট স্বর্ণের হিসাবে ৩০–৪০ তম। এছাড়াও সারাবিশ্বের মোট আইরনের (লোহা) ৫% আছে এই ভূখণ্ডে। এছাড়াও হীরা, বক্সাইট, ইউরেনিয়ামের মতো মূল্যবান খনিজসম্পদেরও মজুত আছে এই ভূখণ্ডে।
ভেনেজুয়েলা আয়তনে ৯,১৬,৪৪৫ বর্গকিলোমিটার, বাংলাদেশের চাইতে নয় গুণ বড় এবং জনসংখ্যা মাত্র ২৮.৫ মিলিয়ন। বাংলাদেশের ৪ ভাগের এক ভাগ, খনিজ তেল সমৃদ্ধ বিশাল দেশ ভেনেজুয়েলা, রাশিয়ার সহযোগিতায় অনেকটা আমাদের দেশের মতো কয়েকটি পরিবার শাসন করে আসছে যুগের পর যুগ, তাদের দুর্নীতি এবং সজনপ্রীতির কারণে শাসক গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে কিন্তু দেশের এবং দেশের সাধারণ মানুষের আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। কিন্তু দেশ এবং দেশের মানুষের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারেনি দুর্নীতিবাজ সরকার, তাই দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়াতে আমার মত অনেকের খুশি–অখুশি কিছুই যায় আসে না। কিন্তু যেভাবে পরিবর্তনটা হলো, আমরা কি আসলে কোন সভ্য ভুবনে বাস করছি?
এদেশেও বহুবার সাধারণ মানুষ জীবন দিয়ে সরকার পরিবর্তন করেছে কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েছে পরিবারের শাসন শোষণ থেকে মুক্তি পায়নি, কারণ প্রতিবেশী দেশের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে, জুলাই বিপ্লবে সরকার পরিবর্তন হলে দুর্নীতি দমনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ব্যর্থ হয়েছে।
ভারত বিরোধী বিপ্লবীদের হত্যা গ্রেফতার মনোনয়ন বাতিল প্রমাণ করে, আধিপত্যবাদী অপশক্তি কিভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা আমাদের দেশের দুর্নীতিবাজদের ক্ষমতায় রেখে তাদের স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে সফল হচ্ছে। ৫৪ বছরে বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য কী করেছে আমাদের শাসকেরা? জনগণ জীবন দিয়েও যেহেতু আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তি পায়নি।
সম্প্রতি আমেরিকা ভেনেজুয়েলার উপর হামলা চালিয়েছে। আমেরিকা অভিযোগ এনেছে ভেনেজুয়েলার মাধ্যমে মাদক আমেরিকায় ঢুকে। যার কারণে আমেরিকার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলার রাজধানী এমনকি তাদের প্রধান বিমানবন্দরেও হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে ঢুকে আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়েছে। তাকে ক্রিমিনাল আখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং আমেরিকার আদালতেই তার বিচার করা হবে, আমেরিকার আদালতই তাকে শাস্তি দিবে। যে অভিযোগ আনলো সে‘ই আটক করলো, তার আদালতই বিচার করবে, তার আদালতই নাকি আবার শাস্তি দিবে। এদিকে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছে আপাতত ভেনেজুয়েলাকে আমেরিকাই চালাবে। অর্থাৎ ভেনেজুয়েলাকে দখল করার পর এই দেশ এখন আমেরিকার সাম্রাজ্যের অংশ এমন ঘোষণা দিয়ে দিলো। আমেরিকার আসলে নজর পড়েছে ভেনেজুয়েলার খনিজ সম্পদের উপর। যেভাবে বুশ প্রশাসন ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণে সাদ্দাম হোসেনকে আটক করে মার্কিন বাহিনী। যদিও যে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের (ডব্লিউএমডি) দোহাই দিয়ে ইরাক আক্রমণ করা হয়েছিল, তার কোনও অস্তিত্ব পরে পাওয়া যায়নি। ১৯৮৮ সালেও নোরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালানের অভিযোগ এনেছিল ওয়াশিংটন। এরপর ১৯৮৯ সালে মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অজুহাতে পানামায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগার গ্রেপ্তার ও পরে মাদক পাচারের মামলায় বিচার।