বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা- চেতনার ক্রমবিবর্তনের ধারায় একুশের অবদান

ড. মোঃ আবুল কাসেম | সোমবার , ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ at ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ

বখতিয়ার খিলজি ত্রয়োদশ শতকের সূচনালগ্নে তাঁর সেনাবাহিনীর সদস্য কয়েকহাজার বহিরাগত মুসলিম দিয়ে এদেশে মুসলিম সমাজের গোড়াপত্তন করেছিলেন। তারও আগে থেকেই শুরু হয়েছিল পীর অলি দরবেশদের ধর্মান্তরকরণ তৎপরতা। কিন্তু মসজিদ মক্তব খানকা ইত্যাদির মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ তিনি গড়ে তুললেন, যার প্রভাবে বিভিন্ন উপায়ে এদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী দ্রুতবর্ধিষ্ণু হয়ে উঠেছিল। শ’দেড়েক বছরের মধ্যে সুলতানী আমলের প্রাথমিক পর্যায় নাগাদ বাংলাদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী একটা দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যায়। পণ্ডিতদের অভিমত এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ গড়ে উঠেছে এদেশীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী থেকে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশধারায় সুলতানী আমলের একটি গৌরবজনক ভূমিকা স্বীকার করা হয়। এআমলের স্বাধীনতাকামী মুসলিম সুলতানরা দিল্লীর সুলতানদের পরাক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার অন্যতম ব্যবস্থা হিসেবে এদেশের আপামর জনসাধারণকে নিজদের পাশে রাখতে চেয়েছিলেন। একারণে মুসলিম সুলতানরা এদেশীয় হিন্দু অমাত্যদের উচ্চ রাজকার্যে নিয়োগ করতেন। সম্ভবত একই কারণে এঁরা এদেশীয় আপামর জনসাধারণের ভাষা ও সংস্কৃতির উদার পৃষ্ঠপোষকতার নীতিও অবলম্বন করেছিলেন। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে মুসলিম সুলতানদের সবচাইতে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে এঁরা এদেশীয় হিন্দু কবিদেরকে সংস্কৃতের পরিবর্তে বাংলায় ধর্মসাহিত্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁদের প্রভাবে হিন্দু কবিদের রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবতের অনুবাদ এবং মঙ্গলকাব্য রচনায় জোয়ার এসেছিল।
বাংলা সাহিত্য চর্চার এ নতুন প্রাণোন্মাদনায় বাংলাভাষাভাষী মুসলিম কবিরাও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিলেন। এঁদের হাতেও সৃষ্টি হয়েছে ইসলামী শাস্ত্রকথা, সৃষ্টিতত্ত্ব, মুসলিম কাহিনী, প্রেমোপাখ্যান, পদাবলী সাহিত্য ইত্যাদি বহু প্রকারের সাহিত্যকর্ম। মুসলিম কবিসাহিত্যিকদের রচনার প্রথম ধারাবাহিক আলোচনা ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মুসলিম বাংলা সাহিত্য (প্রথম প্রকাশ ১৯৫৭) গ্রন্থে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেকার প্রায় পঞ্চাশজন মুসলিম কবির ১২৫টি কাব্যের সন্ধান পাওয়া যায়। সকল বিষয় পর্যালোচনা করে বিবেচনা করলে এসংখ্যাকে খুব কম বলা চলে না। সুতরাং বোঝা যায়, বাংলা ভাষা সম্পর্কে সে সময়কার বাঙালি মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না।
এছাড়া মুসলিম কবিদের রচিত বিপুল রচনা সম্ভারে বাংলা ভাষা সম্পর্কে কিছু বিক্ষিপ্ত উক্তির সন্ধান মেলে। এসমস্ত উক্তি পর্যালোচনা করে আমরা দেখতে পাই, কেউ কেউ বাংলাকে আরবি ফারসি ভাষার বিপরীতে হিন্দুয়ানী ভাষা বলে অভিহিত করেছেন। ইসলামী শাস্ত্রকথা এই ভাষায় অনুবাদ করা কিংবা প্রচার করাও কারুর কারুর কাছে পাপকার্য বলে মনে হয়েছে, কিন্তু জনসাধারণের সাথে সহজ যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার অপরিহার্যতার কথা ভেবে বাংলাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে তাঁরা ভুল করেন নি। মাতৃভাষা বাংলার প্রতি তাঁদের অকৃত্রিম ভালবাসার অনুভূতি ফুটে উঠেছে নিম্নোক্ত কয়েকটি চিরায়ত চরণে-
