যদি কেউ নিজের ধর্মের একচেটিয়া বেঁচে থাকার এবং অন্যের ধ্বংসের স্বপ্ন দেখে তবে তাকে বলি, শীঘ্রই প্রতিটি ধর্মের পতাকায় শত প্রতিরোধ সত্ত্বেও লিখিত হবে: বিবাদ নয়; সহায়তা, বিনাশ নয়; পরস্পরের ভাবগ্রহণ, মতবিরোধ নয়; সমন্বয় ও শান্ত্ি। কথাগুলো বলেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, আমেরিকার শিকাগোয় অনুষ্ঠিত বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলনে। আজ আমরা চোখ মেলে যদি এই বিশ্বের দিকে তাকায় কি দেখি? পুরো বিশ্বে কেমন জানি এক ধরনের অস্থিরতা লেগে আছে। মানুষের চিরন্তন সহজাত ভাবনা হচ্ছে, আমি যতদিন বেঁচে আছি এই সময়েই মনে হয় বিশ্বের অস্থিরতা বিরাজ করছে। আসলে ব্যাপারটা কিন্তু তাই না। প্রতিমুহূর্তে বিশ্বে এক জাতি আরেক জাতিকে; এক দেশ আরেক দেশকে ; এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে, জাতির মধ্যে, দেশের মধ্যে সহনশীলতার একটা অভাব দেখা দিয়েছে। পত্রিকার পাতা খুললেই আমরা দেখতে পাই অশান্তি, অরাজকতা, যুদ্ধের উন্মত্ততা এই শান্ত পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে। আর এর প্রভাব নেমে আসছে দেশ থেকে শুরু করে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে।
আমেরিকার শিকাগোয় ১৮৯৩ সালে হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি পরিচয়ে স্বামী বিবেকানন্দ তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় বিদ্যমান অসহিষ্ণুতা, জাতিগত বিদ্বেষ ও ধর্মান্ধতার অবসান করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন তাঁর ঐ বক্তৃতায়। প্রায় চার মিনিটেরও কম সময়ের ছোট্ট কিন্তু দুর্দান্ত ভাষণটির প্রভাব এত ছিল যে, হলভর্তি শ্রোতারা তাঁকে দাঁড়িয়ে দুই মিনিটেরও বেশি সময় স্থায়ী করতালির মাধ্যমে সম্ভাষণ জানিয়েছিল। এখনও তার বক্তৃতার ভাব ও বক্তব্য সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতি ও সমঝোতা স্থাপনে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে ধর্ম সম্পর্কে তার বিখ্যাত বক্তৃতা প্রণিধানযোগ্য। পশ্চিমে স্বামিজীর বক্তৃতা তৎকালীন ভারতবর্ষের বাইরে হিন্দু ধর্মের বিশ্বাসের সংশোধন ও উন্নতি সাধন করেছে এবং সমস্ত ধর্মের মধ্যে পাওয়া সর্বজনীন উদারতার ভাবটা ফুটে উঠেছিল। তৎকালীন পাশ্চাত্যবাসীর মন উদার এবং চিন্তাভাবনার প্রসারণের কৃতিত্ব অবশ্যই নিঃসন্দেহে এক এবং একমাত্র একমাত্র স্বামী বিবেকানন্দকেই দিতে হবে। তিনিই পশ্চিমাদের সামনে প্রাচীন হিন্দু চিন্তার রত্ন স্থাপনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং এভাবেই তাদের নৈতিক কল্পনাশক্তির মাত্রা ও গভীরতা আরও প্রশস্ত করতে তাদের সহায়তা করেছিলেন।
ধর্ম মহাসম্মেলনের উদ্দেশ্য ও পরিপূর্ণতার ব্যাপারে যদি বলতে হয় তাহলে উল্লেখ করতে হয়, আমেরিকানদের তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি এবং জাতীয় সম্পদে অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে আমেরিকা বৈশ্বিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল। আমেরিকানরা তাদের এ অর্জনকে একটি উপযুক্ত উপায়ে উদযাপন করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। সাথে সাথে এটিও একটি আনন্দেও কাকতালীয় ঘটনা ছিল যে, ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকার আবিষ্কারের চারশতবর্ষও পূর্ণ হয়েছিল। আয়োজকদের মূল ধারণাটি ছিল বিশ্বে খ্রিস্টান বিশ্বাসের আধিপত্য প্রমাণ করা। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর সম্ভাষণে নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন এভাবে– আমি এমন একটি ধর্মের প্রতিনিধি হিসাবে গর্বিত, যে ধর্ম বিশ্বকে সহনশীলতা এবং সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা উভয়ই শিখিয়েছে। আমরা কেবল সর্বজনীন সহনশীলতায় বিশ্বাস করি না তবে আমরা সমস্ত ধর্মকেই সত্য হিসাবে গ্রহণ করি। আমি এমন একটি জাতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গর্ববোধ করি যেটি নির্যাতিত এবং সমস্ত ধর্ম এবং পৃথিবীর সমস্ত জাতির শরণার্থীদেও আশ্রয় দিয়েছে। এটাই সর্বোচ্চ ভ্রাতৃত্ববোধের আহ্বান ছিল।
