দেশের বন্দরগুলোতে ফল, প্রসাধনী, কাগজ, মোবাইলসহ আরও বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে গুপ্তভাবে প্রবেশ করছে অবৈধ সিগারেট। কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকলেও, চোরাকারবারীরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। ফলশ্রুতিতে, অসংখ্য চালান এখনও নজরদারি পেরিয়ে দেশে প্রবেশ করছে, যা সরকারের রাজস্ব ক্ষতির বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের অবৈধ সিগারেটের বাজার প্রায় ১৩% এর বেশি। বিগত কয়েক মাসে বিভিন্ন বন্দরে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি শলাকা সিগারেট এবং ২৬ টন সিগারেট পেপার জব্দ করা হয়েছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ১৭২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কাস্টমস আরও ৩ কোটি ৭২ লাখ শলাকার সিগারেট জব্দ করেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪১ কোটি ৯ লাখ টাকা।
গত ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওমানের মাস্কাট থেকে আসা একটি ফ্লাইটের দুই যাত্রী ৫৩৬ কার্টন সিগারেট ও ৮টি স্মার্টফোন নিয়ে ধরা পড়েন। এছাড়া, রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো শাখায় ৯৬ লাখ ভুয়া সিগারেট ট্যাক্স স্ট্যাম্প ও ২২২ কেজি মোবাইল ফোনের এলসিডি জব্দ করা হয়েছে। এই অভিযানের ফলে সরকারের প্রায় ৫৪ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি রোধ করা গেছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে বিভিন্ন কৌশলে সিগারেট পণ্য আনার ঘটনা ধরা পড়েছে। কমলা, রিবন, ফল বা প্রসাধনী ঘোষণার আড়ালে বিদেশি সিগারেট ও ভুয়া ব্রান্ডরোল আনা হয়েছে। এছাড়া, ভুয়া ট্যাক্স স্ট্যাম্প ব্যবহার করে কমদামি দেশীয় সিগারেটও বাজারজাত করা হচ্ছে। এ ধরনের অবৈধ আমদানি ও ভুয়া ট্যাক্স স্ট্যাম্প ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই সরকারকে এই পরিস্থিতি বন্ধ করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বন্দরে নজরদারি শক্তিশালী করা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবৈধ পণ্য শনাক্ত করা, সরবরাহ চেইন মনিটরিং বৃদ্ধি এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া, বাংলাদেশে তামাক কর আইন পুনঃবিবেচনা করারও দাবি তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতি বছর সিগারেটের দাম বাড়ছে, কিন্তু তার তুলনায় সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পাচ্ছে তা সন্তোষজনক নয়। চোরাকারবারীরা দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে এবং ভুয়া ট্যাক্স স্ট্যাম্প ব্যবহার করে অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, যা রাজস্ব ক্ষতির মূল কারণ।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে দেশীয় অবৈধ সিগারেট উৎপাদনকারী কারখানাগুলো বন্ধ করার সরকারি পদক্ষেপ কিছুটা ফলপ্রসূ হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপ এখনও সম্পূর্ণরূপে কার্যকর বা যথেষ্ট নয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান উচ্চ কর কাঠামোতে বৈধ সিগারেটের বিক্রি কমেছে, আর বাজার দখল করছে সস্তা অবৈধ ব্র্যান্ড। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চোরাকারবারীদের সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করতে বিদ্যমান কর কাঠামোর কৌশলগত পরিবর্তন সহ আরও সমন্বিত এবং প্রযুক্তি-নির্ভর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।












