পবিত্র রমজান মাসে সংযম সাধনার পরে আসে ঈদুল ফিতরের দিন। এই দিনটির জন্য সকল মুসলিম ভাই ও বোন অপেক্ষা করতে থাকে। আর এই অপেক্ষার মধ্যে আছে অনেক ত্যাগ ও সংযম।
রমজান মাস হচ্ছে সাধনার মাস। সংযমের মাস। ত্যাগের মাস। কিন্তু এই মাসটিতে দ্রব্যমূল্য অনেক বেশি বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেশের ব্যবসায়ীরা যেন প্রতিযোগিতায় নামে। এমনিতেই প্রতিদিন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলছে। কিন্তু পবিত্র রমজান মাসে সিন্ডিকেটের ফলে প্রত্যেকটি জিনিস কয়েক গুণ বেশি টাকায় ক্রয় বিক্রয় করতে হয়। বছরের অন্যান্য সময় যেই জিনিসগুলো সহনীয় পর্যায়ে থাকে সেই জিনিসগুলোর দাম রমজান মাসে আকাশ ছোঁয়া হয়ে যায়। নিম্নআয়ের মানুষের কথা না হয় বাদ দিলাম। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদেরকেও অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়।
পবিত্র শবে বরাতের পর থেকে পরিবারের সদস্যের জন্য নতুন জামা কাপড় কেনাকাটার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। কিন্তু এক্ষেত্রেও সবাই অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়। বছরের অন্যান্য সময় যে জিনিসটির দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকে রমজান মাসের শুরু হতে হতেই সেই জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া হয়। তবু ক্রেতা ও বিক্রেতার সমঝোতায় ঈদের মৌসুমে ক্রয়বিক্রয় চলে। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারের সদস্যের পাশাপাশি আত্মীয়–স্বজনের জন্য ঈদ উপহার ক্রয় করে।
যখন দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বেড়েই চলছিল ঠিক তখনই আসে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ঘোষণা। ঘোষণার সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। আমাদের দেশের প্রবাসীদের একটা বিশাল অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বসবাস করছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের এই দিনটিকে ঘিরে প্রবাসীরা অপেক্ষায় থাকে। দেশে থাকা আপনজনদের জন্য রেমিটেন্স পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু হঠাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার ফলে সব ধরনের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এখন ভয়াবহ দিনযাপন–যাপন করছে। আর তাদের আপনজনরা দেশে অনিশ্চয়তা দিন কাটছে। এই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত তাদের জন্য অনেক বেশি কষ্টকর। একদিকে আপন জনের জীবনের অনিশ্চয়তা অন্যদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তা।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ক্ষেত্রেও বিশাল সমস্যা শুরু হয়েছে। জ্বালানি ক্ষেত্রের সমস্যার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ধস নামে। দেশের অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে আপামর জনসাধারণের যাতায়াতের বিশাল সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। জ্বালানি তেলের সমস্যার ফলে দূর দূরান্ত থেকে জিনিসপত্র সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বালানি ক্ষেত্রে সমস্যার কারণে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
রমজান মাসে ত্যাগ ও সংযমের মাধ্যমে মুসল্লিরা পবিত্র ঈদুল ফিতরের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। সকল ধরনের অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও নাড়ির টানে ও শিকড়ের কাছে ছুটে চলে। যে যার সাধ্যমত আনন্দ আয়োজন করে। রমজান মাসের সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার সাথে সাথেই শহরের মানুষগুলো গ্রামের দিকে ছুটে চলে। বিভিন্ন জায়গায় জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে অবস্থানরত মানুষগুলো পরিবারের কাছে ছুটে আসে। পরিবারের সদস্যরাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন। এক্ষেত্রেও জ্বালানি সমস্যা একটা বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে দূরপাল্লার যাতায়াতের ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই চাঁদাবাজির ফলে অনেক বেশি দামে টিকেট ক্রয় বিক্রয় হয়।কালোবাজারিরা কয়েক গুণ বেশি দামে টিকেট বিক্রয় করে। তবুও মানুষ এক পর্যায়ে অসহায় হয়ে সেই টিকেট কিনতে বাধ্য হয়। রাস্তাঘাটে মানুষের ভিড় জমে। দূরপাল্লার বাসগুলো প্রতিযোগিতায় নামে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ যাত্রার পথে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক প্রাণহানি ঘটে। এরপরেও যারা শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছতে পারে তারা নিজেদেরকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করে। আপনজনের মাঝে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে মেলবন্ধন নির্মাণ করে। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সকল ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বিশ্বের সকল মুসলমান ভাই ও বোনকে মহান আল্লাহ তায়ালা সুস্থ রাখুন–এই প্রার্থনা আমাদের।
লেখক : প্রাবন্ধিক; অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ,
ডা. ফজলুল হাজেরা ডিগ্রি কলেজ।







