বাউল শাহ আব্দুল করিমের তত্ত্ব ও গান

ইকবাল হায়দার | সোমবার , ৫ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ

ভেদবুদ্ধিহীন সমাজ প্রত্যাশী, মানবতাবাদী মহান সাধক বাউল শাহ আব্দুল করিম ছিলেন স্বশিক্ষিত। তিনি আর্থিক তাড়নার কারণে নিজ গ্রামের নৈশ স্কুলে মাত্র আট রাত্রি লেখাপড়া করেছেন । জন্ম ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯১৬ (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার) বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার,উজান ধল গ্রামে। পিতা ইব্রাহীম আলী ও মাতা নাইওরজান বিবির ছয় সন্তানের একমাত্র ছেলে। ধর্মীয় বেড়াজালের বিরুদ্ধে সংশপ্তকের মতো সংগীতের মাধ্যমে সারা জীবন লড়াই করেছেন অসামপ্রদায়িক সংস্কৃতির জন্য। বাংলাসংগীত ও সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপাদান তাঁর গান।সামপ্রতিক সময়ে জনপ্রিয়তায়,ভাবে,তত্ত্ব ও শব্দের প্রয়োগে দেখা যায় তিনি বাউল সংগীতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সংসার জীবনের ঝামেলার ফাঁকে ফাঁকে তিনি যাত্রা, পালাগান,কীর্তন,বিভিন্ন উঠোন গানের অনুষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে গান শুনতেন। একবার নসীব উল্লাহর কন্ঠে বাউল গান– ‘ভাবিয়া দেখরে মন/ মাটির সারিন্দারে তোর বাজায় কোন জন‘-শুনে তিনি মোহিত হন। পরবর্তীতে করমউদ্দীন ও রশীদ উদ্দিন এর কাছে সংগীতের দীক্ষা নেন।

অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ বাউল গানের মহান স্রষ্টা শাহ আব্দুল করিমের। দরিদ্রতা পরিবারকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছিল যে প্রতিবেলা খাবার জোগাড় করতে তাঁর বাবার কষ্ট হত। তাই সুযোগ হয়নি লেখাপড়া করার।পরিবারের একমাত্র ছেলে বলে তার উপর সংসারের চাপ ছিল বেশী।তাই দুই টাকার চাকুরি নেন মাঠে গো চরানোর কাজে।দারিদ্রতায় পূর্ণ ও জীবন সংগ্রামে রত করিমের সংগীত সাধনা এর মধ্য থেকেই শুরু হয় । গান ছিল তার জীবনের সব কিছু তাই গানের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা থেকেই রচনা করেন অনেক গান।

সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চল, চারধার ডুবে থাকে জলের মধ্যে যা মনে প্রাণে একটা শান্তির আবহ এনে দেয়। আর আবহমান কাল থেকেই এ অঞ্চলের মানুষগুলোর রক্তে মিশে আছে মাটি থেকে নিঙড়ানো অনুভূতির সেসব গান যেখানে আছে আধ্যাত্মিকতা, সহজিয়া সুরে মানুষকে মুগ্ধ করার দারুণ শক্তি। শাহ আব্দুল করিম তাই মনে ধারণ করে সংগীত সাধনায় রত হন।

তিনি লেখেন অসংখ্য বাউল গান সহ বিভিন্ন গান।যেমন তিনি ভাবপ্রবণ হয়ে লেখেন, ‘গান গাই আমার মনরে বোঝাই / মন থাকে পাগল পারা / আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া।

তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বাউল একটি জীবন দর্শন। যেখানে সাধনা ও চর্চা হয় মানবতার, অসামপ্রদায়িক চেতনার। তাই এ গান মানবতা ও অসামপ্রদায়িক চেতনার গান।

অপরূপ হাওড়ের থৈ থৈ জলরাশি ও বিস্তৃত ফসলের মাঠ তার মনের জগতকে দারুণভাবে ও বহুলরূপে সম্বৃদ্ধ করেছে।

