বায়ান্ন বছরে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকের অবস্থান

ড. সোমা ধর | রবিবার , ৩০ এপ্রিল, ২০২৩ at ৭:০৩ পূর্বাহ্ণ

মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো

নিজেরে করো জয়।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উদাত্ত কণ্ঠে ভয়কে জয় করে এগিয়ে যেতে বলেছেন। ১৯৭১ এ বাংলাদেশ পরাধীনতার হাত থেকে মুক্ত হয়ে বায়ান্ন বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলার নারী এখনো অবহেলিত বিশেষ করে নারী শ্রমিক।

আগামীকাল ১লা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। কবে, কখন, কেন এই দিবসের সূচনা হয়েছে, অনেকেই জানেন। ১৮৮৬ সালের ১লা মে দৈনিক ‘৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম আর ৮ ঘণ্টা নিজের জন্য’ এই দাবিতে প্রাণপণ লড়াই করে আমেরিকার শ্রমিকেরা। শিকাগোর ম্যাককরমিক হারভেস্টিং মেশিন কোম্পানির সামনে পুলিশের সাথে শ্রমিকদের সংঘর্ষে শত শত শ্রমিক আহত হয়, নিহত হয় ১০১২ জন। এতে ক্ষুব্দ শ্রমিক আন্দোলনের পূর্ণ প্রস্তুতি সহ শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারেসমাবেত হন। ঘটনাটি পৃথিবীর শ্রমিক সংগ্রামের ইতিহাসে ‘হেমার্কেট ম্যাসাকার’ নামে রক্তাক্ষরে লিখিত। ১৮৯১ সালে প্যারিসে আন্তর্জাতিক দ্বিতীয় কংগ্রেসে মে দিবস স্বীকৃতি পায়। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৬ সালে আমেরিকা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিকে আইনি স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বের ৮০টি দেশে ১লা মে সরকারি ছুটি হিসেবে চিহ্নিত।

২০০২ সালে রচিত লেখক আমজাদ হোসেন এর “ বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস” এর তথ্য অনুসারে ১৯৩৮ সালে নারায়নগঞ্জেই প্রথম মে দিবস পালিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মহান মে দিবসকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। শ্রমিকদের তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করাই এই দিবস পালনের মূল লক্ষ্য। কিন্তু সত্যিই কি শ্রমিকরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার পাচ্ছেন? বিশেষ করে নারী শ্রমিক কি তাঁদের অধিকারের বিষয়ে জ্ঞাত? আর জানলে ও প্রতিবাদ করতে পারছেন?

বাংলাদেশে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সুসম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরির হার নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, কর্মস্থলে দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে দেশে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান আইন অমান্য করে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। আর শিল্প মালিকদের কাছে নারী শ্রমিক সহজলভ্য যাদের ইচ্ছেমত খাটিয়ে, স্বল্প মজুরি দিয়ে বিদায় দেয়া যায়। কাজ হারানোর দুশ্চিন্তায় নারীরা এই স্বল্প মজুরি মেনে নেয়। ১৯৯০ সাল থেকে বাংলাদেশে বিশ্বায়নের যে ঢেউ আসে তার সুফল স্বরূপ শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তবে তার কুফল স্বরূপ নারীদের প্রতি বৈষম্য ও বেড়েছে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৪ শতাংশ(১৯৭৪ সালে), ৮ শতাংশ (১৯৮০ সালে), জা বেড়ে হয় ২৩ শতাংশ(১৯৯০ সালে), ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ(২০১৬ সালে),৩৮ শতাংশ(২০১৯ সালে)। কিন্তু করোনা মহামারীতে কমে দাঁড়ায় ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ(২০২০ সালে), আর ৩৫ শতাংশ (২০২১ সালে)। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে কেন শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ কমছে?

শ্রমশক্তি জরিপ (২০১৪) অনুসারে দেশে মোট পোশাক কারখানা ছিল ৩৪৯৮, যেখানে পুরুষ শ্রমিক (১২,৯৩,০০০) এবং নারী শ্রমিক (১৭,০৪,০০০)। চার বছরের ব্যবধানে ২০১৮ সালে পোশাক কারখানা দাঁড়াল ৪৮০৯, যেখানে পুরুষ শ্রমিক (১৭,৮৪,০০০) এবং নারী শ্রমিক (১৫,৩১,০০০)। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, পোশাকশিল্প খাতে পুরুষ( ৫৩ দশমিক ৮২ শতাংশ) এবং নারী (৪৬ দশমিক ১৮ শতাংশ)। চার বছরের ব্যবধানে পোশাকশিল্প খাতে নারীর অংশগ্রহণ ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমেছে। বর্ধিত বেতনে পুরুষদের আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে পোশাক খাতে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে আর নারী শ্রমিকেরা পিছিয়ে পড়ছেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বি আই ডি এস) সাবেক জ্যেষ্ঠ পরিচালক অর্থনীতিবিদ প্রতিমা পাল মজুমদার নারী শ্রমিক হ্রাস পাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ঘাটতিকে উল্লেখ করেছেন। পত্রিকান্তরে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেনশুধুমাত্র সেলাই জানার অভিজ্ঞতা নিয়ে পোশাক খাতে নারীদের রাজত্ব করার দিন আর নেই। কর্মসংস্থানে টিকে থাকলে হলে দক্ষতা অপরিহার্য।

দেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের পরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন প্রবাসী নারী শ্রমিক। ১ লাখ ৪ হাজার ৭৮৬ জন (২০১৯ সালে), ২১ হাজার ৯৩৪ জন (২০২০সালে) এবং ৮০ হাজার ১৪৩ জন(২০২১ সালে) নারী প্রবাসে কর্মরত আছেন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ১৯৯১ সাল থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী প্রবাসে শ্রমিক রূপে কাজ করতে গেছেন। অভিবাসন খরচ কম হওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারী শ্রমিক যাওয়ার সংখ্যা বাড়ছে, সাথে বেড়েছে নারী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স পাঠানোর হারও। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্যমতে, করোনাকালীন সময়ে মোট বৈদেশিক মুদ্রার ৬৯ শতাংশ (নারী শ্রমিক) আর মাত্র ৩০ শতাংশ(পুরুষ শ্রমিক) হতে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমেদ এর তথ্য অনুসারে বর্তমানে বিশ্বের ৮৪ টি দেশে মোট ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮১৯ জন নারী শ্রমিক কর্মরত আছেন।

বাংলাদেশের চাশিল্পেও কর্মরত ১ লাখ ২২ হাজারের বেশি শ্রমিকের ৭০ ভাগই নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘সার্ভে অব ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ’ (২০১৯) জরিপ অনুযায়ী বড় আকারের শিল্পকারখানায় শ্রমিকদের প্রায় ৫৫ শতাংশ নারী। এছাড়া, শিল্পকারখানার ৫৯ শতাংশ স্থায়ী শ্রমিকদের ৬৩ দশমিক ২৪ শতাংশই নারী। কৃষি খাতেও নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। কৃষি তথ্য সার্ভিসের হিসাব অনুসারে দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত নারীর সংখ্যা ৭১.৫ শতাংশ।

২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বর নারী শ্রমিক সমাবেশের মধ্য দিয়ে ‘নারী শ্রমিক কণ্ঠ’ আত্মপ্রকাশ করে যার মূল লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০৫০ সমতা অর্জন। সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশেনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, অর্থনীতিতে নারী শ্রমিকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে কিন্তু শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেনা। ট্রেড ইউনিয়নে নারীর অংশগ্রহণ কম, কারণ বেশিরভাগ নারীশ্রমিকদের রয়েছে তাঁদের অধিকার সম্পর্কে অসচেতনতা এবং কারখানা মালিকদের নারী শ্রমিকদের নানা ভাবে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নারী মাত্র ৩৪ শতাংশ,তা ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

বিআইডিএস এর গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, নারী শ্রমিক যারা রাস্তায় ইট ভাঙছেন কিংবা রাস্তাঘাট নির্মাণের সাথে আছেন, তারা ৩০৪০% পর্যন্ত মজুরি কম পেয়ে থাকেন। ঢাকা ট্রিবিউনের একটি রিপোর্ট (মার্চ ৮, ২০২৩)থেকে জানা যায় একজন পুরুষ শ্রমিক সারাদিন কাজ করে পান ৫০০৫৫০ টাকা, আর নারী শ্রমিক পান ৪২০৪৫০ টাকা। কাজ সমান কিন্তু মজুরি ভিন্ন। সমান চাইলে কাজ দেয়া হয় না। এই হচ্ছে নারী শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতি।

করোনা পরিস্থিতি নারী শ্রমিকদের জীবনকে আরো দুর্বিষহ করে তুলেছে, বেড়েছে বৈষম্য, অসম মজুরি ও পারিবারিক বিধিনিষেধ। করোনাকালীন ১০৬ কারখানার ৭০ হাজার শ্রমিক ছাঁটায়ের শিকার হয়েছেন। তার মধ্যে বেশির ভাগ নারী শ্রমিক। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বৈষম্য রয়েই যাচ্ছে আর যতদিন এই বৈষম্য থাকবে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হবে ধীর গতিতে। রানা প্লাজা, তাজরীন ফ্যাশন দুর্ঘটনা আমাদের এখনো শিহরিত করে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে গোটা বিশ্ব এখন নিজেদের দক্ষ করতে মরিয়া হয়ে চলেছে। বাংলাদেশ ও পিছিয়ে নেয়। বিপ্লব আসবে, দেশের উন্নয়ন হবে, কিন্তু অর্ধ জনশক্তিকে উপেক্ষা করে নয়, বরং জাপানের মতো নারীদের ও উন্নয়নের বিভিন্ন খাতে সম্পৃক্ত করতে হবে। বায়ান্ন বছর হউক বা বায়ান্ন শতক, দেশের অর্থনৈতিক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে একমাত্র শিক্ষা, দক্ষতা, মূল্যবোধ, এবং সচেতনতা। তাই সমতা আনয়নের পূর্বে আগে নিজেদের তৈরি করা একান্ত আবশ্যক। আসুন সবাই মিলে নিজেদের গড়ি, তবেই জাতি গড়বে, দেশ গড়বে। সমতা আসবেই, আজ নয়তো কাল,হয়তো আমাদের কোন না কোন প্রজন্মের হাত ধরে।

লেখক : অর্থনীতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধগৃহকর বৃদ্ধি : সাধারণ মানুষের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, মানবিক দৃষ্টিতে পুনর্বিবেচনা করুন
পরবর্তী নিবন্ধহাটহাজারীতে অজ্ঞাত মহিলার লাশ উদ্ধার