বিলুপ্তির পথে বাঁশ-বেত শিল্প

মীরসরাই প্রতিনিধি | শনিবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০২৪ at ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ

এক সময়ে মানুষ একটু ফুরসত পেলেই বাঁশবেতের পাটি, খাঁচা, মাচা, মই, চাটাই, ঢোল, গোলা, ওড়া, বাউনি, ঝুঁড়ি, ডুলা, মোড়াসহ বিভিন্ন ঘরের কাজে ব্যবহৃত জিনিসপত্র বানাতে বসে পড়তো। গ্রামবাংলায় এখন আর এমন দৃশ্য চোখে পড়ে না, সারাদেশের পাশাপাশি মীরসরাই উপজেলার গ্রামীণ জনপদে ও বিলুপ্তির পথে এখন এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী বাঁশবেত শিল্প।

সাধারণত গ্রামের লোকেরাই বাঁশবেত শিল্পের সাথে জড়িত। তাই এ শিল্পকে গ্রামীণ লোকশিল্প বলা হয়। কালের বিবর্তনে এবং প্রযুক্তির বদৌলতে ভারতীয় উপমহাদেশের পুরনো এ শিল্পের ঐতিহ্য আজ আমাদের মাঝ থেকে হারাতে বসেছে। তার স্থানে দখল করে নিচ্ছে প্লাস্টিক ও কাঠের তৈরি জিনিসপত্র। এর মধ্যে প্লাস্টিক পণ্যের কদর বেশি। এক সময় মীরসরাই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়েনের দুর্গাপুর, কাটাছরা, দুয়ারু, পোলমোগরা, মায়ানী, মঘাদিয়া, সাহেরখালী, ডোমখালী, হাজীশ্বরাই, সোনাপাহাড়, ইছাখালী, ওচমানপুর, সাহেবদীনগর, দমদমা, কুড়ুয়া, খৈয়াছরা, ওয়াহেদপুর, হিঙ্গুলী সহ অন্তত ৩২ টি গ্রামে সহস্র প্রায় পরিবারের হাজার হাজার নারীপুরুষ বাঁশবেত শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন। বাঁশবেত দিয়ে ঘরের কাজে ব্যবহৃত জিনিসপত্র তৈরি করতেন তারা। এসব জিনিসপত্রের কদরও ছিল ভালোই। ফলে এ শিল্প থেকে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।

কালের আবর্তে, প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেকেই এ পেশা ছেড়েছেন বহু আগেই। মানুষ বাড়ার সাথে সাথে বনজঙ্গল উজাড়, বাঁশবেতের কম উৎপাদন, পুঁজি, উদ্যোগ ও পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় পেশা পরিবর্তন করছেন এ শিল্পের কারিগররা। ধাতব ও প্লাস্টিক পণ্যের কবলে পড়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এবং প্রাচীনতম শিল্পটি ক্রমশ মুখ থুবড়ে পড়ছে। যার ফলে ঐতিহ্যবাহী শিল্পটির চরম দুর্দিন চলছে। এ দুর্দিন কাটিয়ে এ শিল্পের সুদিন ফিরিয়ে আনতে নেই কোনো সরকারি উদ্যোগ। একদিকে বাঁশের সংকটের কারণ ও অভাবের তাড়নায় এই শিল্পের কারিগররা দীর্ঘদিনের বাপদাদার পেশা ছেড়ে আজ অনেকে অন্য পেশার দিকে ছুটে যাচ্ছে। শত অভাবঅনটনের মাঝেও জেলায় হাতেগোনা কয়েক পরিবার আজও পৈতৃক এই পেশাটি ধরে রেখেছেন। বাঁশবেত শিল্পের সাথে জড়িত এ শিল্পের কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অতীতে বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি ঘর (বসতঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর), কুলা, চালুন, খাঁচা, মাচা, মই, চাটাই, ঢোল, গোলা, ঝুড়ি, ডুলা, মোড়া, মাছ ধরার চাঁই, বইপত্র রাখার তাক, দোলনা, মাচা, ছিক্কাসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী এবং আসবাবপত্র তৈরি হতো। দেশব্যাপী এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ও প্রচলন ছিলো।

তারা জানান, এক সময় গ্রাম এলাকায় প্রচুর বাঁশবেত পাওয়া যেতো। যার ফলে তাদের এলাকাসহ আশপাশের এলাকায় ও থানায় (জেলা ও উপজেলা) শত শত মানুষ বাঁশ ও বেত শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন ধাতব ও প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার, প্রয়োজনীয় বাঁশ ও বেত না পাওয়া, পুঁজি এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এ শিল্পের বেশিরভাগ মানুষ এ পেশাটি ছেড়ে দিয়েছেন।

যারা এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন, তাদের অনেকেই সরকারিবেসরকারি কোন রকমের পৃষ্ঠপোষকতায় ছাড়াই টিকে আছেন। বিভিন্ন ধরনের দ্রব্যাদি উৎপাদন করেও তা ন্যায্যমূল্যে বাজারে বিক্রি করতে না পারায় তাদের ঘরে অভাব অনটন লেগেই আছে। এতে প্রয়োজনের তুলনায় দৈনিক আয় কম হওয়ায় পরিবারপরিজন নিয়ে কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এই বাঁশবেত শিল্পের সাথে জড়িত সোনাপাহাড় গ্রামের মিজানুর রহমান জানান, বাধ্য হয়ে অনেকে এ কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। আমরা বংশ পরম্পরায় এবং পূর্বপুরুষ থেকে চলে আসা এই পেশা আঁকড়ে ধরে রেখেছি। এখানে সরকারিভাবে কারো প্রশিক্ষণ নেই।

তিনি বলেন, আগে বড় ও মাঝারি সাইজের বাঁশ ৫০১৫০ টাকায় কেনা যেতো। এখন ২০০৩৫০ টাকায় কিনতে হয়। প্রায় দুইদিনের (১২+১২ ঘণ্টা) পরিশ্রমে একটি বড় বাঁশ দিয়ে ১০টি খাঁচা তৈরি করা যায়। আর প্রতিটি ৫০ টাকা করে ১০টি খাঁচা ৫০০ টাকা বিক্রি হয়। এতে আমাদের পোষায় না।

এক সময়ে এ পেশার সাথে জড়িত থাকা হাজীশ্বরাই গ্রামের আফিয়া খাতুন জানান, বাঁশের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু তুলনামূলকভাবে বাঁশের তৈরি পণ্যের দাম বাড়েনি। যার ফলে আমরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছিনা।

তিনি বলেন, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধাতব পণ্যের কারণে আগের মতো জিনিসপত্র উৎপাদন করিনা, গুটি কয়েক আইটেমের বাঁশের পণ্য তৈরি করি। কিন্তু বাঁশের দাম বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে পরিবারপরিজন নিয়ে আমাদের চলতে কষ্ট হচ্ছে।

এ বিষয়ে মীরসরাই উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সাবরিনা লিনা বলেন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখা আমাদের দায়িত্ব। উপজেলায় বাঁশবেত শিল্পের সাথে যারা জড়িত, তারা যদি উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চায়, তাহলে আমরা এই বিষয়ে প্রস্তাবনা তুলে ধরে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবো।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশীতকালীন সবজি উৎপাদনে ব্যস্ত রাঙ্গুনিয়ার কৃষক
পরবর্তী নিবন্ধবন্দরে শ্রমিকদলের আলোচনা সভা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান