বিনয় মজুমদার

গাণিতিক হৃদয়ের এক নিঃসঙ্গ সারস

শফিকুর রহমান সজীব | শুক্রবার , ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ

শিবপুর বি.. কলেজের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাসের সেই অজেয় কীর্তিমান ছাত্র, যিনি অনায়াসেই পারতেন কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে আসীন হতে; তিনি বেছে নিলেন এক অনিশ্চিত কণ্টকাকীর্ণ পথকবিতার পথ। তিনি বিনয় মজুমদার। বিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতার মানচিত্রে তিনি এক দেদীপ্যমান অথচ নিঃসঙ্গ ধ্রুবতারা, যার সৃজনশীলতার প্রতিটি স্তরে মিশে আছে গাণিতিক যুক্তি আর এক তীব্র প্রণয়হাহাকার। তাঁর জীবন যেন এক আধুনিক ট্র্যাজেডি, যেখানে প্রজ্ঞা আর উন্মাদনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

১৯৩৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বার্মার (বর্তমান মায়ানমার) মিকটিলা জেলার টোডো শহরে বিনয় মজুমদারের জন্ম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে পরিবারটি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে এবং দেশভাগের অস্থিরতায় ১৯৪৮ সালে তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরনগরের শিমুলপুরে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন।

শৈশব থেকেই বিনয় ছিলেন প্রখর মেধাসম্পন্ন। প্রেসিডেন্সি কলেজে আই.এস.সি পড়ার পর তিনি শিবপুর বি.. কলেজ থেকে প্রকৌশল বিদ্যায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। জনশ্রুতি আছে, তাঁর প্রাপ্ত নম্বরের গৌরবোজ্জ্বল রেকর্ড আজও সেখানে অক্ষুণ্ন। কিন্তু পেশাগত জগতের বৈষয়িক সাফল্য তাঁকে আকৃষ্ট করেনি। অধ্যাপক বা প্রকৌশলীর নিশ্চিত জীবন বিসর্জন দিয়ে তিনি স্থির করেছিলেন-‘আমি শুধুই কবিতা লিখব’।

বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘ফিরে এসো চাকা’ (১৯৬১) বিনয় মজুমদারকে অমরত্ব দান করেছে। দিনপঞ্জির আদলে রচিত এই গ্রন্থটি ছিল তাঁর সমসাময়িক বিদুষী গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের প্রতি এক নিবিড় কিন্তু ব্যর্থ প্রেমের ফসল। ‘চাকা’ শব্দটি মূলত গায়ত্রীর পদবি ‘চক্রবর্তী’র এক গাণিতিক রূপক। কবির দৃষ্টিতে সেই উজ্জ্বল মানবী ছিল এক ‘উজ্জ্বল মাছ’, যা দৃশ্যত নীলিম কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ সলিলে নিমজ্জিত। গণিতবিদদের মতে, কবির এই ‘চাকা’ কেবল ব্যক্তিক প্রেম নয়, বরং এক শাশ্বত প্রগতির প্রতীক, যাকে তিনি স্বীয় জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।

বিনয় মজুমদার তাঁর কবিতায় সঞ্চারিত করেছিলেন এক অদ্ভুত গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক শৈলী। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান ও সাহিত্য পরস্পর বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়। তাঁর কবিতায় অনুভূত হয় ‘অ্যাক্সিওমেটিক ট্রুথ’ বা স্বতঃসিদ্ধ সত্যের আঘ্রাণ। সমালোচকদের মতে, তাঁর কাব্যধারা ছিল এক ধরনের ‘সায়েন্টিফিকআার্টিস্টিক ফিল্ড জার্নাল’, যেখানে তিনি নিসর্গ ও সময়কে এক নিরাসক্ত বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের ন্যায় উপস্থাপন করতেন। এমনকি মৃত্যুর সংজ্ঞাও তিনি অন্বেষণ করেছিলেন গাণিতিক সূত্রে। তাঁর দৃষ্টিতে মৃতদেহ মানে হলো ‘মৃতদেহ গুণ রুট মাইনাস ওয়ান’, যেখানে মৃত্যু মানেই হলো জাগতিক গণ্ডি পেরিয়ে এক কাল্পনিক অনন্তের সঙ্গে লীন হওয়া।

