রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার। এরপর রুদ্ধদ্বার কক্ষে সাক্ষ্য দেয় রামিসার বড় বোন। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে তারা জবানবন্দি দিয়েছে। এদিন বাবা–মা–বোনসহ মামলার ১৬ সাক্ষীর সবার জবানবন্দি গ্রহণ করেন বিচারক। মামলায় প্রথম সাক্ষী দেন আব্দুল হান্নান, এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। অসুস্থ বোধ করায় আদালতের অনুমতি নিয়ে চেয়ার বসে সাক্ষ্য দেন হান্নান। খবর বিডিনিউজের।
জবানবন্দিতে আব্দুল হান্নান বলেন, ঘটনার দিন ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হন তিনি। ক্যান্টনমেন্ট হয়ে বনানীর কাকলী অফিসে যাওয়ার পর আমার স্ত্রী পারভীন আক্তার আমাকে ফোন দিয়ে জানান, রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর আমি বাসায় ফিরে আসি। এসে দেখি, আমার বাসার সামনে অনেক লোক জড়ো হয়ে আছে। দৌড় দিয়ে আমার ফ্ল্যাটের সামনে যাই। গিয়ে দেখি, সেখানেও অনেক লোক জড়ো হয়ে আছেন। আমাকে স্ত্রী বলতে থাকেন, পাশের ফ্ল্যাটে (সোহেল রানা ও স্বপ্নার ফ্ল্যাট) রামিসা আটকে আছে। সেখানে রাজু নামে একজনকে দেখি, দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করছে। আমার স্ত্রী অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করলেও দরজা খোলেননি। আমি তখন দৌড়ে নিচে যাই। একটা হাতুড়ি নিয়ে এসে দরজার তালা ভাঙার চেষ্টা করি। পাশাপাশি অন্য লোকজনও ভাঙার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, এক পর্যায়ে দরজার তালা ভেঙে যায়। তালা ভাঙার ছিদ্র দিয়ে একজনকে দেখতে পাই। ভেতরে ঢুকে কমন রুম ও বাথরুমের দরজা বন্ধ দেখতে পাই। টয়লেটের ভেতরে রক্ত দেখতে পাই। তখন স্বপ্নাকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আসামিরা যেই রুমে বসবাস করেন, সেই রুমও বন্ধ ছিল। উপস্থিত একজন স্টিলের খাট উচু করে দেখেন বালতির ভেতর রামিসার মাথা। তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে পুলিশ এসে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে। এরপর থানায় গিয়ে এসব কথা বলে মামলা করেছি।
জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ তাকে জেরা করেন। আইনজীবী জানতে চান, হান্নানকে তার স্ত্রী কখন ফোন করেছিলেন। জবাবে হান্নান বলেন, সকাল ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে ফোন করেছিলেন। তিনি তখন কোথায় ছিলেন? কীভাবে ও কখন বাসায় আসেন? জবাবে হান্নান বলেন, অফিসে ছিলাম। বাসে করে ১৫–২০ মিনিটের মধ্যে বাসায় আসি।
এরপর আইনজীবী জানতে চান হাতুড়ি নিয়ে এসে দরজা ভাঙতে কতক্ষণ সময় লেগেছিল? বাদী বলেন, ২০–২৫ মিনিট সময় লেগেছিল। আপনি তো পুরো বিষয় নিজের চোখে দেখেননি? জবাবে হান্নান বলেন, যতটুকু দেখেছি ততটুকু বলেছি। আসামির সঙ্গে কি কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল? জবাবে রামিসার বাবা বলেন, তাকে কখনো দেখেনি। তখন আইনজীবী বাদীকে বলেন যে তিনি মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন। জবাবে হান্নান বলেন, আইনজীবীর এ কথা সত্য নয়। এরপর সাক্ষ্য দেন রামিসার মা পারভীন আক্তার।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ঘটনার দিন ১৯ মে আমি রান্না করছিলাম। রান্নার শেষ পর্যায়ে বড় মেয়েকে তার চাচা গোলাম মোস্তফার বাসায় যেতে বলি। তখন ছোট মেয়ে রামিসা আক্তার বলে, আম্মু আমিও যাব। রান্না ঘর থেকে বুঝতে পারি, দুজন রেডি হচ্ছে। তবে বড় মেয়ে তাকে রেখে বের হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারিনি, ওকে নিয়ে যায়নি। রান্নাঘর থেকে চিৎকার শুনতে পাই। পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চা চিৎকার দিচ্ছে, এটা ভেবেছি। কিছুক্ষণ পর দেখি দরজা খোলা। ভাবছি তারা (দুই মেয়ে) কি দরজা খোলা রেখে চলে গেল।
