পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালে (পিসিটি) বিদেশি অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া জোরেশোরে শুরু হয়েছে। সরকারের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথরিটি বিদেশি অপারেটর নিয়োগের ব্যাপারে উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহযোগী এই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টের ভিত্তিতেই পিসিটির অপারেটর নিয়োগের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। সৌদি আরবের রেড সিট গেটওয়ে টার্মিনালের প্রস্তাব নিয়ে বর্তমানে কাজ চলছে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, নগরীর পতেঙ্গার কর্ণফুলী নদীর পাড়ের ড্রাইডক থেকে বোট ক্লাব পর্যন্ত রাস্তার পাশের বন্দর কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন ৩২ একর জায়গা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পড়ে ছিল। জায়গাটি উন্নয়নের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করার শুরুতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা যায় যে, সামান্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলে উক্ত স্থানটি বন্দরের জন্য বড় ধরনের আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেবে। নির্মাণ করা সম্ভব হবে চমৎকার এবং কার্যকর একটি টার্মিনাল। ওই আলোচনার প্রেক্ষিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ চিটাগাং ড্রাইডক থেকে বাঁক নিয়ে বোট ক্লাব পর্যন্ত যাওয়া রাস্তটি পুরোপুরি সোজা করে দিয়ে উক্ত জায়গাটিকে একই প্লটে নিয়ে আসা হয়। ওই ভূমিতে ১৬ একর ইয়ার্ড ছাড়াও বিভিন্ন পশ্চাদসুবিধাসহ ৬০০ মিটার জেটি নির্মাণ করা হয়েছে।
বন্দর সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধীনে ৭টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ করছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ করে আনা হয়েছে। বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালে একই সাথে সাড়ে চার হাজার টিইইউএস কন্টেনার রাখা যাবে এবং বছরে গড়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। এই টার্মিনালে ১৯০ মিটার লম্বা ও ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের ৩টি কন্টেনারবাহী জাহাজ ভিড়ানো যাবে। এছাড়া ২২০ মিটারের একটি ডলফিন জেটিও প্রকল্পটিতে রয়েছে। গত ২১ জুলাই বহুল প্রত্যাশার এই টার্মিনালে পরীক্ষামূলকভাবে জাহাজ বার্থিং দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও পরবর্তীতে তা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে।
টার্মিনালটি পুরোদমে চালু করতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ইকুইপমেন্ট লাগবে বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, সরকার এই টার্মিনালটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে পরিচালনা করবে। এজন্য আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রাইভেট অপারেটর নিয়োগ করা হবে। পিসিটির প্রয়োজনীয় সব ইকুইপমেন্ট প্রাইভেট অপারেটরই স্থাপন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিদেশি অপারেটরদের কাছ থেকে কয়েকটি প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এরমধ্যে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের প্রস্তাবটি যাছাই বাছাই করা হচ্ছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
বন্দর সূত্র জানায়, সরকারের পিপিপি অথরিটি এই টার্মিনালের অপারেটর নিয়োগের জন্য বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশনকে (আইএফসি) নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের প্রস্তাবটি যাচাই বাছাই করছে। পিসিটি পরিচালনার ব্যাপারে তারা শেয়ারিং নিয়ে যেসব প্রস্তাবনা দিয়েছে সেগুলো যদি বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য লাভজনক হয় তাহলে প্রস্তাবটি নিয়ে অগ্রসর হবে পিপিপি। পিপিপি অথরিটির ক্লিয়ারেন্স ছাড়া পিসিটি নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ এককভাবে অগ্রসর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও বন্দরের একাধিক কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন।
অপর একটি সূত্র বলেছে, পিসিটি পরিচালনার সক্ষমতা বন্দর কর্তৃপক্ষের রয়েছে। দেশের একাধিক বেসরকারি অপারেটরও এই টার্মিনাল হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম। কিন্তু সরকার এই টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের মাধ্যমে কূটনৈতিক কিছু সফলতাও অর্জন করতে চায়। এজন্য শুধু বন্দরের দৃশ্যমান লাভই নয়, একই সাথে অদৃশ্য কিছু লাভক্ষতির হিসেবও সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে করা হবে। সবকিছু মিলে পিসিটির কার্যক্রম শুরু হতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে বলে সূত্র মন্তব্য করেছে।
বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের টুকটাক কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে। এসব কাজ গুছিয়ে আনা হচ্ছে। এছাড়া কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পিসিটিতে এখনো স্ক্যানার স্থাপন করেনি। স্ক্যানার স্থাপন করতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে। সবকিছু গুছানোর পর টার্মিনালটিতে জাহাজ ভিড়ানো এবং কন্টেনার হ্যান্ডলিং শুরু হবে বলেও বন্দর সচিব উল্লেখ করেন। তিনি পিপিপি অথরিটির নিয়োগ দেয়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে বলে স্বীকার করলেও এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে ১৯২ মিটার লম্বা এবং সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ানো যায়। মোহনা থেকে প্রায় ১৪ নটিক্যাল মাইল ভিতরে এসে এসব জাহাজ বার্থিং দিতে হয়। গুপ্তাখালের কাছে একটি বাঁক থাকার কারণে এর থেকে বড় জাহাজ বন্দরের জেসিবি, সিসিটি এবং এনসিটিতে ভিড়ানো যায় না। কিন্তু পিসিটিতে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ানো যাবে। মোহনা থেকে মাত্র ৬ নটিক্যাল মাইলের ভিতরেই কন্টেনার টার্মিনালের অবস্থান। তাছাড়া কোনো বাঁক না থাকার কারণে অনেক লম্বা জাহাজও এখানে ভিড়ানো যাবে। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের ২০০ মিটারেরও বেশি ল্যান্থের জাহাজ বন্দরে ভিড়ানোর জন্য অনুমোদন দিতে পারে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, পিসিটি টার্মিনাল বন্দরের জাহাজ বার্থিং এর ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এই টার্মিনাল শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমেই নয়, একই সাথে দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যেও একটি বড় প্রভাব ফেলবে।
স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। গতবছর জুনে এই টার্মিনাল চালু হওয়ার কথা থাকলেও করোনাকালসহ নানা প্রতিকূলতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ দুই দফায় বাড়াতে হয়েছে।