বিনয় মনে করতেন, কবিতার গঠন হওয়া উচিত গাণিতিক উপপাদ্যের মতো সুসংবদ্ধ। প্রাচীন কবিদের উদাহরণ টেনে

তিনি বলতেন:

প্রাচীনকালেও কবিরা বিজ্ঞানভাবনা থেকে কাব্যের আঙ্গিক সৃষ্টি করে নিয়েছেন। আমি যে খুব নতুন কিছু করছি তা নয়। যেমন ধরো কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব কাব্য’। একটি দৃশ্যে যখন হরপার্বতীর বিয়ে হচ্ছে, সেখানে কালিদাস লিখলেন, পৃথিবীর চারদিকে যেমন আলো আর অন্ধকার ক্রমাগত ফিরেফিরে আসে, তেমনি শিব আর উমা আগুনের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছেন। এটা তো বিজ্ঞানই।”

এই বৈজ্ঞানিক যুক্তি থেকেই তিনি তাঁর কবিতায় নিয়ে এসেছিলেন ‘ব্রোঞ্জের জাহাজ’এর মতো নিপুণ চিত্রকল্প, যা চুম্বক দ্বারা আকর্ষিত হয় না।

বিনয় মজুমদারের কাব্যচর্চায় প্রায়শই দীর্ঘ বিরতি পরিলক্ষিত হতো। এর কারণ হিসেবে তিনি বিষয়বস্তুর অভাব ও দার্শনিক প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করতেন। তাঁর মতে, নিছক দৃশ্যের বর্ণনা কবিতা নয়; সেই দৃশ্য কেন বিদ্যমান এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়মতান্ত্রিকতায় তার গুরুত্ব কতটুকু, তা সংযুক্ত না করলে আধুনিক কবিতা পূর্ণতা পায় না। উপমা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত গূঢ়: “উপমা দেওয়া মানেও দর্শনকে হাজির করা। এই দর্শনের উপস্থিতিই পাঠকের মনকে ভাবাবেগে আন্দোলিত করে, রসাপ্লুত করে, কবিতাকে চিরস্থায়ী করে।”

বিনয় মজুমদারের ব্যক্তিজীবন ছিল নিঃসঙ্গতা ও উচ্চাশার এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। তিনি নিজেকে শিমুলপুরের নিভৃত আশ্রমে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত করেছিলেন। একাকিত্ব আর উচ্চাশা সম্পর্কে তিনি একটি হৃদয়স্পর্শী উদাহরণ দিতেন:

একসময় আমি মাঝে মাঝে হাতে দানা নিয়ে বসে থাকতাম, শালিখ পাখিদের খাওয়ানের আশা নিয়েআসত না। খুব ব্যথা পেতামঅথচ কী বিশ্বাসে ওরা গরুর শিঙের উপর গিয়ে বসত। আসলে, একাকিত্ব আর উচ্চাশার এই পাশাপাশি অবস্থানই কবির জীবন, কবির যাপন।”

এই নিঃসঙ্গ যাপন এবং গায়ত্রীর প্রতি তাঁর বিফল প্রেমই তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল মানসিক বিপর্যয়ের দিকে। তবে এই দুঃখই ছিল তাঁর কবিতার প্রধান জ্বালানি এবং অস্তিত্ব রক্ষার মাধ্যম। নিজের অজস্র কাব্যসৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি এক নির্মোহ স্বীকারোক্তিতে বলেছিলেন:

আমি পনেরো হাজার কবিতা লিখেছি। কেন লিখেছি কেউ জানে না, আমিও জানি না। না লিখলে বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি হতো না, আমার ক্ষতি হতো। লিখতে লিখতে বুঝেছি আমি কবিতা লিখতে জানি না। লিখতে লিখতে বুঝেছি কবিতা লিখলে দুঃখ ভোলা সম্ভব। কিন্তু দুঃখ ভুলে গেলে আর কবিতা লেখা যায় না।”