ক) যারে যেই ভাষে প্রভু করিল সৃজন
সেই ভাষা হয় তার অমূল্য রতন।
(সৈয়দ সুলতান, ১৫৮৬)
খ) যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়,
নিজ দেশ ত্যাগি কেন বিদেশ ন যায়।
(আবদুল হাকিম, সপ্তদশ শতক)
মোগল আমলে (১৫৭৬-১৭৫৭) বাংলা ভাষা সম্পর্কে শাসকশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গী সুলতানী আমলের মত ছিল না। এ সময় রাজকার্যে ফারসি ভাষার প্রভাব অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। দিল্লী মোগল সরকারের যে সমস্ত রাজপ্রতিনিধি সাময়িক প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে আসতেন, এদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি কোন দায়িত্ব কিংবা অনুরাগ তাঁরা অনুভব করতেন না। এই পরিবেশে এদেশীয় অভিজাত মুসলিম উচ্চাভিলাষীদের কাছে ফারসি ভাষাজ্ঞান ছিল সকল পুঁজির সেরা পুঁজি। তাছাড়া দীর্ঘকালের মুসলিম পৃষ্ঠপোষকতায় রাজকার্য এবং আইন আদালতের ভাষা হিসেবে ফারসি ভাষার বিকল্প তখন পর্যন্ত ছিল না। তাই ব্রিটিশ আমলেও ১৮৩৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত অফিস আদালতের ভাষা ছিল ফারসি ভাষাই। ফারসি ভাষাজ্ঞানের মাধ্যমে ব্রিটিশ আমলের সরকারি চাকুরিতে নিজদের টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন মুসলিম অভিজাতরা।
অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম আধিপত্য খর্ব হবার পর এদেশের অভিজাত শ্রেণির মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থায় বিরাট রকমের বিপর্যয় ঘটে। মুসলিম শাসনের অবসানে মুসলিম অভিজাতরা তাদের রাজনৈতিক সুবিধা তো হারালই, উপরন্তু কোম্পানি সরকারের কতিপয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও তাদের ওপর কার্যকর হল বিরূপভাবে। এই অর্থনৈতিক দারিদ্র্য তাদের সর্বাঙ্গীণ সামাজিক অধঃপতনের কারণ হল। তাদের সকল উত্থানপ্রচেষ্টা ব্রিটিশ শাসক এবং প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংঘাতের জন্ম দিয়ে জাতীয় জীবনে তাদের একেবারে বিচ্ছিন্ন করে দিল। অপর পক্ষে হিন্দু সম্প্রদায় প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে নিজদের নূতন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হল। মুসলিম আমলের শেষ দিকে রাজস্ব বিভাগের চাকুরিসমূহে একচ্ছত্র আধিপত্য অর্জন করে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের মালিক হয়েছিল তারা। ব্রিটিশ আমলে তাদের সে আর্থিক সচ্ছলতা শুধু বজায়ই রইল না, তা চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে উঠল। ইংরেজি রাজভাষা ঘোষিত হবার আগে আগে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করে নিল। ইংরেজি ভাষাজ্ঞানের মাধ্যমে পাশ্চাত্য মানবতা ও যুক্তিবাদী দর্শনের সঙ্গে তাদের একটা সহজ যোগাযোগ স্থাপিত হল। তার ফলশ্রুতিতে তাদের চিন্তাচেতনা ও সামাজিক মূল্যবোধে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হল। ব্রিটিশ আমলে উদ্ভূত হিন্দু মুসলমান এই দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক বৈষম্য মুসলিম সম্প্রদায়ের মাতৃভাষাচেতনাকেও বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে।
