‘বিবাহ বার্ষিকী ও অন্যান্য গল্প’ বিশ্বজিৎ চৌধুরীর বড়দের জন্য লেখা প্রথম গল্পগ্রন্থ। বইটির প্রকাশকাল ১৯৯৯ সাল। প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম। প্রকাশ করেছে ‘অন্যপ্রকাশ’। প্রচ্ছদ –খালিদ আহসান। বইটি পাঠকমহলে বেশ সমাদৃত হয়েছিল। এ বইয়ে গল্প আছে নয়টি। প্রথম গল্প ‘যেভাবে সে মহৎ হয়ে ওঠে’। গল্পটির নায়ক নূর আলী মাস্টার। গ্রাম থেকে অন্য দশজন যুবকের মতো ভাগ্য ফেরাতে শহরে এসেছিল। সাথে করে নিয়ে এসেছিল কিশোর এক সাগরেদকে। সেই সাগরেদই শুধু জানে মূলত কোন কারণে নূর আলীর গ্রাম থেকে পলায়ন। কিন্তু শহরের জীবনের সাথে তাল মেলাতে না পেরে সেই সাগরেদ রতন একদিন গ্রামে ফিরে যায়। এতে খুব একটা দুঃখ পায় না নূর আলী,বরং তার অতীত জানা একমাত্র সাক্ষীটির বিদায়ে কোথায় যেন তৃপ্তিও পায়। এরপর তার শুধু সংগ্রাম আর সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের পথ ধরে ‘নূর আলী টেইলার্স‘ আজ ‘নূর আলী লেডিস টেইলার্স‘। ততদিনে নূর আলী ষাটোর্ধ্ব প্রৌঢ়। গার্মেন্টস এর মেয়েরা তার দোকানের নিয়মিত কাস্টমার। কিন্তু তাদের সাথে আচরণে সে খুব হুঁশিয়ার। তবুও রান্না করে দেওয়ার অজুহাতে তার জীবনে ঢুকে পড়ে অশ্রুরাণী। ধর্মের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও একদিন অশ্রুর এক মাসতুতো ভাই নেপাল তাঁর সাথে অশ্রুর বিয়ের প্রস্তাব আনে। প্রথমে অমত করলেও নেপালের পীড়াপিড়িতে নূর আলী বিয়েতে রাজি হয়। তারপর বিয়ের দুইদিন আগে একরাতে নূর আলী ঘরের ফুটোয় চোখ রেখে দেখে– ‘অশ্রু,অশ্রুরাণী,তার ঊর্ধ্বাঙ্গ নিরাবরণ, শুধু ফাঁসখোলা সায়া জড়িয়ে আছে নিচের অংশে,উপুড় হয়ে আঁকড়ে ধরেছে একটি পুরুষদেহ। স্বল্প আলোতেও নূর আলী দেখতে পেল নেপালকে।’ বিশ্বাসঘাতকতার বেদনায় মুষড়ে পড়ে নূর আলী। কিন্তু তাকে যে মহৎ হতে হবে। তাই সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেবার ঘোষণা দেয় নেপাল আর অশ্রুকে। ঠিক এমনিভাবে যৌবনেও সে একবার মহৎ হয়েছিল,যখন তার জন্য ঠিক করা বিয়ের পাত্রী, তারই বড় ভাই দুই সন্তানের জনকের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল। গল্পটিতে লেখক বিশ্বজিৎ চৌধুরী মানবমনের বিচিত্র গতি–প্রকৃতি প্রকাশ করেছেন।
‘বিবাহ–বার্ষিকী কিংবা আত্মহত্যার গল্প’ একটি তীব্র বিষাদের মন খারাপ করা গল্প। গল্পটির নায়িকা বিপাশা। সে–ই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে। স্বামী আকরামকে নিয়ে বাহ্যিক দৃষ্টিতে সে খুব সুখী। অনেকে তাদের জুটিকে ঈর্ষাও করে। কিন্তু গল্পকার তো জানেন আধুনিক শিক্ষিত মানব–মানবীরা কতটা মেকি এবং ভণ্ডামিপূর্ণ। তাই তিনি হৃদয় খুঁড়ে বিপাশার বেদনাকে বের করে এনেছেন। আকরামের যান্ত্রিক আচরণে ধীরে ধীরে মনোবৈকল্যের শিকার হয়েছে বিপাশা। তা এখন এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছে যে, সে আকরামকে