যুদ্ধের অস্থিরতার মধ্যে সরকার মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও অন্য উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। সেই সঙ্গে তিনি এও বলেছেন, জ্বালানির কোনো সংকট বর্তমানে বাংলাদেশে নেই। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে ঢাকা ১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাসেমের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের অনুপস্থিতিতে তিনি সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রতিমন্ত্রী ‘জ্বালানি সংকট নেই’ দাবি করার পর বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদে হট্টগোল ও প্রতিবাদ করেন। খবর বিডিনিউজের।
সম্পূরক প্রশ্নে মীর আহমেদ বিন কাসেম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের স্থপতি হচ্ছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আজকে সেই মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলছে। যুদ্ধবিগ্রহে আমাদের বাংলাদেশি নাগরিকরা সেখানে মৃত্যুবরণ করেছে। জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ২৫ জন লোকের মৃত্যু হয়েছে জ্বালানি বিক্রয় বিষয়ক বিরোধ নিয়ে। এরপর তিনি জানতে চান, জিয়াউর রহমানের সন্তান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংকট নিরসনে কী ভূমিকা পালন করছেন?
জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি যাতে একাধিক সোর্স থেকে আমরা সরবরাহ করতে পারি, সে জন্য ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার আমাদের সাথে বসেছেন। জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে উনি বসেছেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও যে সকল সোর্স থেকে আমরা জ্বালানি আনতে পারি, সে ব্যাপারে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি এবং ইনশাল্লাহ আমরা সেটাতে সফল হব। তবে কোন উৎস থেকে কী ধরনের জ্বালানি পাওয়ার চেষ্টা চলছে, তার বিশদ বিবরণ প্রতিমন্ত্রী দেননি। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার ছিল সেখানে থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেটা নিশ্চিতকরতে আমাদের মিশনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ২৪/৭ কাজ করে তারা করে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত পাঁচটি ভাইকে আমরা হারিয়েছি। নিহতদের মধ্যে দুজনের মরদেহ দেশে আনা গেছে বলে জানান শামা ওবায়েদ।
এছাড়া ইরানের তেহরান থেকে ১৮৬ জন বাংলাদেশিকে আইওএমের সহযোগিতায় একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে দেশে ফিরিয়ে আনার কথাও সংসদে বলেন তিনি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখনই সম্ভব নয়: এদিন প্রশ্নোত্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়। চট্টগ্রাম ১৫ আসনের শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের লিখিত উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে এখনই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হচ্ছে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সহযোগিতা ও সমর্থন জোরদারের পাশাপাশি বাংলাদেশ কূটনৈতিক, আইনি ও মানবিক সব উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে। মন্ত্রী বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গা তথ্য যাচাই করে যাচ্ছে।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ৬ ধাপে ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জনের তথ্য যাচাই করেছে। পাঠানো তালিকার মধ্যে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৪ জনকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে মিয়ানমার সরকার।
আইসিজের মামলায় বাংলাদেশের সমর্থন : রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার কথাও সংসদে তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়াগুলোতে বাংলাদেশ নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলা বিচারাধীন। সে মামলা পরিচালনায় বাংলাদেশ ‘আর্থিক সহায়তা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান উদ্যোগগুলোকে বাংলাদেশ গভীর গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
রপ্তানি বাজার বাড়াতে নতুন অঞ্চলে নজর: জামালপুর ২ আসনের এ ই সুলতান মাহমুদ বাবুর প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী রপ্তানি বাজার সমপ্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কূটনীতির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার মতো প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি দেশীয় পণ্যের নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধানে সরকার কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার কথাও তিনি বলেন।
সম্ভাবনাময় দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে সংসদে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার। তৈরি পোশাক খাতের ওপর দীর্ঘদিনের এককেন্দ্রিক নির্ভরশীলতা কমিয়ে বহুমাত্রিক রপ্তানি কাঠামো গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে বিভিন্ন দূতাবাস ‘ডায়াসপোরা এনগেজমেন্ট’ কার্যক্রম জোরদার করেছে বলেও জানান মন্ত্রী।
দেশে কর্মক্ষম মানুষ ৭ কোটি ১০ লাখ : ফেনী ১ আসনের জয়নাল আবেদীনের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ২০২৪ সালের শ্রম জরিপ অনুযায়ী দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৭ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার এবং নারী ২ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার। মন্ত্রী বলেন, শ্রম জরিপ অনুযায়ী প্রতি বছর ১৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে।
২০২৬ সালের শ্রম জরিপ পরিচালনার জন্য একটি প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।











