বিপ্রতীপ

নাহার তৃণা | শুক্রবার , ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৪২ পূর্বাহ্ণ

এই পক্ষ

বিশাল বাড়িতে সারাদিন একা একা ভূতের মত বসে থাকি। সপ্তাহে তিনদিন ক্লিনিংয়ের মেয়েটা এসে কাজ করে যায়। মেক্সিকান বংশোদ্ভূত ভেনেসাকে ঠিক মানুষ বলে মনে হয় না আমার। কেমন রোবটের মতো চুপচাপ কাজ করে যায়। ওকে কাজে নিয়োগের সময় ভেবেছিলাম, যাক কথা বলবার একজন মানুষ অন্তত পাওয়া গেল। কিন্তু সে গুড়ে বালি। মেয়েটা আমার আন্তরিক আমন্ত্রণে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। ওর স্বভাব চোখে পড়বার মতো অন্তর্মুখী। কাজ না করলে ওদের জীবন অচল, তাই মুখ বুঁজে এ বাড়িতে আসা। কাজেই ভেনেসার উপস্থিতি আমার বর্তমান একাকীত্বে কোনো হেলদোল ঘটায়নি।

মাঝে মাঝে মনে হয় বাড়িটা বুঝি হা হা করে গিলতে আসছে। এই বাড়িতে এখন আমরা মাত্র দুটি প্রাণী। আমার স্বামী জামশেদ আলম, পেশায় চিকিৎসক। নামকরা শিশু বিশেষজ্ঞ। আমাদের একমাত্র ছেলে সদ্য কলেজে ঢুকেছে। ক্যাম্পাসের স্টুডেন্ট ডর্মে থাকে। ছুটিছাটায় মাঝেমধ্যে এসে দেখা দিয়ে যায়।

টাকা পয়সার অভাব নেই আমাদের, বরং বলা চলে প্রয়োজনের অতিরিক্তই আছে। যেটা নেই, সেটা হচ্ছে সময়। নাহ, ভুল বললাম। আমার অঢেল সময়, ফেলে ছড়িয়েও আরো থেকে যায়। সময়ের অভাব আসলে আমার স্বামীর, জামশেদের। দিনরাতই সে কাজে ব্যস্ত। বাড়ি আসতে আসতে প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। সারাদিনের পর ওর সাথে ডিনার টেবিলে দেখা হয়। বেশির ভাগ দিন তেমন কথাও হয় না। খাওয়ার ফাঁকে টুকটাক যতটুকু না বললেই নয়, সেটুকুই। ইদানীং ডিনার টেবিলে বসেও মেডিকেল জার্নালে চোখ ডুবিয়ে রাখায়, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তেমন কিছু বলা হয়না। অথচ সারাদিনে কতসব অনুভূতি জড়ো হয় বুকের খাঁজে। শব্দেরা আপন মনে ভেসে বেড়ায় মন জুড়ে। প্রকাশের আশকারা না পেয়ে হয়ত অন্য কোথায় উড়াল দেয়। আমার না বলা অসংখ্য কথার বুদবুদের ভেতর বসে আমি গভীর চোখে জামশেদকে দেখি। ওর চারপাশে কেমন অচেনা একটা ঘেরাটোপ দিন দিন ঘন হচ্ছে, টের পাই। অথচ এই জামশেদ মাস কয়েক আগেও বাড়ি ফিরে সারাদিন কেমন কাটলো তার সবটা শোনার জন্য কী হুলস্থুলই না জুড়ে দিতো! গাড়ি এক্সিডেন্ট করায় আমাকে আর চাকরিতে ফিরতে দেয়নি জামশেদ। ওর হয়ত ভয় প্রথমবার প্রাণে বেঁচে গেলেও পরেরবার বউকে ফিরে নাও পেতে পারে। স্বামীর অতিরিক্ত ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে গিয়ে সেদিন কেন যে চাকরিটা ছেড়ে দিতে রাজী হয়ে গেলাম। আজ বড় আফসোস হয়। কাজে কর্মে থাকলে সময়ের এতটা গুরুভার চেপে বসতো না আমার উপর।

আজ প্রায় দু’মাস নয়দিন, আমরা একে অন্যের একান্ত সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত। জড়তা সরিয়ে জামশেদের ঘনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করে দেখেছি। কিন্তু জামশেদের আমন্ত্রণহীন আড়ষ্টতায় নিদারুণ অপমানিত হয়ে সরে আসতে হয়েছে। জামশেদ যে আর আগের মতো নেই, সেটা বুঝতে আমার কষ্ট হয় না। ওর জীবনে নতুন কারো আবির্ভাব ঘটেছে, ক্ষীণ এই সন্দেহটা দিন দিন জমাট বাঁধছে। নইলে আমাকে এভাবে এড়িয়ে চলা কেন!