উনিশ শতক আধুনিক হিন্দু সভ্যতার চরমোৎকর্ষের যুগ। এই সময় নবজাগ্রত দেশপ্রেম এবং জাতীয় আত্মমর্যাদোবোধের তাড়নায় দেশীয় সংস্কৃতি ও মাতৃভাষা বাংলার প্রতি এদের বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। বিশেষ করে বাংলা ভাষা এই সময়ে অসংখ্য প্রতিভাবান মনীষীর বহুমুখী উন্নত ও আধুনিক চিন্তাধারার বাহন হয়ে ওঠে। কী সাহিত্যসম্ভারে, কী আঙ্গিকে তাঁদের হাতে বাংলা ভাষা অভিনব সমৃদ্ধি অর্জন করে। পশ্চাৎপদ মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুপস্থিতিতে এই সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের একক আধিপত্য কায়েম হয়। এই সময়কার সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যের চেহারায় সমসাময়িক হিন্দুমানসের ব্যাপক প্রতিফলন ঘটে। শব্দবন্ধ, বাগধারা, উপমারূপক ইত্যাদিতে হিন্দু পুরাণ থেকে আহৃত ভাব ব্যাপকভাবে স্থান করে নেয়। এক কথায় আধুনিক বাংলা সাহিত্য হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে অভিন্নার্থক হয়ে ওঠে।
এই শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্থবিরতা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করে। এই সময় বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটতে থাকে। তাদের মধ্যেও বিকাশ লাভ করতে থাকে নব্য ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যশ্রেণি। মধ্যশ্রেণির স্বাভাবিক ধর্ম অনুযায়ী তাদের মধ্যে সমাজ, ইতিহাস ও রাজনীতিচেতনা জাগ্রত হলেও দুর্ভাগ্যবশত মাতৃভাষার প্রতি তাদের তেমন শ্রদ্ধাবোধ দেখা গেল না। তৎকালীন মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (কোলকাতা মাদ্রাসা ও হুগলি মাদ্রাসা) সমূহের পাঠক্রমে বাংলা ভাষার গুরুত্বহীনতাই সম্ভবত এর জন্য সবচাইতে বেশি দায়ী। ইংরেজি ভাষাজ্ঞানের সুবাদে এঁরা ইংরেজ সরকারের অধীনে উচ্চপদে চাকুরি লাভ করতেন। এঁরা বাংলা ভাষাকে হিন্দুর ভাষা মনে করতেন। এঁদের মননশীলতার বাহন হয়েছিল ইংরেজি ও ফারসি ভাষা। আবদুল লতিফ (১৮২২-১৮৯৬), দেলওয়ার হোসাইন আহমদ মীর্জা (১৮৪০-১৯১২), আবদুল ওয়ালি (১৮৫৫-১৯২৬), সিরাজুল ইসলাম (১৮৪৮-১৯২৩), আবদুল জব্বার (১৮৩৭-১৯১৮), সৈয়দ শামসুল হোদা (১৮৬২-১৯২২), আবদুর রসুল (১৮৭০-১৯১৭) প্রমুখ এই শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন। আর এক শ্রেণির বাঙালি মুসলমান বাংলা পত্রপত্রিকা সম্পাদনায় ও সাহিত্য রচনায় এগিয়ে এসেছিলেন। এঁরা ছিলেন সাধারণত মক্তব মাদ্রাসা পাশ ও মুন্সি শ্রেণির। লোকধর্ম প্রচারের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের কল্যাণ সাধনই ছিল এঁদের বাংলা ভাষা চর্চার প্রধান উদ্দেশ্য। তাই এঁদের রচনার বিষয়বস্তুর মধ্যে ইসলামী শাস্ত্রকথা, নীতিকথা এবং সমাজচেতনা প্রাধান্য পেয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিনটি দশক বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের মাতৃভাষাচেতনার ধারাবাহিকতায় সবচাইতে আলোড়নমুখর সময়। এই সময় এক শ্রেণির মুসলিম মধ্যবিত্তের চেতনায় বাংলা ভাষার সাথে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবোধের অবসান ঘটে, আবার অন্য একটি শ্রেণির মধ্যে জাগ্রত হয় উর্দু ভাষাপ্রীতি। প্রথমোক্ত শ্রেণির চিন্তাধারা পরিবর্তনে দু’জন বাঙালি মনীষীর গবেষণাকর্ম ও চিন্তাধারার বিশেষ অবদান আছে বলে আমরা মনে করি। এঁদের একজন বিশিষ্ট মুসলিম পুঁথিসংগ্রাহক মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, অপর জন বিশিষ্ট সাহিত্যগবেষক ও ইতিহাসকার ড. দীনেশচন্দ্র সেন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ১২৯৭ সাল থেকে ১৩১২ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় তাঁর আবিষ্কৃত হাজার খানেক কলমী পুঁথির বিবরণ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন। এই তালিকায় বহু মুসলিম কবির পুঁথিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সাহিত্যবিশারদের প্রদত্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ড. দীনেশ সেন তাঁর বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (১৮৯৬) গ্রন্থে মত প্রকাশ করেন-বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে সুলতানী আমলের মুসলিম শাসকদের অনন্যসাধারণ অবদান রয়েছে। লোকসাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন-
