বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক পরিবহন ও রেলপথ খাতে দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে সংকটের মুখে পড়েছিল দেশ, তা সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সংস্কারের জন্য করণীয় ও অনিষ্পন্ন কাজগুলো নথিভুক্ত করে রেখে যাওয়ার কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, কোন খাতে কী কাজ করা হয়েছে, কোন সিদ্ধান্তগুলো প্রস্তুত আছে এবং কোন জায়গায় সময় ও পূর্ণমেয়াদি সরকারের প্রয়োজন–এসব বিষয় লিখিতভাবে রেখে যাওয়া হচ্ছে, যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ এগিয়ে নিতে পারে। খবর বিডিনিউজের।
উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আস্থার ঘাটতি ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা। আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কাছে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে পড়েছিল, যার ফলে জ্বালানি আমদানিতে ঝুঁকি তৈরি হয়। তিনি বলেন, আমাদের প্রথম কাজ ছিল কন্টেইন করা– যাতে অর্থনীতি ধসে না পড়ে, বড় সামাজিক অস্থিরতা তৈরি না হয়। তার ভাষ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বকেয়া পরিশোধ এবং নিয়মিত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করাই ছিল আস্থা ফেরানোর প্রধান উপায়। সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা বলেন, বকেয়া পরিশোধ ও নিয়মিত অর্থ ছাড়ের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এলএনজি সরবরাহকারী যেখানে আগে ছিল ১০ জন, এখন তা বেড়ে ২৮ জন হয়েছে। খোলা প্রতিযোগিতার ফলে আমদানিতে প্রিমিয়াম কমেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর ফলে প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের নীতিগত জট নিরসনে একাধিক বিধিমালা ও নীতিমালা প্রস্তুত করে রেখে যাওয়ার কথাও উপদেষ্টা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ার যে অভিযোগ ছিল, তা সমাধানে নতুন নীতিমালা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে আলাদা বিধিমালা প্রস্তুত রয়েছে, যা আইনি প্রক্রিয়ায় আছে। এই কাজগুলো আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে নথিভুক্ত করে রেখে যাচ্ছি, যাতে নতুন সরকার এসে এগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার শুধু নীতিমালা করেই থেমে থাকেনি। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আলোচনার ভিত্তিতে কাউকে কোনো প্রকল্প দেওয়া হয়নি। ওপেন টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে, আর এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। সরকারি দপ্তরগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ ও নেট মিটারিং চালুর কথাও তুলে ধরেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, রেলপথের সমস্যা মেটাতে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়নে ভারতীয় একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির আওতায় ২০০ ব্রডগেজ কোচ কেনা হচ্ছে। এই চুক্তির আওতায় প্রথম ২০টি কোচ আগামী মার্চ মাসে আসবে। রেলের ওয়ার্কশপ আধুনিকায়নের জন্য ডিপিপি প্রস্তুত থাকলেও অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি বলে উপদেষ্টার ভাষ্য। সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই বা তিনবার ফিটনেসে ফেল করলে সেই গাড়ি স্ক্র্যাপ হবে, আর রাস্তায় নামতে পারবে না। চালকের লাইসেন্স পেতে বাধ্যতামূলক ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ চালুর কথাও তুলে ধরেন ফাওজুল কবির খান। সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন খাতের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে রাখা হয়েছে। আমরা কোথায় ছিলাম, কী করেছি এবং এখন সেক্টরগুলো কোথায় আছে– সব লিখিতভাবে রেখে যাচ্ছি। তিনি বলেন, সরকারের মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বড় বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। স্থিতিশীল ও পূর্ণমেয়াদি নির্বাচিত সরকার এ খাতগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারবে।