একাকীত্বের হতাশা সরে গিয়ে মাঝেমধ্যে নিজের ভেতর প্রতিহিংসাপরায়ণ বিধ্বংসী একটা অনুভূতি জেগে ওঠে। মুঠো ভরে ঘুমের ওষুধ খেয়ে জামশেদকে শিক্ষা দেবার কুটিল চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়।

একদিন হঠাৎ বাড়ি ফিরে আমাকে জীবিত না দেখলে জামশেদের প্রতিক্রিয়া ঠিক কেমন হতে পারে, সে দৃশ্যটা মাঝে মাঝে কল্পনায় দেখার চেষ্টা করে হতাশ হই। দিন দিন মনে এই বিশ্বাস গেঁড়ে বসছে: আমার থাকা না থাকায় জামশেদের আর তেমন কিছুই আসবে যাবে না।

ওই পক্ষ

শৈশবেই জীবনের নগ্ন চেহারাটা দেখে ফেলায় একটা বিষয় বুঝে নিতে দেরী হয়নি, যেমন করেই হোক, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। অর্থবিত্তের চাবিটা মুঠোতে পুরতেই হবে, নইলে জীবন বড় করুণ। বড়বেশি নির্মম। আমার কেরানি বাবা, স্বেচ্ছায় গাদাগুচ্ছের সন্তান জন্ম দেয়া বাদে, আমাদের সামান্য ইচ্ছা পূরণেও চরমভাবে ব্যর্থ ছিলেন। অভাবের সংসারে একের পর এক সন্তান জন্ম দেয়া যে অন্যায়, দারিদ্র্যতা বুঝি তার সে বোধটুকুও গিলে নিয়েছিল। বলা যায় বাবার এমন বুদ্ধিহীনতা থেকেও আমি জীবনের পাঠ নিয়েছি। জেদ নিয়ে নিজেকে তৈরি করেছি। আমাদের নয় ভাইবোনের কেউই জীবন সম্পর্কে আমার মতো এতটা সচেতন ছিলো না। নাহ, ভুল বললাম, আমার বড়ভাই ভীষণ ফোকাসড ছিলো, সেজো আপাও। আশ্চর্যজনকভাবে দুজনই দুর্ঘটনায় মারা যায়। বেঁচে থাকলে ওরা হয়ত আমাকেও টপকে যেত।

বড় ভাই এসএসসি, এইচএসসি দুটোতেই স্ট্যান্ড করেছিল। এক সামান্য কেরানির অপুষ্টিতে ভোগা দারুণ মেধাবী বড় ভাই চারপাশটাকে ভীষণ চমকে দিয়েছিল তার অভাবনীয় সাফল্য দিয়ে। আমাদের হতদরিদ্র পরিবারকে সেই প্রথম সমীহের চোখে দেখা হয়েছিল। সাংবাদিক এসেছিল ভাইয়ার সাক্ষাৎকার নিতে। কাগজে ঘটা করে ছাপা হয়েছিল কেরানির ছেলের সাফল্যের অবাক খবর।

তখন থেকেই জেনে গেছি, জীবনে সফল না হলে চারপাশের কেউ ফিরেও তাকাবে না। মানুষ হিসেবে আমার গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি সফলতা। সেদিনের অভিজ্ঞতা আমাকে জেদী হতে সাহায্য করেছিল। যেকারণে প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে এই অবস্থানে আনতে সক্ষম হয়েছি। তার জন্য কতটা রক্ত, ঘাম, আর অশ্রু ঝরাতে হয়েছে সবটা সময়ের বুকে জমা আছে।

স্ত্রী সন্তানের জন্য একটা স্বাস্থ্যবান ভবিষ্যৎ নির্মাণে আজ আমি যথেষ্ট সফল। স্ত্রী নাজ হয়ত ভাবে আমি ওকে অবহেলা করছি। যথেষ্ট সময় দেইনা আর। আসলে ধরা পড়ে যাবার ভয়েই কিছুটা আড়াল নেওয়া। কাজের ছুতো সে আড়াল। নিজে চিকিৎসক বলে ক্যান্সারের স্টেজটা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা আছে। হাতে খুববেশি সময় নেই আমার। স্ত্রী কিংবা ছেলেকে নিজের অসুস্থতার কথা বলিনি, কারণ প্রতিনিয়ত ওদের চোখে নিজের আসন্ন পরিণতির বিষণ্নতা সহ্য করা আমার পক্ষে অসম্ভব। সে আমি দেখতে চাই না।

হঠাৎ একদিন চলে যাবো। এই বরং ভালো। তার আগে সহায় সম্পত্তির খুঁটিনাটি বিষয় ফাইল করে রেখে যাচ্ছি। স্ত্রী, ছেলের নামে আলাদাআলাদা, ফাইলে চিঠি লিখে রাখছি। আমার অনুপস্থিতিতে প্রিয়তমা স্ত্রী নাজ আর ছেলে নাফাজের কোনরকম সমস্যা হবার কথা না। অভাব বড় গুণনাশী। আমার মা তার স্বামীকে, আমরা আমাদের জন্মদাতা বাবাকে, এক মাসের মধ্যেই বিস্মৃত হয়েছিলাম। আশা করি আমার ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটবে না

মেইল: naahaa.teinaa@gmail.com

পূর্ববর্তী নিবন্ধগাউছিয়া রহমানিয়া ফাউন্ডেশনের মাহফিল
পরবর্তী নিবন্ধবিনয় মজুমদার