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে লাতিন আমেরিকায় অন্যতম বড় সামরিক অভিযান হিসেবে ধরা হচ্ছে ভেনেজুয়েলায় চালানো ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিসোলভ’। এত দ্রুত সময়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করে আমেরিকা নিয়ে আসা বিরল ঘটনা। মাত্র ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের এক গোপন অভিযানে গ্রেপ্তার হলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে আনা জাতিসংঘের সনদের লঙ্ঘন হতে পারে, যে সনদে যুক্তরাষ্ট্রও স্বাক্ষর করেছে। জাতিসংঘের সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য কোনো দেশের সার্বভৌম অঞ্চলে অনুমতি ছাড়া, আত্মরক্ষা ছাড়া বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য পানামায় অভিযানের নিন্দা জানানোর পক্ষে ভোট দিয়েছিল। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিল। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৭৫–২০ ভোটে এটিকে ‘আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
আমরা এক ভয়ংকর বিশ্বে বসবাস করছি; যেখানে একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ভূখণ্ডে ঢুকে সেই দেশের রাষ্ট্র প্রধানকে তুলে নিয়ে যাওয়া যায়। যা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারার প্রকাশ হতে পারে না। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে যেকোন দেশের নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা যায়। চরম সভ্যতার নামে চরম অসভ্য সমাজে আমরা বসবাস করছি যা মধ্যযুগকেও হার মানায়।
প্রশ্ন হচ্ছে যে রাষ্ট্রের বেতনভুক্ত সেনাবাহিনী তাঁর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা করে না। সে দেশের সেনাবাহিনীতে দালাল ছিল নতুবা এত সফল অভিযান চালানো সম্ভব ছিলো না। অনেকটা পলাশীর প্রান্তরের মত। প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে দেশ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। কোনো দৃশ্যমান প্রতিরোধ নেই। চীন–রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা থাকা সত্ত্বেও বোমা হামলার সময় প্রতিহত করার চেষ্টা পর্যন্ত হয়নি। আসলে এটা ছিল সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসঘাতকতার ফল। ইতিহাস বলে–যে রাষ্ট্র ভেতর থেকে ভাঙে, তাকে বাইরে থেকে ধাক্কা দেওয়া প্রয়োজন হয় না। যে সব দেশ ভৌগোলিকভাবে পার্শ্ববর্তী আঞ্চলিক পরাশক্তির টার্গেট সে সব দেশের উচিত ন্যাটোর আদলে সামরিক জোট করা অথবা সৌদি–পাকিস্তান কিংবা চীন–পাকিস্তান এর মত নিরাপত্তা চুক্তি করা নতুবা নিরাপত্তা ভীতি থাকবেই।
‘পাশের দেশ বন্ধু’ হতে পারে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস বলে, কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। পাশের রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়–পাশের দেশকেই কাউন্টার দেওয়ার জন্য। পিলখানার ইতিহাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে–দেশপ্রেমিকদের কীভাবে একে একে সরিয়ে দেওয়া হয়। আগামীতেও একইভাবে দেশপ্রেমিক হাদি কিংবা সত্যিকারের দেশপ্রেমিকদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হবে। রাষ্ট্রের বন্ধু বলে কিছু নেই। আছে শুধু স্বার্থ আর শক্তি। নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের আটক করার ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন– কেউ জানিয়েছে নিন্দা, কেউবা সমর্থন। যা প্রথাগত। মূল কথা হচ্ছে জোর যার মুল্লুক তার। কিসের গণতন্ত্র, সমঅধিকার মানবতাবাদ। আসলে সভ্যতার সংজ্ঞা ভিন্ন আমরাই বুঝি না।
লেখক: উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি ও টেকসই উন্নয়নকর্মী।