খুন করার পরিকল্পনাও করে ফেলেছে। শেষ পর্যন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত একটা খুনের বিবরণ পড়ে সে তার সিদ্ধান্ত পাল্টালেও আরও ভয়ংকর পরিকল্পনায় নিজেকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। তার এ আত্মহত্যার নেপথ্যে কাজ করে আকরামকে শাস্তি দেওয়ার তীব্র আকুলতা,যা লেখক প্রকাশ করেছেন এভাবেু“পাশে শুয়ে থাকা আকরাম কিছুতেই এই মৃত্যুর দায়িত্ব থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না এবং বাকি জীবন একটি হত্যাকাণ্ডের দায় বহন করতে হবে তাকে; খবরের কাগজ কিংবা অন্যেরা এই আত্মহত্যাটিকে নানাভাবে হত্যা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করবে ও সফল হবে ইত্যাদি চমৎকার সব ভাবনায় আচ্ছ্ন্ন হয়ে গভীর তৃপ্তিতে মরে যেতে থাকে বিপাশা।” কতটা গভীর বিষাদে আক্রান্ত হলে একজন মানুষ নিজেকে শেষ করে দিয়ে এমন ভাবনা ভাবতে পারে লেখক তা গভীর অনুভূতিপ্রবণতা দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। গল্পটি পড়ে সমপ্রতি এক অভিনেতার স্ত্রীর আত্মহত্যার বিষয়টি মনে পড়ে যায়।
এক সাধারণ কিশোরকে হাজতে ভরে অপরাধীদের সংস্রবে রাত কাটাতে বাধ্য করে কীভাবে পিতার চোখে অপরাধী বানিয়ে দেয় তারই দুর্দান্ত চিত্র পাওয়া যায় ‘এইসব অপরাধী’ গল্পে। এ গল্পের প্রেক্ষাপট আমাদের সমাজে অহরহ ঘটছে। মূল অপরাধীকে ধরতে না পেরে নিরপরাধ এক কিশোরকে রাস্তা থেকে ধরে এনে হাজতে ভরে পুলিশ। কিশোর যতবারই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চায় ততবারই কপালে জোটে চড় থাপ্পড়,কিল ঘুষি। শেষ পর্যন্ত তাকে একজন বেশ্যা ও ষণ্ডা মার্কা লোকের সাথে হাজতে রাত কাটাতে হয়। সেই রাতটির বর্ণনাই এ গল্পের মূল বিষয়বস্তু। একজন বেশ্যাও যে কতটা মাতৃময়ী হতে পারে এ গল্পে তার চিত্র আছে। আর আছে কনস্টেবলদের অমানবিক দুর্ব্যবহারের চিত্র। পুলিশ অফিসারের বিবেচনাবোধ,সত্যবাদিতা যেমন ফুটে উঠেছে,তেমনি প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের অর্থলোলুপতাও। মোট কথা এ গল্প বিশ্বজিৎ চৌধুরীকে একজন সমাজ নিরীক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে।
‘অপরিচয়’ একজন শিক্ষিত যুবকের ঘটনাচক্রে খুনী হওয়ার কাহিনি। অথচ কস্মিনকালেও সে অপরাধজগতের সাথে যুক্ত ছিল না। যুতসই কোনো চাকরি না পেয়ে বি.এ.পাশ হওয়া সত্ত্বেও সে বাধ্য হয়েছিল নৈশ প্রহরীর চাকরি করতে। তবুও শ্রেণিবৈষম্যপূর্ণ এ সমাজে সে টিকতে পারেনি। বড়লোকের এক বখাটে সন্তান তার দম্ভ দেখাতে যুবকটির হাতে তুলে দিয়েছিল পিস্তল। তারপর হঠাৎ ক্রোধে জ্বলে ওঠা যুবকের পিস্তলের ট্রিগারে একটি টান। অতঃপর খুনের দায়ে দেশত্যাগ ও পরিচয় সংকট। বিশ্বজিৎ এ গল্পের শেষে নায়কের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, “এই নতুন দেশে কী তার পরিচয়? একজন মানুষ? শুধুই একজন মানুষ…দেশে তার কিছু পরিচয় তৈরি হয়েছিল…একজন শিক্ষিত বেকার যুবক, একজন চৌকিদার,কর্মক্ষমতাহীন বৃদ্ধের সন্তান,এক গৃহত্যাগীর ভাই,এমনকি সর্বোপরি একজন খুনী।’ কতটা সংবেদনশীল লেখক হলে একজন নায়ককে দিয়ে বলাতে পারেন, ভিন দেশে পরিচয়হীন থাকার চেয়ে স্বদেশে খুনীর মর্যাদা অনেক ভালো।