বিনয় মজুমদারের কবিতা কেবল অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং অলঙ্কারের নিপুণ প্রয়োগে ঋদ্ধ এক গাণিতিক শিল্প:

মুকুরে প্রতিফলিত সূর্যালোক স্বল্পকাল হাসে

শিক্ষায়তনের কাছে হে নিশ্চল, স্নিগ্ধ দেবদারু

জিহ্বার উপরে দ্রব লবণের মত কণাকণা…”

এখানে ‘মুকুর’ বা আয়না অস্তিত্বের নশ্বরতার প্রতীক। দেবদারু বৃক্ষটি নিশ্চল প্রজ্ঞার রূপক। কবির এই দৃষ্টিতে মানুষের জ্ঞানতৃষ্ণা অজানাকে জানার জন্য ব্যাকুল হলেও প্রকৃত সত্য তথা ‘সারস’ সর্বদাই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।

​‘ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?’: এটি কবির অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা যেখানে তিনি এক নিঃস্বার্থ এবং আধ্যাত্মিক প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছেন। “মৃত্যুর প্রস্তর হাতে ধ’রে রাখি” পঙক্তিটিতে প্যারাডক্স (Paradox) এবং শক্তিশালী মেটাফোর নিহিত। প্রিয়তমার গ্রহণ করার অক্ষমতা প্রকাশে কবি অলঙ্কারিক প্রশ্ন বা ‘Rhetoical Question’ ব্যবহার করেছেন।

​‘আমার আশ্চর্য ফুল, যেন চকোলেট’: সৃষ্টি বা প্রিয়তমাকে ‘আশ্চর্য ফুল’ বা চকোলেটের সাথে তুলনা করাটি এক অভিনব সিমিলি (Imagery)। “আকাশের লালা ঝরে” পঙক্তিটি বিনয়ের নিজস্ব ঘরানার এক পরাবাস্তব ইমেজারি (Simile)

​‘আমরা দুজনে মিলে জিতে গেছি বহুদিন হলো’: সময়ের ব্যবধানে ধর্মীয় পরিচয় বদলে গেলেও স্মৃতির সংযোগ যে অমলিন, তা এই আত্মজৈবনিক কবিতায় ফুটে উঠেছে। “চিঠি লিখব না আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়” পঙক্তিটি চিরন্তন সম্পর্কের স্মারক।

আমিই তো চিকিৎসক…’: এখানে ‘পারসোনা’ টেকনিকের মাধ্যমে কবি চিকিৎসকের ছদ্মবেশে নিজের ব্যর্থতা ও অপরাধবোধ ব্যক্ত করেছেন।

ষাটের দশকে প্রথাবিরোধী ‘হাংরি জেনারেশন’ আন্দোলনে যোগ দিলেও গোষ্ঠী রাজনীতির সংকীর্ণতায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি সেই সঙ্গ ত্যাগ করেন। সত্তরের দশক থেকে সিজোফ্রেনিয়া তাঁকে গ্রাস করে নেয়। জীবনের শেষ কয়েক দশক তিনি ঠাকুরনগরের শিমুলপুরে নিঃসঙ্গ ও দারিদ্র্যের মধ্যে অতিবাহিত করেন। অথচ এই জীর্ণ অবস্থাতেই কলকাতার সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন তিনি লিখে ফেলেন ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’, যা ২০০৫ সালে তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কার এনে দেয়।

২০০৬ সালের ১১ ডিসেম্বর যখন এই মহান কবির জীবনাবসান ঘটে, তখন তাঁর শেষযাত্রায় ছিল না কোনো বাহ্যিক আড়ম্বর। তিনি লিখেছিলেন, “মানুষ নিকটে এলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়”। বিনয় মজুমদারও এক সারসের মতোই নিজেকে মানুষের ভিড় থেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আজীবনের নিঃসঙ্গ কাব্যতত্ত্বে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি এক গাণিতিক মহাবিন্যাসের রূপকার হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিপ্রতীপ
পরবর্তী নিবন্ধচবির ছড়া থেকে সেগুন-গামারি কাঠ উদ্ধার