বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে গাড়ির ব্যবহার সীমিত করা, আলোকসজ্জা পরিহার, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এয়ার কন্ডিশনার) তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখাসহ ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, করপোরেশনসহ সব অফিসের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এই নির্দেশনাপত্র জারি করা হয়। এর আগে এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনাপত্রে বলা হয়, বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করা প্রয়োজন। সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, করপোরেশনসহ সব অফিসে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, তা হলো : ‘দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার পরিহার করতে হবে এবং জানালা ও দরজা কিংবা ব্লাইন্ড খোলা রেখে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করতে হবে। বিদ্যমান ব্যবহৃত আলোর অর্ধেক ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাইটের ব্যবহার পরিহার করতে হবে। অফিস চলাকালে প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাইট, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হবে। এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখতে হবে। অফিসকক্ষ ত্যাগ করার সময় কক্ষের বাতি, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ সব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ করতে হবে। অফিসের করিডর, সিঁড়ি, ওয়াশরুম ইত্যাদি স্থানে অপ্রয়োজনীয় বাতি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বিদ্যুৎ–সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। অফিস সময় শেষ হওয়ার পর সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি (লাইট, ফ্যান, কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি) বন্ধ নিশ্চিত করতে হবে। যাবতীয় আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। গাড়ির ব্যবহার সীমিত করতে হবে। জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে।’
নির্দেশনাপত্রে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্ব–স্ব নিয়ন্ত্রণাধীন সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর বা সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য বলা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, গ্রাহক তার চাহিদানুযায়ী জ্বালানিসহ অন্যান্য ইউটিলি সার্ভিস ব্যবহার করবে। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যাতে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে তাকে সচেতন হতে হবে। আর সচেতনতা তখনই সৃষ্টি হবে, যখন গ্রাহক পর্যায়ে এতদবিষয়ে পর্যাপ্ত আর্থিক ও কারিগরি জ্ঞান বা তথ্য থাকবে। আর গ্রাহককে এ জ্ঞান বা তথ্য প্রদানের দায়িত্ব নিতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং ইউলিটি সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে। সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যা আরও বেশি প্রযোজ্য। গ্রাহক যদি সাশ্রয়ী হওয়ার আর্থিক দিকটি অনুধাবন করতে পারেন, তাহলেই তিনি এর জন্য আগ্রহী হবেন। হিসাব কষে বুঝিয়ে বলতে হবে–এক ঘণ্টা কম বিদ্যুৎ ব্যবহারে কী পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে এবং বিদ্যুৎ বিলে তার যথাযথ প্রতিফলন থাকতে হবে। সাশ্রয়ী গ্রাহকের জন্য প্রণোদনা প্রদানের বিষয়টিও চিন্তা করা যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বছর তিনেক আগে ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ এবং সৌরবিদ্যুৎ অবহেলিত কেন’ শীর্ষক একটি কলামে লিখেছিলেন, দেশের অন্য কোথাও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন যথাযোগ্য মনোযোগ আকর্ষণ করেনি। হয়তো সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং কয়লা ও গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মেগা–প্রজেক্টগুলো অনেক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে ভেবে সরকার–প্রধানের নজর ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ’–এই ছোট ইস্যুটিতে ফিরে আসেনি! কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দেশের ১০টি সিটি কর্পোরেশনের প্রত্যেকটিতে একটি করে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট প্রতিষ্ঠা পরিবেশ–বান্ধব পদ্ধতিতে বর্জ্য–ব্যবস্থাপনার দিক্ থেকে অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে। দেশের আরেকটি দুঃখজনক অবহেলার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সৌরবিদ্যুতের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। গত ২০২০ সালের মধ্যেই ভিয়েতনাম বাড়ির ছাদের সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৯০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করেছে। অথচ বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো এক হাজার মেগাওয়াটের নিচে রয়ে গেছে। এই অবাক–করা তথ্যদুটিকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের এনার্জী–সম্পর্কিত সঠিক পথ নির্ধারণের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্ববহ বিবেচনা করতে হবে। কারণ, ২০২০ সাল থেকে এলএনজি’র অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক দামবৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রধানত ফসিল–ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানী–নির্ভর বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচকে ইতোমধ্যেই প্রচণ্ডভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, আর ভিয়েতনামের সোলার–এনার্জী উৎপাদনে এই অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জনের খবরটি চোখে আঙুল দিয়ে বাংলাদেশকে দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে সোলার এনার্জীকে যথাযথ অগ্রাধিকার দিলে বাংলাদেশও অদূর ভবিষ্যতে এলএনজি–নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে সুলভে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জনে সক্ষম হবে।
এখন সকলেরই উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করার দিকে নজর দেওয়া। অস্বীকার করা যাবে না যে আমরা নিজেদের অজান্তে প্রতিদিনই অনেক বেশি বিদ্যুৎ অপচয় করে ফেলি। তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময় তা অপচয় হচ্ছে কি না সে বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া মানে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে দেশকে এবং দেশের মানুষকে রক্ষা করা। আমাদের সবাইকে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে।