এখানে মুসলমান দীনবেশে বঙ্গসাহিত্যের ক্ষুদ্রকোণে জায়গা পাইলেই কৃতার্থ হইবেন না। এখানে তাঁহারা সিংহবিক্রমে সিংহাসন দখল করিয়া লইয়াছেন।
এই সময়েই বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত জানতে পারে, বাংলা ভাষার সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের ঘনিষ্ট যোগাযোগের গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। এই সময়েই মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, এস. ওয়াজেদ আলীর মত উচ্চ ইংরেজি শিক্ষিত তরুণরা সক্রিয়ভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় এগিয়ে আসেন। ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির ন্যায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম সাহিত্য সংগঠন।
উনিশ শতকের আশির দশকে উত্তর ভারতে দেবনাগরী অক্ষরে হিন্দী বনাম আরবি অক্ষরে উর্দুর দ্বন্দ্ব এবং প্রথমোক্তটির পক্ষে হিন্দু নেতাদের কঠোর মনোভাব স্যার সৈয়দের রাজনৈতিক দর্শন পাল্টে দিয়েছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার ঢেউ বাংলাদেশে এসে পৌঁছোয়নি। বিগত শতকের প্রথম দশকে ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক চেতনা প্রাধান্য লাভ করে। বঙ্গভঙ্গ নিয়ে হিন্দুমুসলিম উত্তেজনা বাংলাদেশে তাকে আরও জোরদার করে। এই সময় স্বায়ত্তশাসিত ভারতের জাতীয় ভাষা তথা ভারতের লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কা কী হবে, সে বিষয়ে বাঙালি মুসলিম নেতারা সক্রিয়ভাবে ভাবতে শুরু করেন। মুসলিম নেতৃবৃন্দ ধর্মের দাবি জোরদার করার জন্য বাংলাদেশে উর্দুকে জনপ্রিয় করার প্রচারণা শুরু করেন। রাজনীতিসচেতন সাহিত্যিকরাও এই প্রচারণায় শরিক হন। এঁদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন উর্দুভাষী এবং এক শ্রেণির আভিজাত্যপ্রয়াসী উচ্চাভিলাষী বাঙালি। বাংলার মাটিতে উর্দু বাংলা বিতর্কের এইটিই সবচাইতে জোরালো কারণ। উর্দু বাংলা দ্বন্দ্বে বাঙালি মুসলমানদের বক্তব্যে বহুমুখী টানাপোড়েন ও মানসিক জটিলতার পরিচয় ফুটে উঠেছিল।
এই সময়েই মুসলিম ভাবপ্রকাশের উপযোগী আরবি ফারসি শব্দ মিশ্রিত স্বতন্ত্র ধরনের বাংলা ভাষা সৃষ্টির আন্দোলন জোরদার হয়। বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে নজরুল ইসলামের আবির্ভাব এই সময়কার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর যশ ও প্রতিষ্ঠা অর্জন এক দিকে যেমন আধুনিক বাংলা ভাষার সাথে মুসলিম মধ্যবিত্তের একাত্মতাবোধের পূর্ণতা ঘটায়, অন্যদিকে তাঁর কবিতায় আরবিফারসি শব্দের সফল প্রয়োগ উপর্যুক্ত স্বতন্ত্র ভাষা সৃষ্টির ব্যাপারে মুসলিম লেখকদের মনে আত্মবিশ্বাসের ভাব সৃষ্টি করে। ‘শিখা’ গোষ্ঠীর মুষ্টিমেয় কয়েকজন লেখককে বাদ দিলে মুসলিম কবি সাহিত্যিকদের প্রায় সকলেই এই স্বতন্ত্র ভাষারই চর্চা করতে থাকেন। এই ধারার সবচেয়ে সফলকাম কবি ফররুখ আহমদের আবির্ভাব ঘটে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রাক্কালে।
চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলন চলাকালে ভাষার প্রশ্নে মুসলমানদের চিন্তাধারায় নতুন জটিলতার সৃষ্টি হয়। মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাবে এই সময় নতুনভাবে উর্দুপ্রীতি দেখা দেয়। ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত আবুল মনসুর আহমদের প্রবন্ধ ‘পূর্ব পাকিস্তানের জবান’ এ প্রদত্ত তথ্য থেকে আমরা জানতে পারি, পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির (১৯৪২ সালে কোলকাতায় সংগঠিত) একাধিক বৈঠকে ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে নাকি উর্দু হবে?’ এবিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় যদিও অধিকসংখ্যক আলোচক উর্দুর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছিলেন, উর্দুর পক্ষে যাঁরা বলেছেন, তাঁদের সংখ্যাও নিতান্ত উড়িয়ে দেওয়ার মত ছিল না। লক্ষ্য রাখতে হবে, ভারতবর্ষের সকল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার এক রাষ্ট্রভুক্ত হবার কথা তখনো আসে নি। লিপি পরিবর্তনের পক্ষে যারা বাংলা লিপি অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে ছিলেন, তাদের অনেকে আবার বাংলা লিপির সংস্কার চেয়েছিলেন। দেশের তিন শতাধিক প্রতিনিধিত্বশীল আগ্রহী বুদ্ধিজীবীদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে ১৯৪৮ সালে গঠিত ‘পূর্ব বঙ্গ ভাষা কমিটি’ বাংলা ভাষা থেকে সংস্কৃত শব্দের প্রয়োগ কমানো, তদস্থলে আরবি ফারবি লোকজ শব্দের অধিক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে যে তথাকথিত ‘শহজ বাংলা’র উদ্ভট প্রস্তাব করেছিল, তা সত্য সত্যই বাস্তবায়িত হলে আবহমান কালের প্রচলিত বাংলা থেকে এই অঞ্চলের বাঙালিরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
১৯৫২ সালের সফল ভাষা আন্দোলন বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের মনমানসে মাতৃভাষা সম্পর্কিত সকল মতভেদের ও জল্পনাকল্পনার অবসান হয়। বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষাচিন্তার বিবর্তনের ধারায় এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা দিল। বাঙালি মুসলিম মানসে বাংলা ভাষা মাতৃভাষার ঐতিহাসিক স্বীকৃতি নিয়ে নতুন ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষার সাথে রক্তের বিনিময়ে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তা নতুন জাতীয় চেতনার উজ্জীবন ঘটায়। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান প্রভৃতি সকল ধর্মসম্প্রদায়নির্বিশেষে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ একই মাতৃভাষার মহান ঐতিহ্যের প্রেরণায় ঐক্যবদ্ধ হয়। মা, মাটির মতই মাতৃভাষার প্রতি সকল মানুষের ভালবাসা হয় নিঃশর্ত। মাতৃভূমি, মাতৃভাষা, দেশজ সংস্কৃতি বাদ দিয়ে জাতিত্ব হয়না। বাঙালি মুসলমান যেন হঠাৎ তার সঠিক আত্মপরিচয় খুঁজে পেল। মুহাজির মুসাফির বাঙালি মানস যেন তার আপন আলয়ে আশ্রয় পেল। ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’- তাদের মুখে নতুন সঞ্জীবনী শ্লোক জন্ম নিল। একুশে আমাদেরকে আমাদের স্বাধীনতার পথটি চিনিয়ে দিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচক্ষণ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাঙালি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও অসংখ্য মাবোনের ইজ্জতের বিনিময়ে জন্ম নিল সারা দুনিয়ার বুকে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র।
পৃথিবীর আনাচে কানাচে বহু ছোট ছোট জাতিসত্ত্বার মাতৃভাষা উন্নত ভাষার আগ্রাসনে আজ অবলুপ্তির শিকার হচ্ছে। এরকমটি চলতে থাকলে পৃথিবীর বহু মানুষ তার মাতৃভাষা হারিয়ে ফেলবে ; বিশ্বমানবতা তাতে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হবে। পৃথিবীর সকল মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতিকে মানুষের প্রয়োজনে বাঁচিয়ে রাখতে হবে- এই আমাদের একুশের সংগ্রামের উপলব্ধি ও অঙ্গীকার, যা যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী বিশ্বসভার স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এটি আমাদের জন্য গৌরবের।

লেখক : ভাষা বিজ্ঞানী, প্রাবন্ধিক, গবেষক; সাবেক উপাচার্য, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা
পরবর্তী নিবন্ধপটিয়ায় তিন মাসে ১২০ গরু চুরি