‘যেভাবে চুরি হয়ে যায়’ জীবনের কাছে মার খাওয়া একজন পরাজিত মানুষের গল্প। জীবন তাঁকে শিক্ষক থেকে চোর বানিয়ে ক্ষান্ত হয়নি,তার বউকে করেছে কাজের বুয়া থেকে দেহপসারিনী। সব জেনে গিয়েও তিনি এর কোনো প্রতিকার করতে পারেননি, কারণ অভাবের সংসারে পাঁচ বছরের মেয়েটি তো অন্তত সেই রোজগারে দুটো খেয়ে বেঁচে আছে। বিশ্বজিৎ চৌধুরী এ গল্পে দেখিয়েছেন অভাব এমনই এক নিদারুণ বাস্তব,যার কাছে শুভবোধ পরাজিত। তাই তো নিজের প্রেমিকাস্ত্রীকে অন্যের শয্যায় মিলনরত অবস্থায় দেখতে পেয়েও নায়ক উচ্চারণ করে, ‘এখনই তার ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া দরকার। জয়া এসে সবকিছু গুছিয়ে নিলে আবার ফিরে আসবে সে। অন্তত জয়া যেন জানতে না পারে সে জেনেছে সবকিছু।’
‘সুখ–অসুখ’ এক কামাতুর যুবকের গল্প। যার সর্বক্ষণের সঙ্গী চটি বই এবং হিন্দি ছবির নায়িকাদের রগরগে ছবি ছাপানো বিভিন্ন ফিল্মী ম্যাগাজিন। নানা সমস্যায় জর্জরিত, টানাপোড়নের মধ্যবিত্ত জীবনে কখনো কখনো এমন বৈকল্যের শিকার হয় পড়ন্ত বয়সের কিছু তরুণ। তাদেরকেই যেন প্রত্যক্ষ করি আমরা এ গল্পে।
‘আয়না ও অবশিষ্ট’ গল্পে এক অপূর্ব সুন্দরী নারীর মনোজাগতিক সমস্যাকে চিত্রিত করেছেন বিশ্বজিৎ চৌধুরী। ‘স্নায়বিক’ গল্পটিও মানসিক ভারসাম্য হারানোর গল্প। তবে এর নায়ক কোনো নারী নয়,একজন বৃদ্ধ নিউজ এডিটর। সংবাদপত্রে এবং নিউজ চ্যানেলে ক্রমাগত দুঃসংবাদ জানতে জানতে এ বৃদ্ধ একজন অসুস্থ মানুষে পরিণত হয়েছেন। নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শও তাঁকে ফেরাতে পারেনি। ডাক্তারের সাথে তাঁর পুত্রবধূর অনৈতিক সম্পর্ক এবং সেই সূত্র ধরে নিঃসঙ্গতা তাঁর অসুস্থতাকে চরমে নিয়ে গেছে। বিশ্বজিৎ এ গল্পে একজন সমাজ নিরীক্ষক। তিনি জানেন অসুস্থ পরিবেশ মানুষকে কীভাবে অসুস্থ বানিয়ে দেয়।
‘বিবাহ বার্ষিকী ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থের নয়টি গল্পেই লেখক সমাজকে তুলে এনেছেন নিপুণ দক্ষতায়। প্রতিটি গল্পের প্রতিটি চরিত্র আমাদের চারপাশের পরিচিত স্বজন। তাদেরই সামাজিক,মানসিক,অর্থনৈতিক কিংবা শারীরিক পীড়নকে তিনি শব্দের বুননে আমাদের সামনে হাজির করেছেন। বিশ্বজিৎ চৌধুরী গল্প বলতে ভালোবাসেন। তাই তাঁর গল্পে গল্পটাই পাঠককে টানে। অহেতুক ভাষার জটিলতা বাড়িয়ে কিংবা কাহিনিকে নীরসভাবে টেনে তিনি পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটান না। তাই তাঁর গল্প বরাবরই টান টান।
লেখক : কথাসাহিত্যিক; অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজ।










