চট্টগ্রাম ওয়াসার পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণ থাকার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন ব্যবহারকারীরা। গত মঙ্গলবার দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, প্রতি বছরের মতো চলতি শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই লেকে পানির লেভেল একেবারেই কমে গেছে। যার কারণে কাপ্তাই পাঁচটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পানি ছাড়া হচ্ছে না। এর ফলে চট্টগ্রাম ওয়াসার মোহরা ও মদুনাঘাট পানি শোধনাগারে–হালদা নদী থেকে উত্তোলিত পানিতে লবণাক্ততা অতিরিক্ত মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে নদীর পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় ওয়াসার মোহরা ও মদুনাঘাট পানি শোধনাগারে প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পানি উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। পানি উত্তোলনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় নগরীতে পানির উৎপাদন ও সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে নগরীতে পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার এক নির্বাহী প্রকৌশলী গতকাল আজাদীকে জানান, কাপ্তাই লেকের পানির স্তর কমে যাওয়ার ফলে চট্টগ্রাম ওয়াসার মোহরা ও মদুনাঘাট পানি শোধনাগারের পানি যেখান থেকে উত্তোলন করা হয় (হালদা নদী এবং কর্ণফুলীর সংযোগস্থল) সেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ কারণে ৯ কোটি লিটার উৎপাদন ক্ষমতার মোহরা পানি শোধনাগারে ১ কোটি লিটার উৎপাদন কমে গেছে। ৯ কোটি লিটার উৎপাদন ক্ষমতার মদুনাঘাট পানি শোধনাগারেও ১ কোটি লিটার পানি কমে গেছে। এছাড়া পানির স্তর কমে যাওয়ায় রাঙ্গুনিয়ার পোমরায় কর্ণফুলী পানি শোধনাগারের দুটি ইউনিটের ১৪ কোটি লিটার করে ২৮ কোটি লিটার মধ্যে বর্তমানে ২৪ থেকে ২৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন হচ্ছে।
এসব কারণে এখন ওয়াসার দৈনিক উৎপাদন ৫ থেকে ৬ কোটি লিটার পানি উৎপাদন কমে গেছে। এদিকে চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ওয়াসার মোহরা ও মদুনাঘাট পানি শোধনাগারে–হালদা নদী থেকে উত্তোলিত পানিতে লবণাক্ততা অতিরিক্ত মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে নগরবাসীকে সতর্ক করে পত্রিকায় জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।
উল্লেখ্য, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাবার ও ব্যবহারযোগ্য পানি নিশ্চিত করতে ২০২০ সালে সুয়োমোটো রুল জারি করেছিলো হাইকোর্ট। সেখানে বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানযোগ্য পানি সরবরাহ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব কিনা অথবা এ নিরাপদ পানি পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা যায় কিনা এ মর্মে রুল জারি করা হয়েছিল। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে অল্প কয়েকদিন আগে আদালত রায় ঘোষণা করেছেন। রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে বলেছেন, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানযোগ্য পানি পাওয়া একটি মৌলিক অধিকার। এ পানির অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিরাপদ পানযোগ্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য আদালত বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক স্থান অর্থাৎ আদালত, ধর্মীয় উপাসনালয়, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, হাটবাজার, এয়ারপোর্টসহ প্রত্যেক পাবলিক প্লেসে নিরাপদ পানযোগ্য পানি প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও পানযোগ্য পানি সাশ্রয়ী মূল্যে নিশ্চিতের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পানি সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন যদি একজন ব্যক্তি মাত্র ১ লিটার করে পানি বাঁচায়, তাহলে বছরে ৩৪৫ বিলিয়ন লিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব। বিদেশের হোটেলগুলোতে পানির চাপ ০.১% নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি আমরা পানির প্রবাহ ৫০% কমিয়ে দেই, তাহলে বিশাল পরিমাণে অপচয় রোধ করা সম্ভব। তাঁরা বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানোর জন্য আমাদের আরও বেশি গাছ লাগাতে হবে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পানির সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
জীবন এবং স্বাস্থ্যের জন্য পর্যাপ্ত ন্যূনতম মানের পানি সরবরাহ জনগণের প্রাপ্য। জনগণ নিরাপদ পানির অধিকারের ধারক। আবার রাষ্ট্র জনগণের জন্য নিরাপদ পানি এবং সুস্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানে দায়বদ্ধ। তবু আমরা মনে করি, নিজের স্বাস্থ্য রক্ষার খাতিরে দূষিত পানি পান থেকে বিরত থাকা উচিত। পানির বিশুদ্ধতা কীভাবে রক্ষা করা যায়, সে–বিষয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করা দরকার সকলের। এ ব্যাপারে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের করণীয় সবচেয়ে বেশি। সার্বিকভাবে এই শহরের পানি সঙ্কট ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।








