বিশ্বমানবতায় মাইজভাণ্ডারী দর্শন ও শাহানশাহ্‌্‌ হক ভাণ্ডারী

অধ্যাপক এ ওয়াই এমডি জাফর | সোমবার , ১২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ

আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন প্রেরিত রহমাতুল্লিল আলামিন রাসুল মোহাম্মদ (দ.)-এর গুণে গুণান্বিত পবিত্র রক্ত ও আদর্শের ধারায় প্রাণিত লেওয়ায়ে আহমদীর ঝাণ্ডা বরদার হযরত মাওলানা শাহ্‌্‌ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্‌্‌ মাইজভাণ্ডারী (ক.) বাঙ্গালার আনন্দপ্রিয় মানুষের আনন্দ সহায়ক– জারি সারি ভাটিয়ালি ও কল্পিত কেচ্ছা কাহিনির হালকা মৌতাতকে সুর, তাল লয় সমৃদ্ধ মাইজভাণ্ডারী গানের স্রষ্টাপ্রেম ধারার সংযুক্তির অনুমতি সম্বলিত মানবিক অসাম্প্রদায়িক শুদ্ধ মানুষ, শুদ্ধ মন, শুদ্ধ কলুষমুক্ত খোদাতালাশী জনমানুষ তৈরির প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকা তথা মাইজভাণ্ডারী দর্শন। বাঙ্গালায় প্রবর্তিত একমাত্র এ ত্বরিকা তথা দর্শন একটি যুগোপযোগী সমন্বিত আধ্যাত্মিক ইসলামী ধারা, ধর্মীয় বিপ্লবী চেতনা– ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবনে পার্থিব ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের দিশা, স্রষ্টা নৈকট্য প্রয়াসীদের ঐশী পাথেয় ও সাধারণ জনমানুষের ইহকাল পরকালের পথ। যা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ হীনতা, সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা সম্প্রীতি, ধর্মীয় গোড়ামীহীন ইসলামের আকর বাণীর সমন্বয়ে সর্বজনীন পথ ও মতে শ্রদ্ধাশীল, মানবিক মহান এ দর্শন– ব্যক্তি, সমাজ, গোষ্ঠী বা জাতিতে সীমাবদ্ধ নয়, এর আবেদন কার্যক্রম সর্বজনীন আর প্রভাব বিশ্বময়।

মূলতঃ মাইজভাণ্ডারী দর্শন নবুয়তি ধারার বেলায়তি অবারিত ঐশী ধারা– শরিয়ত, ত্বরিকত, হাকিকত, মারিফাতের সমন্বিত রূপ তথা অর্গলমুক্ত প্রেমবাদ– যা ইসলামের সর্বজনীন নীতি, আদর্শ ও নির্যাসে আবরিত। ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ্‌্‌র সৃষ্ট পৃথিবীর তাবৎ মানুষ সমান, জাতি এক– মানবজাতি। বর্ণ, ভাষা, গোত্র, ধর্ম, উঁচু নিচু, বড় ছোট কোন ভেদাভেদ নেই– এমনকি ধর্ম নিয়ে, অবস্থান নিয়ে বাড়াবাড়ি নয়– তারই প্রত্যক্ষ প্রতিভাস মাইজভাণ্ডারী দর্শন।

আর সেই দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর পৌত্র মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার স্বরূপ উন্মোচক খাদেমুল ফোক্বারা হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র জ্যেষ্ঠপুত্র ও হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর প্রত্যক্ষ অনুগ্রহ ও বিশেষ খেলাফতপ্রাপ্ত গাউসুল আযম বিল বিরাসত হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র দৌহিত্র শাহানশাহ্‌্‌ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) যিনি ‘বিশ্বঅলি’ ‘শাহানশাহ্‌্‌’ ‘হক ভাণ্ডারী’ লকবে বিশেষভাবে পরিচিত ও মাইজভাণ্ডার দরবারের প্রখর জ্যোতিষ্ক হিসেবে সমধিক খ্যাত ও দীপ্যমান।

আমরা যদি দরবার–ই–গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর প্রখর জ্যোতিষ্ক বিশ্বঅলি শাহানশাহ্‌্‌ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর জীবন, কর্ম ও তাঁর আধ্যাত্মিক ঐশী আলোর প্রভাকেই দেখতে চেষ্টা করি, দেখবো– হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর হুজ্‌্‌রা শরিফে পিতার হাতে প্রথম সবক– ‘রাব্বি যিদ্‌নী ইলমা’ ‘প্রভু হে আমায় জ্ঞান দাও। পিতার মুখে চার বছরের শিশুর এ প্রথম সবকই যেন শিশুর সারা জীবনের সবক হয়ে আল্লাহ্‌্‌ প্রদত্ত জ্ঞানের জগতের অভিসারী হয়ে যান শিশু। মাইজভাণ্ডার আহমদিয়া জুনিয়র মাদ্‌্‌রাসা, ফটিকছড়ি করোনেশন হাই স্কুল, নানুপুর আবু সোবহান উচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজিয়েট হাই স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজে আই.এ পাশ করার পর কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজে ভর্তি হয়ে ডিগ্রি টেস্ট পরীক্ষার তৃতীয় দিনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছেড়ে ১৯৫৩ সালে আনমনা একাত্ম জিয়াউল পরমাত্মা সন্ধানে বের হয়ে পড়েন যে আল্লাহ্‌্‌র কাছে প্রথম সবকে জ্ঞান দানের ফরিয়াদ করেছেন তাঁরই খোঁজে তাঁরই সন্ধানে তাঁর রূপরহস্য ভেদের তাগিদে।