বিশ্বে বিরাজমান ধর্মমত সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল, নদীসমুহ বিভিন্ন স্রোতে, বিভিন্ন উৎস হতে উৎপন্ন হয়ে একই সমুদ্রের পানিতে মিশে যায়। একইভাবে ধর্মমতগুলোর ক্ষেত্রেও উদযাপনের পদ্ধতি বিভিন্ন হলেও আমরা একই পরমাত্মার সন্ধানে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করছি। শুধু আমার ধর্মের মাধ্যমেই বিধাতাকে পাওয়া যাবে এ মতবাদের ঘোর বিরোধীতা করেছিলেন তিনি। তাঁর মতে বিধাতার বক্তব্য হলো– যে কেউ, যেকোনো রূপেই আমার কাছে প্রার্থনা করুক না কেন, আমি তাদের আহবানে সাড়া দিই এবং কাছে পৌঁছে যাই; সবধরনের সাধনার পথে আমাকে পাওয়া যাবে। তিনি বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি এবং এর ভয়াবহ ফলস্বরুপ ধর্মান্ধতা দীর্ঘকাল ধরে এই সুন্দর পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। এটি পৃথিবীকে সহিংসতায় ভরিয়ে দিয়েছে, এবং প্রায়শই মানুষের রক্তে রক্তাক্ত হয়েছে আমাদের এ সুন্দর পৃথিবী, সভ্যতা ধ্বংস করেছে, এমনকি কোনো কোনো দেশকে হতাশার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যদি এই ভয়াবহ দানবগুলির অস্তিত্ব না থাকতো, তবে মানব সমাজ এখনকার চেয়ে অনেক বেশি উন্নত হতো। কিন্তু আজ সময় এসেছে; এবং আমি দৃঢ়ভাবে আশা করি যে, এই সম্মেলনের সম্মানে আজ সকালে যে ঘণ্টাটি প্রতিধ্বনিত হয়েছে তা সমস্ত ধর্মান্ধতার, তলোয়ার বা কলমের সাহায্যে পরিচালিত সমস্ত নিপীড়নের সমাপ্তি ঘোষণা করবে। বর্তমান বাস্তবতায় এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ধর্মচিন্তা এবং ধর্মমতের বিভিন্নতা কোনোদিনই মুছে যাবে না। তাই, বিশ্বে ধর্মীয় সংঘাতহীন সহাবস্থানের জন্য এই নানা পথের বাস্তবতা স্বীকার করা ব্যতীত শান্তির কোনো সম্ভাবনা নেই।
স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগোয় ২৭ সেপ্টেম্বর ১৮৯৩ সালে সমাপনীয় ভাষণে বলছিলেন, বিবদমান ধর্মীয় কোন্দলকে মিটিয়ে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক মসৃণ করার চেষ্টায় আমাদের নিয়োজিত থাকা উচিত। এ ধর্মসম্মেলন আমাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্যের মধ্যেও সাধারণ সম্প্রীতির যে আবহ তৈরি করেছে তাঁর জন্য আয়োজন কমিটি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। ধর্মীয় ঐক্যেও সাধারণ ক্ষেত্র সম্পর্কে অনেক কিছু বলা হয়ে থাকে। তবে এখানে যদি কেউ আশা করে যে এই ঐক্যটি যে কোনও একটি ধর্মের বিজয় এবং অন্যের ধ্বংসের মধ্য দিয়ে আসবে, আমি তাকে বলি, ভাই, আপনার পক্ষে এটি একটি অসম্ভব আশা। খ্রিস্টানকে হিন্দু বা বৌদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন নেই; তবে প্রত্যেককে অবশ্যই অন্যের ধর্ম বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করতে হবে এবং তার স্বতন্ত্রতা রক্ষা করতে হবে। এভাবেই তিনি মানুষকে জাগাতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে পৃথিবীতে সবাই আমরা অপরের ভাই। তিনি বলেছিলেন, আমার আদর্শ বস্তুতঃ অতি সংক্ষেপে প্রকাশ করা চলে, আর তা এই মানুষের কাছে তার অন্তর্নিহিত দেবত্বের বাণী প্রচার করতে হবে এবং সর্বকাজে সেই দেবত্ব–বিকাশের পন্থা নির্ধারণ করে দিতে হবে।
বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালেই দেখি, শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বে প্রতি মুহূর্তেই নতুন নতুন জোট ও সংঘ সৃষ্টি হচ্ছে এবং চুক্তি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই কোনোটাই কি চূড়ান্ত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারছে? নাকি জোটগুলো গঠিত হচ্ছে, এক জোট অন্যজোটের উপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। আমরা যদি গভীরভাবে উপলব্ধি করি তবে দেখতে পাব ব্যাপারটি আসলে তাই। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা, প্রতিশোধপরায়ণতা ও ধর্মান্ধতার জায়গা থেকে বিশ্বে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এ ধরনের জোটগুলো সৃষ্টি হচ্ছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি লাখ টাকার প্রশ্ন যে, এ ধরনের জোট দিয়ে আদৌ বিশ্বে শান্তি স্থাপন করা যাবে কিনা? এককথায় উত্তর হচ্ছে– না, হলেও সেটি সাময়িক, চুড়ান্ত নয়। এ ধরনের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পুরো বিশ্বে একটি আদর্শ স্থাপন করতে হবে যা হলো ভ্রাতৃত্ববোধ। আর সেটিই বিবেকানন্দ তার শিকাগো বক্তৃতায় উদ্ধৃত করার চেষ্টা করেছিলেন। সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণতা, গোঁড়ামী ও ধর্মোন্মত্ততার অবসানকল্পে দেশ–কাল–পাত্রের রুচিবৈচিত্র্য অনুসারে আধ্যাত্ম–চিন্তার স্বাধীনতা তথা ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সমন্বয়ের বৈদান্তিক ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন তাঁর বক্তৃতায়। তাই তাঁর বক্তৃতা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আজও খুবই প্রাসঙ্গিক।
লেখক: অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।