শীত বাড়ছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগব্যাধি। গত ১০ জানুয়ারি দৈনিক আজাদীতে ‘শীতে হাসপাতালে বাড়ছে নিউমোনিয়ার রোগী, ঝুঁকিতে শিশু ও বয়স্করা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শ্বাসকষ্টের সমস্যার জন্য দশ বছর বয়সী শিশু রুনাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার মা–বাবা। চিকিৎসকরা বুকের এক্সরে করে দেখেন শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে। গত ৮ দিন সে ভর্তি রয়েছে। মেয়ের অসুস্থতায় মায়ের চিন্তার অন্ত নেই। এই শীতে শুধু শিশু রুনা নয়, ঝুঁকিতে রয়েছেন বৃদ্ধরা। তবে বৃদ্ধদের তুলনায় শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের নিয়মিত টিকাদান, স্বাস্থ্যকর জীবন এবং পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, এই তিনটি বিষয় নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করতে পারে। এছাড়া ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পেতে শিশুর মাথায় হালকা টুপি এবং হাতে–পায়ে মোজা পরাতে হবে। ঘরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে হবে। কোনোভাবেই আগুনের ধোঁয়া জাতীয় কিছু দিয়ে শিশুর শরীরে উষ্ণতা বাড়ানোর চেষ্টা করা যাবে না। ঘরের বাইরে গেলে বড়দের যে পরিমাণ শীতের কাপড় প্রয়োজন হয়, শিশুকেও যেন একই ধরনের কাপড় পরানো হয়। খুব বেশি যাতে পরানো না হয়। আর শিশুকে সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগে বর্তমানে ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ রোগী ভর্তি রয়েছে। এর এক তৃতীয়াংশ আবার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগী। একইসাথে নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগী বাড়ছে চট্টগ্রাম মা শিশু ও জেনারেল হাসপাতালেও। অন্যদিকে চমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে বাড়ছে শীতজনিত রোগে আক্রান্তরা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে নিউমোনিয়া। প্রতিবছর নিউমোনিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী সাড়ে তিন লাখ শিশুর মৃত্যু হয়। প্রতিদিন দুই হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে। এর মূল কারণ টিকাসুবিধা না পাওয়া এবং অক্সিজেন ও অ্যান্টিবায়োটিকের মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ সময়মতো না পাওয়া। প্রতিবছর বিশ্বে ৪২ লাখ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশে টিকার তেমন সংকট না থাকলেও আফ্রিকার দেশগুলোতে এ চিত্র ভয়াবহ।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার নবজাতকের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১৩৩টি শিশুর মৃত্যু হতো। এদের মধ্যে নিউমোনিয়ায় মারা যেত ২৫টি শিশু। এখন এ সংখ্যা অনেকটাই কমেছে। ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর সংখ্যা নেমে এসেছে প্রতি হাজারে ৪৫–এ। এ সময় নিউমোনিয়ার কারণে মৃত্যু হয় প্রতি হাজারে ৮টি শিশুর। দেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর ১৮ শতাংশই নিউমোনিয়াজনিত। বাংলাদেশে নিউমোনিয়ায় প্রতিবছর ৫ বছর বয়সের কম ২৪ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে অন্তত ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ শিশু হাইপোকশিমিয়ায় মারা যায়। তাদের জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেনের প্রয়োজন হলেও ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। দেশে নিউমোনিয়ায় মৃতদের ৪৫ শতাংশেই ফ্যাসিলিটি পর্যায়ে। এর অন্যতম কারণ হলো দেরি করে হাসপাতালে আসা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশই বাড়িতে চিকিৎসা নেয়। অবস্থা একেবারেই খারাপ হলে তারা হাসপাতাল আসে। হাইপোকশিমিয়া হলো রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকা। হাইপোকশিমিয়া হওয়ার প্রধান তিনটি কারণ হলো নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস, অ্যাজমা। হাইপোকশিমিয়ার ফলে ব্রেন ড্যামেজ হতে পারে ও শ্বসনতন্ত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। পালস অক্সিমিটার ও ব্লাড গ্যাস অ্যানালাইজারের মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা যায়।
আমাদের দুর্বলতা হলো সব জায়গায় অক্সিজেন সহজলভ্য নয়। আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ পদ্ধতি অনেক বেশি জটিল। হাইপোকশিমিয়া শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পালস অক্সিমিটারের স্বল্পতা ও অক্সিজেন থেরাপি সময়মতো ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। তাঁরা বলেন, পৃথিবীতে রোগ থাকবেই। আমাদের রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচতে হয়। অনেক সময় আমরা সে লড়াইয়ে সফল হই। আবার ব্যর্থ হয়ে অনেকে মারাও যান। কিন্তু নিউমোনিয়ার মতো একটি প্রতিকারযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু সত্যিই মেনে নেওয়া কষ্টকর। শিশুরা আমাদের প্রাণের সম্পদ। তাদের কিছু হলে আমাদের খারাপ লাগাই স্বাভাবিক। একটি শিশুর জ্বর, শ্বাসকষ্ট, কাশি হলো। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। কিন্তু তাকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করতে না পারায় তার মৃত্যু হলো। এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। আমাদের দ্রুতই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে অকালে অনেক শিশুকে মৃত্যুবরণ করতে হবে।








