বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

চট্টগ্রাম-১৫ লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আংশিক । নানা কৌশলে এগুচ্ছেন প্রার্থীরা

মোহাম্মদ মারুফ, লোহাগাড়া | শনিবার , ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম১৫ (লোহাগাড়াসাতকানিয়া আংশিক) আসনে ভোটের রাজনীতি ক্রমেই জমে উঠছে। মাঠ পর্যায়ের তৎপরতা, প্রার্থীদের দৌঁড়ঝাঁপ ও ভোটারদের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে সর্বত্র। কোনো পক্ষই এখনো নিশ্চিত জয়ের নিশ্চয়তায় নেই। বরং সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ কৌশল সাজানো ও পাল্টা কৌশল মোকাবিলায়। এই আসনে জয়পরাজয়ের ব্যবধান হবে অতি সূক্ষ্ম। এছাড়া গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার, চায়ের দোকান কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সবখানেই এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় নির্বাচন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে সভাসমাবেশ, উঠান বৈঠক ও ঘরোয়া মতবিনিময়। প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। শুনছেন মানুষের প্রত্যাশা ও অভিযোগ। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী (দাঁড়িপাল্লা) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী শরীফুল আলম চৌধুরী (হাতপাখা)

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম১৫ (লোহাগাড়াসাতকানিয়া আংশিক) আসনে রয়েছে ২০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা। এরমধ্যে লোহাগাড়া উপজেলায় ৯টি ইউনিয়ন এবং সাতকানিয়া উপজেলায় ১১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা। মোট ভোটার ৪ লাখ ৯১ হাজার ৭৮৭ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪১০ জন। মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৭ জন। পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ১৪ হাজার ২৭২ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১৩ হাজার ৫০৫ জন ও মহিলা ভোটার ৭৬৭ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫৭টি। ভোটকক্ষের সংখ্যা ৯৫৯টি। এরমধ্যে স্থায়ী ৯২৪টি ও অস্থায়ী ৩৫টি। লোহাগাড়া উপজেলায় ৯ ইউনিয়নে ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার ১৭১ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৩ জন ও মহিলা ভোটার ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৮ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৬৭টি। ভোট কক্ষের সংখ্যা ৪৫৮টি। এরমধ্যে স্থায়ী ৪৫১টি ও অস্থায়ী ৭টি। সাতকানিয়া উপজেলায় ১১ ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ভোটার ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৬ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৬৭ জন ও মহিলা ভোটার ১ লাখ ১৮ হাজার ২৪৯ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৯০টি। ভোট কক্ষের সংখ্যা ৫০১টি। এরমধ্যে স্থায়ী ৪৭৩টি ও অস্থায়ী ২৮টি।

স্থানীয় ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবার ভোটাররা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচেতন। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতি এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান তারা। অনেক ভোটার বলছেন, দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, এলাকার সাথে সম্পৃক্ততা ও সংকটে পাশে থাকার ভূমিকা এবার বড় প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা নিচ্ছেন আলাদা কৌশল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে। ভিডিও বার্তা, পোস্টার, স্লোগান ও ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।

গতকাল শুক্রবার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, এই আসনে জয়পরাজয় নির্ভর করবে শেষ মুহূর্তের কৌশলের উপর। দলীয় ঐক্য, কর্মীদের সক্রিয়তা, ভোটার উপস্থিতি ও ভোট কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই প্রতিটি পদক্ষেপই এখন ভোটের অঙ্ক কষছে অত্যন্ত সতর্কভাবে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার ভোটারদের অবস্থান নিয়েও চলছে নানা হিসাবনিকাশ। কেউ উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কথা বলছেন, কেউ পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে মাঠে চলছে তুমুল প্রতিযোগিতা। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখতে প্রশাসনের তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো। আইনশৃক্সখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। সবদিক বিচেনায় এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে কঠিন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও কৌশল নির্ভর। শেষ পর্যন্ত কার কৌশল কাজে আসে, কে পায় ভোটারদের আস্থা তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত। এই আসনের ফলাফল নিয়ে শুধু এলাকার মানুষের নয়, নজর থাকবে বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনেও।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন বলেন, ধানের শীষ সবসময় মানুষের একটি প্রিয় প্রতীক। দুঃসময়েও আমি এলাকার মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি, তাই আজ আমি সবার সমর্থন পাচ্ছি। নির্বাচিত হলে প্রথম কাজ হবে মানুষের মন থেকে ভয় ও শঙ্কা দূর করা। মানুষ যাতে শান্তি ও শৃক্সখলার মধ্যে এলাকায় বসবাস করতে পারেন, সে দিকে দৃষ্টি রাখব। নির্বাচনী এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়নেও কাজ করব। ভোটাররা নিশ্চিন্তে ভোটকেন্দ্রে আসবেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিবেন। এছাড়া লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান জোরদার করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আমি শতভাগ আশাবাদী এই আসনের মানুষের ভোটে ধানের শীষ প্রতীক জয়ী হবে।

জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বলেন, নির্বাচনকালীন আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক। যা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের কাছ থেকেও ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। যা তার প্রচারণাকে নতুন শক্তি যোগাচ্ছে। তাদের চাওয়াপাওয়ার কথা আমি ভালোভাবে বুঝতে পারি। এমন ভাবেই আমরা জনগণের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলে জনগণ নিজের রায় দিয়ে আসল জয়ের ছবি স্পষ্ট করবে।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি রয়েছে। যে কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশা করছি, ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকয়েকটি শর্তে জয়পাহাড়ে বিপিসির ভবনের নির্মাণকাজ শুরুর অনুমোদন
পরবর্তী নিবন্ধশান্তির রাউজান গড়তে সকল প্রার্থীর অভিন্ন সুর