এ অবস্থায় তাঁর নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, নেই ঘুম, নেই বিশ্রাম। নিত্য জাগরণ ত্রস্ত জীবন, যেন অবিরল সারাক্ষণ খুঁজে চলেন কাকে– অনুপস্থিতি যেন তাড়া করে তাঁকে তাই উচাটন সারাক্ষণ– ঘরে বাইরে তপ্ত রোদে, কখনো পিছিল পথে, কখনো ভিতর বাড়ির হীম শীতল পুকুরে মাঘের শীতে, কখনো এক নাগারে নিজের তালাবদ্ধ ঘরে না খেয়ে না শুয়ে সপ্তাহর পর সপ্তাহ– এই–ই কী মহাপ্রভু মিলনের সিঁড়ির পরে সিঁড়ি– ১০ পৌষ ১৩৩৫ বাংলা ২৫ ডিসেম্বর ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেওয়া যে শিশুর ৭ম দিনের আকিকায় দেওয়া নাম ‘সৈয়দ বদিউর রহমান’ রাখা হলে পিতাকে রাতে হুজুর গাউসুল আযম স্বপ্নে নির্দেশ দেন নাম ‘জিয়াউল হক’ রাখুন– জিয়া অর্থ আলো আর হক অর্থ সত্যের আলোক। আবার সেই সত্যের আলোক যখন দিনে দিনে স্রষ্টা তালাশে মগ্ন চৈতন্যে নিত্য বিভোর জাগরুক– স্নেহশীল পিতা পুত্রের অবস্থা দৃষ্টে বেচেইন হয়ে পড়লে– পুনঃ হুজুর গাউসুল আযম স্বপ্নে দর্শন দিয়ে তাঁকে অভয় দেন– “আপনি চিন্তিত কেন, আমি জিয়াউল হক মিয়াকে সবার জন্য বাতি জ্বালাচ্ছি।” তাই দেখি হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর অন্তর মাঝে খোদাতালাশী শক্তির জাগরণ প্রত্যক্ষভাবে প্রাপ্ত হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী থেকে আর প্রত্যক্ষ ইচ্ছা ও প্রভাবে ইশ্‌কে ইলাহীর যাতে পাকের স্বরূপ সঞ্চারণে পিতা দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারীকে তার পীরে ত্বরিকত এবং নানাজান হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারীর কাছ থেকে প্রাপ্ত দয়ায় তিনি তার পীরে তাফায়্যুাজ। মূলত এই মহান তিন আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও নজরে আল্লাহ্‌্‌র মহা পবিত্র জাতে একাত্ব হতে পেরেছেন। চেরাগে গাউসুল আযম– যা তাঁর কর্মব্যাপ্তিতে, প্রকাশিত পবিত্র বাণীসমূহে স্পষ্ট–

“আমাকে বুঝতে হলে কোরআন দেখ।”

“আমার দরবার প্রাচ্যের বায়তুল মোকাদ্দাস, সকল জাতির মিলন কেন্দ্র।”

“হালাল খাও নামাজ পড়, আল্লাহ্‌্‌ আল্লাহ্‌্‌ জিকির কর সব সমস্যা মিটে যাবে।”

“জ্ঞানের যে সাধনা মনে উদারতা ও চরিত্রে দৃঢ়তা আনে সেটাই সঠিক জ্ঞান।”

তাইতো এ দরবার জাতি ধর্ম বর্ণ ভাষা গোত্র নির্বিশেষে, উঁচু, নিচু, ধনী, গরিব, দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে পথের ভিক্ষুকের কোন পার্থক্য বা মূল্যায়ন অবস্থানে পার্থক্য নেই। সবাই সমান অধিকারের সমান মর্যাদার। সবার স্রষ্টা তালাশী মন, পরম নির্ভরতা, শান্তি দুর্বিপাক, অসুস্থতা, অভাব মুক্তি ও স্বস্তির সমঅধিকারী আশ্রয়স্থল– ফরিয়াদ করেন দরবারে, কামনা করেন আল্লাহ্‌্‌র রহমত, দয়া ভিক্ষা করেন নিকৃষ্টতম হয়ে গভীর বিশ্বাসে স্রষ্টা দয়া কামনায় ও মুক্তির প্রগাঢ় আশ্বাসে। লেখক: কলামিস্ট ও মরমী গবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতরুণদের বিদেশমুখিতা ও অস্থিরতা : করণীয় কী
পরবর্তী নিবন্ধদূরের দুরবিনে