পারভীন বলেন, কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে রাইসা একা বাসায় ফিরে আসে। তাকে জিজ্ঞাসা করি, ‘তুমি একা কেন, রামিসা কোথায়?’ নিচে গিয়ে দেখি রামিসা সেখানে নাই। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করছি, রামিসাকে দেখছে কি না। নিচের ছোট রুমে খুঁজে পায়নি। দোতলায় ব্যাচেলারদের রুম চেক করেও পাইনি। তারপর তিন তলায় এসে রুমের দরজার ধাক্কা দিলে খোলে না। তখন দরজার সামনে নিচে দেখি আমার মেয়ের একটা জুতা পড়ে আছে। তখন আমি চিৎকার করি। এসময় বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে লোকজন আসেন। তারা এসেও দরজা ধাক্কা দিলেও খোলেনি। পরে নিচে থেকে ১০/১২ জন লোক আসেন। এসময় আমার স্বামী ফোন পেয়ে অফিস থেকে আসেন। তিনি বলেন, দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে দেখি, বাথরুম রক্তে ভরা। আমার মেয়ের মাথা এক জায়গায়, দেহ আরেক জায়গা দেখতে পাই। ওই ফ্ল্যাটের তখন আসামি স্বপ্নাকে দেখি।
আদালতে কাঠগড়ায় থাকা স্বপ্না খাতুনকে দেখিয়ে তিনি বলেন, ওরে ওই সময় বলছি, বোন দরজা খুলে দে। তোরে কিছু কমু না। তারপরও দরজা খোলেনি। এরপর পুলিশ আসে। এছাড়া আসামি সোহেল রানাকে দেখিয়ে তিনি বলেন, পরে শুনেছি, সোহেল রানা আমার মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করে গ্রিল কেটে পালিয়ে গেছে।
তার জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ তাকে জেরায় একাধিক প্রশ্ন করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে পারভীন বলেন, সোহেল রানা তার মেয়েকে খুন করেছে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন তাকে সহযোগিতা করেছে। এছাড়া সোহেল গ্রিল কেটে পালিয়েছে বলে আশপাশের লোকজনের কাছে শুনেছেন।
এরপর রুদ্ধদ্বার কক্ষে রামিসার বড় বোনের সাক্ষ্য নেওয়ার আবেদন করেন প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু। তিনি বলেন, রামিসার বোন এখনো শিশু, তার বয়স মাত্র ১৬ বছর। বোনের হত্যাকাণ্ডের পর এখনো সে হতবিহ্বল অবস্থায় আছে। এত লোকজনের সামনে সাক্ষ্য দিতে বিব্রতবোধ করতে পারে। তাই তার সাক্ষী ‘ক্যামেরা কোর্টে’ নেওয়া হোক।
ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করলে তার সাক্ষ্য রুদ্ধদ্বার কক্ষে নেওয়া হয়। এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী তাকে জেরা করেন।
দুই সাক্ষীর জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা : স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ চিত্র উঠে এল দুই সাক্ষীর জবানবন্দিতে। গতকাল তাদের জবানবন্দি শুনে আদালতে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে পড়েন। কাউকে কাউকে কাঁদতেও দেখা যায়।
ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এদিন মামলার ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। সাক্ষ্যগ্রহণের পাশাপাশি তাদের জেরাও হয়েছে। আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানির দিন রাখা হয়েছে আজ বুধবার। বেলা ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। দুপুরের বিরতির আগে রামিসার বাবা–মা, বোনসহ ১০ জন সাক্ষী দেন।
সাক্ষ্যগ্রহণের দিন থাকায় দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের দুপুরের বিরতির পর শুরু হয় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ। ১১তম সাক্ষী সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী এসআই মো. ইকবাল হোসেন সে সময় জবানবন্দি দেন। তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি জর্জেটের ওড়না উদ্ধার করা হয়, যা দিয়ে শিশুটির মুখ বেঁধে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। গুমের উদ্দেশ্যে রামিসা দেহ খণ্ডিত করা হয়েছেল তুলে ধরে তিনি বলেন, বাথরুমে একটি বালতির ভেতর পাওয়া যায় শিশুটির মাথা। তার শরীরের অন্য স্থানেও ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল।
সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা এই পুলিশ কর্মকর্তা তার দেখা বিষয়গুলো তুলে ধরতে গিয়ে একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার কান্নায় আদালতের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। উপস্থিত আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্ট অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এরপর ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক নুসরত জাবীন জবানবন্দি দেন।
রামিসার খণ্ডিত দেহের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, শরীরজুড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। দুই ঠোঁট কাটা ছিল এবং বুকের বাম পাশে আঘাতের দাগ পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ হল, শিশুটির জননাঙ্গে গুরুতর ক্ষত ছিল। পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ সাক্ষ্য দেন।
সুরহাতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী এসআই মো. ইকবাল হোসেন আবার জবানবন্দি দিতে ওঠে আদালতে জব্দ তালিকা উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে ছিল সেই বালতি, যেখানে রামিসার কাটা মাথা রাখা হয়েছিল। এছাড়া বাসার মূল ফটকের তালা, আসামিদের বাসার কক্ষের জানালার কাটা গ্রিল, রামিসার জর্জেটের ওড়না, জুতা ও জামাকাপড় জব্দ তালিকায় ছিল। তিনি বলেন, বেলা পৌনে ১২টায় সুরতহাল শুরু করেছিলেন এবং প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তা চলে।
পুলিশের ‘কুইক রেসপন্স টিমের’ সদস্য এসআই রাশেদুল তার জবানবন্দিতে বলেন, পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে তদন্ত কর্মকর্তা অহিদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। তিনি আদালতকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি স্বীকার করে, রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এরপর লাশ গুমের উদ্দেশে দেহ খণ্ডিত করা হয়, তার শরীর ক্ষতবিক্ষত করা হয়।
সবশেষে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে সাক্ষ্য দেন। তিনি বলেন, আসামিদের থানা হাজতে রেখে তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেন। একই দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আশপাশের সিসিটিভি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে এক নম্বর আসামি সোহেল রানা স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে সম্মত হন এবং পরে আদালতে জবানবন্দি দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ডিএনএ রিপোর্টে দেখা গেছে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামতগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আসামিরা একই ফ্লোরে বসবাস করতেন। কমন বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়। উপর্যুপরি আঘাতে রামিসা নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে হত্যা করা হয়। পরে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে দেহ খণ্ড–বিখণ্ড করা হয়। তিনি বলেন, রামিসার মা বারবার ডাকাডাকি করলেও আসামিরা দরজা খোলেনি। বরং তখনও তারা লাশ গুমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
এর আগে একই ভবনের বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে শব্দ শুনে নিচে নেমে দেখেন রামিসার মা সোহেল রানার দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে রক্ত দেখতে পান। স্বপ্নাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। ভেতরের আরেকটি গেট তালাবদ্ধ ছিল। সেটি খোলার রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ দেখতে পান।
প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজনও প্রায় একইরকম বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দি দেন। আরেক প্রতিবেশী আবু সামা বলেন, সকাল প্রায় ১০টার দিকে নাস্তা করছিলেন, তখন দেখেন পাশের বাসার জানালা বেয়ে এক ব্যক্তি খালি গায়ে নিচে নামছে। আমি তাকে চোর মনে করে ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করি। পরে পাশের বাসা থেকে চিৎকার শুনে গিয়ে রামিসার মরদেহ দেখি। আরেক সাক্ষী মনিরুজ্জামান শাহীন আদালতে বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি পাতলা ছুরি এবং বালতির মধ্যে রামিসার মাথা দেখতে পাই।










