বিএনপির এক, জামায়াত এনসিপির দুই শপথ

| বুধবার , ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপি শপথ নেবে কি না, তা নিয়ে আগেই আলোচনা শুরু হয়েছিল, আর এই শপথ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে জটিলতা সঙ্গী করেই যাত্রা শুরু করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোর নির্বাচিত প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যের শপথ না নেওয়ায় জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিএনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট থেকে নির্বাচিতরা প্রথমে শপথ নিতে না চাইলেও পরে দুই শপথই নিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ১০টা ৪০ মিনিটে জাতীয় সংসদের শপথ কক্ষে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শুরু হয় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে। প্রথমে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীদের সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। খবর বিডিনিউজের।

দেশের আইনসভার সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালনের শপথ নেন আগের সংসদের স্পিকারের কাছ থেকে। তবে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রকাশ্যে নেই, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু হত্যা মামলায় কারাগারে। সে কারণে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এবার শপথ নিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছ থেকে। বিএনপির নবনির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না বলে অনুষ্ঠান শুরুর আগেই ঘোষণা দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ।

যা বলেছে বিএনপি : বিএনপির সিদ্ধান্ত তুলে ধরে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত নেই বলে বিএনপির সংসদ সদস্যরা এ পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। তিনি বলেন, আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনও ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে, সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে এবং কোনো এরকম ফর্মএটা সংবিধানে নেই।

সাদা একটি ফর্ম দেখিয়ে তিনি বলেন, এই ফর্মটি তৃতীয় তফসিলে আছে, সাদাটা। এই রকম তখন একটা ফর্ম সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে তখন জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে বিধায় আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে এই পর্যন্ত আমরা এসেছি।

দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন বলেন, বিএনপি সংবিধান মেনে চলছে এবং আগামী দিনেও চলবে। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে বের হয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটাতো সাংবিধানিকভাবে করতে হবে। সংবিধান পরিবর্তনের আগে সেটা এই মুহূর্তে করার সুযোগ নেই। সাংবিধানিকভাবে সংসদ চলতে হবে তো।

বেঁকে বসেও পরে দুই শপথ জামায়াতের : বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে সব সবধরণের শপথ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার ঘোষণা আগেই দিয়েছিল জামায়াত। বিএনপির নবনির্বাচিতরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় জামায়াত জোটের নির্বাচিতরা সব রকম শপথ বর্জন করছেন বলে বেলা পৌনে ১২টার দিকে এক ফেইবুক পোস্টে জানান এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি লেখেন, আইন অনুযায়ী বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় কোনো শপথই নিবে না ১১ দলীয় জোট। পরে ওই পোস্টটি ডিলেট করে দেন আসিফ।

এরমধ্যে বেলা সোয়া ১২টায় জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিতরা শপথ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে অংশ নেন। দেরি করে আসায় ঢাকা৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনও তাদের সঙ্গে দ্বিতীয় পর্বের শপথে অংশ নেন। ১২টা ২২ মিনিটে সংসদ সদস্য হিসেবে তারা শপথ নেন। ১২টা ২৪ মিনিটে শপথপত্রের নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর করেন তারা। ১২টা ২৭ মিনিটে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তাদের শপথ শুরু হয়। তবে এর আগে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়েই শপথকক্ষ ত্যাগ করেন রুমিন ফারহানা ও ইশরাক।

জামায়াতের পথেই এনসিপি : প্রথমে কোনো শপথ না নেওয়ার ঘোষণা দিলেও জামায়াতের নির্বাচিত প্রার্থীদের মতই পরে দুই শপথই নেন এনসিপির নির্বাচিত ছয়জন। তার আগে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে এক ফেইসবুক পোস্টে এনসিপির তারা শপথ নেবেন বলে জানান এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও নারায়ণগঞ্জ৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন।

ওই পোস্টে তিনি লেখেন, জনগণ জুলাইয়ের আকাঙ্খা বাস্তবায়নের জন্য আমাদেরকে ম্যান্ডেট দিয়েছে, এজন্য আমরা দুটি শপথই নিচ্ছি। বিএনপি ক্ষমতামুখী দল হিসেবে শুধু সরকার গঠনের শপথ নিয়ে গণরায় উপেক্ষা করেছে।

বেলা পৌনে ১টায় এনসিপির প্রার্থীরা দুইটি শপথ নিলেও বিকালে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের বর্জনের ঘোষণা দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তিনি লেখেন, জুলাইয়ের আকাঙ্খা ও জনরায়ের প্রতি সম্মান জানাতে সংবিধান সংস্কার পরিষদসহ সংসদ সদস্য হিসেবে পর পর দুইটি শপথ নিচ্ছেন এনসিপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। সেইসাথে গণভোটের রায় না মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় বিকেলে অনুষ্ঠিতব্য মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকার সিদ্ধান্ত।

সংসদের শপথ কক্ষে তৃতীয় পর্বে দুপুর ১টা ২২ মিনিটে প্রথমে ত্রয়োদশ সংসদের সদস্য হিসেব শপথ নেন এনসিপির নির্বাচিত ছয়জন। ১টা ২৫ মিনিটে তাদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ান সিইসি।

এদিকে সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যের শপথ নেননি বিএনপির মিত্র গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের দুইজন। দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে চতুর্থ দফায় পটুয়াখালী(গলাচিপাদশমিনা) আসনে নির্বাচিত গণঅধিকারের সভাপতি নুরুল হক নূরসহ মোট ছয়জন নির্বাচিত প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। তবে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এরপর বেলা পৌনে ২টায় পঞ্চম দফায় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া(বাঞ্ছারামপুর) আসন থেকে নির্বাচিত গণসংহতির প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। তিনিও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি।

বিচ্যুতি ঘটল ঐক্যের : গণঅভ্যুত্থানের পর সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ঐক্যমত কমিশন গঠন করে দীর্ঘ আলোচনার আয়োজন করলেও সে উদ্যোগ অনৈক্যে মিলিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় শপথ গ্রহণের জটিলতায় দলগুলোর ঐক্যে বিচ্যুত ঘটল বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী।

তিনি বলেন, বিএনপির যে যুক্তি সেটাও ঠিক আছে, আবার এনসিপিজামায়াত যেটা বলছে, সেটাও ঠিক আছে। দুই পক্ষেরই যুক্তি ঠিক আছে। এই দুই যুক্তির মাঝখানে, আমার কাছে মনে হচ্ছে, একটু জটিলতা কোথায় যেন, একটা। ঐকমত্য কমিশনের সাথে আলোচনায় সরকার গঠনের পর সংস্কার প্রস্তাবের ওপর সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছিল বিএনপি।

একটু অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বলেন, দেখা যাক, বিএনপি তো বলেছে সংসদে আলোচনা করে শপথটা নেবে। ওনারা তো নাও বলেননি। তিনি বলেন, তারা (দলগুলো) এক জায়গাতে আর থাকতে পারলো না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅর্থনীতির অবস্থা খারাপ, চ্যালেঞ্জ নিয়ে দায়িত্ব শুরু করতে যাচ্ছি
পরবর্তী নিবন্ধমন্ত্রিসভায় বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৪ জন