‘বিবাহ বা উৎসব উপলক্ষে আলোকসজ্জা করা যাবে না’

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় চাই গৃহীত পদক্ষেপের বাস্তবায়ন

| রবিবার , ৫ এপ্রিল, ২০২৬ at ৭:১৯ পূর্বাহ্ণ

বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট মোকাবেলায় অফিস সময়সূচিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারিবেসরকারি অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। বর্তমানে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস চালু রয়েছে। দেশের সব ধরনের দোকানপাট, বাণিজ্যবিতান ও শপিং মল সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া আরো বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এসব পদক্ষেপ নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় চাপ কমানো এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

গত বৃহস্পতিবার রাতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে সেখানে ব্রিফিংয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্তের কথা জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। তিনি জানান, ‘সরকারি কিছু ব্যয় কমানো হচ্ছে। আগামী তিন মাস পর্যন্ত সরকারি কোনো নতুন যানবাহন, জলযান, আকাশযান, কম্পিউটারসামগ্রী ক্রয় করা হবে না। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ যেগুলো আছে সেগুলো ৫০ শতাংশ কমিয়ে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পুনরায় আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত সরকারি অর্থায়নের সব বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বন্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া সভাসেমিনারে আপ্যায়ন ব্যয় ৫০ শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসএই খাতে আমাদের যে ব্যয়টা হতো সরকার সেটা আরো ৩০ শতাংশ হ্রাস করবে। কোনো বিবাহ বা কোনো উৎসব উপলক্ষে আলোকসজ্জা করা যাবে না। সামগ্রিকভাবে ব্যয় ও ব্যবহার কমানোর আহবান জানানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে। সরকার চেষ্টা করছে যাতে সাধারণ মানুষের ওপর কম চাপ পড়ে এবং বিদ্যুতের লোড কমানো যায়। মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘আমাদের সাপ্লাই চেইন সচল রাখার চেষ্টা করছি। আমাদের ৮০ শতাংশ তেলই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অন্যান্য জায়গা থেকেও আসে। এখন সেসব জায়গা থেকেও আসবে। সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে ক্যাবিনেট পর্যায়ে আরো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

আসলে ইরানইসরায়েলযুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট তত গভীর হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। এক মাস ধরে দেশে জ্বালানি তেলের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা দিন দিন বাড়ছে। সরকার বারবার পর্যাপ্ত মজুদ থাকার আশ্বাস দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ সরাসরি সরবরাহ ঘাটতি নয়; বরং অসাধু ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিদের অবৈধ মজুদ এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি। বাজারে তেলের সরবরাহ থাকলেও তা সঠিকভাবে বিতরণ না হওয়ায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কালোবাজারি। অনেক ক্ষেত্রে তিন গুণ দামে তেল বিক্রির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভোর থেকে রাত পর্যন্ত মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও গণপরিবহনের চালকদের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকে তেল না পেয়ে খালি গাড়ি নিয়ে ফিরছে। চালকদের অভিযোগ, সরকার তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক বললেও বাস্তবে সেই চিত্রের প্রতিফলন নেই। এই অসামঞ্জস্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। অনেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে, যা সংকটকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ঘিরে তেলের দাম আরো বাড়তে পারেএমন আশঙ্কায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তেল মজুদ করছে। শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, বাসাবাড়ি, গ্যারেজ এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যা বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে।

তবে, মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট রুখতে সরকার র‌্যাবপুলিশ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। প্রায় ৩০০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পুরো বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ খুঁজে বেড়াচ্ছেন এবং জরিমানা করছেন। বাংলাদেশে মজুদ ঠেকাতে র‌্যাবপুলিশ বা ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবহারের প্রবণতা দীর্ঘদিনের। কিন্তু বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান সাফল্য আসেনি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকারকে কেবল জোড়াতালি দিয়ে চলা বন্ধ করতে হবে। ফিলিং স্টেশনে সাধারণ মানুষের যে হাহাকার এবং রাইডারদের যে দুর্ভোগ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভবিষ্যতে বড় আকারের মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ। এসব নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা না করে জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সাহসী সংস্কারই পারে বাংলাদেশকে একটি জ্বালানি নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত করতে। জ্বালানিসংকট মোকাবেলায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার বাস্তবায়ন দরকার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে