বাঙালি সংস্কৃতির আরেক অনুষঙ্গ পহেলা বৈশাখ

গৌতম কানুনগো | শনিবার , ১১ এপ্রিল, ২০২৬ at ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তনের দিন নয়; বরং এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যের এক মহাসংগ্রাম। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় – “মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা” এই আহ্বানের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি নতুনের আবাহন করে এবং পুরাতনকে বিদায় জানায়। বাংলা নববর্ষের প্রচলন নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতটি হলো মোঘল সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকে। কৃষি নির্ভর এই জনপদে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সম্রাট প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনেন এবং “ফসলি সন” হিসেবে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন যা পরবর্তীতে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। মোঘল আমল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব আজ আধুনিক বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

পহেলা বৈশাখের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো ‘হালখাতা’। ব্যবসায়ীরা তাদের পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা খোলেন। দোকানে দোকানে লাল রঙের নতুন খাতা আর মিষ্টিমুখের আয়োজন এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ তৈরী করে। গ্রামীণ মেলা, নাগরদোলা, পুতুলনাচ আর মাটির তৈজসপত্রের পসরা সাজিয়ে ছোট ছোট দোকানগুলো যেন গ্রাম বাংলার আসল প্রতিচ্ছবি। দেশের অনেক জায়গায় ‘বৈশাখী মেলার’ আয়োজন করা হয়। পহেলা বৈশাখ আজ কেবল আনন্দউৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে; তৎকালীন পাকিস্তানি শাসন আমলে ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। ইউনেস্কো কর্তৃক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই শোভাযাত্রা আজ বিশ্বদরবারে বাঙালির মাথা উচুঁ করেছে। উল্লেখ্য এই বৎসর থেকে বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রাকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ এসেছে স্বৈত রূপে, একদিকে সে রুদ্র, প্রলয়ংকরী কালবৈশাখী, অন্যদিকে সে নূতনের বার্তাবাহক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বৈশাখ মানেই হলো জীর্ণতা মুছে ফেলার এক রুদ্র আহবান: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো/ তাপস নিঃশ্বাসে বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক’। অন্যদিকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বৈশাখকে দেখেছেন ধ্বংসাত্মক কিন্তু কল্যাণকামী শক্তিরূপে। তিনি লিখেছেন:‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে/ কালবৈশাখীর ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর’। আধুনিক যুগে নগরায়ণের প্রভাবে উৎসবের ধরনে পরিবর্তন এলেও বৈশাখের আবেদন কমেনি। শহরের মানুষেরা এখনো ভোরের গান শুনতে যায়, পান্তা ইলিশের স্বাদ নেয় এবং লাল সাদা পোশাক পরিধান করে রাজপথ রঙিন করে তোলে। এই মিলনমেলায় ধনীদরিদ্র, ধর্মবর্ণের কোন ভেদাভেদ থাকে না। পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। এটি কোন নির্দিষ্ট ধর্মের উৎসব নয় এটি প্রতিটি বাঙালির। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মিলে যখন বৈশাখী মেলায় মিলিত হয় তখন সেখানে এক অভিন্ন বাঙালির পরিচয় ফুটে ওঠে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, হাজার বছরের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে বাঙালি জাতি প্রতি বছর নূতনের আহ্বানে জেগে ওঠে। পহেলা বৈশাখ কেবল একটি দিন নয় এটি বাঙালির চিরকালীন বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅনলাইন জুয়া থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করুন
পরবর্তী নিবন্ধমন হাসে মন কাঁদে