ইহকাল ও পরকালের মর্ম সহ সার্বজনীন ধর্মচেতনা, মানবতা ও আধ্যাত্মিকতা সহ সাথে সাথে সকল ধমের্র অভিন্ন দর্শনের প্রতি তিনি মনোনিবেশ করেন।

তাই তিনি রচনা করেন– ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান / মিলিয়া বাউলা গান মুর্শিদী গাইতাম / আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।অসামপ্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রগতিশীলতার ধারক ছিলেন বাউল শাহ আব্দুল করিম। মানবতত্ত্ব নিয়ে তিনি ভাবতেন। মানবজীবনের গূঢ় রহস্য, মানব জীবনের মাহাত্ম্য নিয়ে লেখেন, ‘মানবতত্বের কি মাহাত্ম্য বোঝে কয়জনে /মানবতত্ত্ব প্রকাশিলাম অতি সন্ধানে।তার গানে তত্ত্ব কথা ও জীবন দর্শন একাকার হয়ে আছে।তিনি বলতেন, ‘জীবনে পীরদের ভজতে হয় আর পীর ভজনে তত্ত্ব পাওয়া যায় ।তাই তিনি মুর্শিদ ধরেন মৌলা বক্স মুন্সীকে যিনি তাঁকে তালবাদ্য সহকারে গান গাইতে অনুমতি দেন। তিনি বলতেন,’দেহকে বেশী ভালবাসবে দেহের মাঝেই আছে সবকিছু ।

তিনি ছিলেন ভক্তি বাদী, যুক্তিবাদী, প্রকৃতি বাদী ও সর্বপ্রাণবাদী। তার গানের প্রধান তাত্ত্বিক বিষয় সমূহ হল, সৃষ্টি তত্ত্ব,নবী তত্ত্ব, আল্লাহ্‌ স্মরণ,ওলি স্মরণ,পীর মুর্শিদ স্মরণ, ভক্তিগীতি, মন:শিক্ষা, দেহ তত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ব, বিচ্ছেদ, প্রণয়গীতি, জীবতত্ব, জীবন তত্ত্ব ও প্রেম । বাউল জগতের প্রতিটি পর্যায়ে তার গানের ছোঁয়া লেগেছে। তাঁর কাছে শরিয়ত, মারফেত, তরিকত, হকিকতের মর্মার্থ পরিষ্কার। তিনি লেখেন, ‘মন মুসল্লী ভাই শরিয়তে আছ তুমি তরিকতে নাই/ তরীকতে নাই তুমি হকিকতে নাই। হকিকতের হক বিচারে মন পবিত্র হলে পরে দেখতে পাবে আপন ঘরে আল্লাহ্‌ আলেক সাঁই। হও যদি খাঁটি মুসলমান বাহির ভিতর কর সমান যে হবে মুনাফিক নাদান নরকে তার হবে ঠাঁই। আসা যাওয়া করে দমে দিনে দিনে আয়ু কমে কয় বাউল আব্দুল করিমে মরণকালে চরণ চাই।তিনি ভাবতেন, ‘এ জীবনে আসা যাওয়া যেহেতু সত্য , তাহলে এত হিংসাবিভেদ হানাহানি কেন? এলম শিখলে আলেম হয়না, আমল না হলে। দেহমন পুত শুদ্ধ ও পবিত্র রাখতে হবে, নিজেকে সংশোধন করে সুচারুরূপে চলতে হবে , কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, হিংসা, অহংকার ছাড়তে হবে, না হয় মনের অন্ধকার যাবে না। লম্বা দাঁড়ি টূপী পিরহানে, আল্লাহ্‌ নবীর গুণগানে, মনে যদি অহংকার আনে,সব যাবে রসাতলে। তিনি জেনেছেন পন্‌েচন্দ্রীয় যুক্ত দেহই সকল শক্তির আধার এবং ইহাই আধ্যাত্মিক সাধনার একমাত্র পথ। নিজের শরীরকে নৌকার সঙ্গে তুলনা করে লেখেন, ‘তুমি সুজন কান্ডারী নৌকা সাবধানে চালাও/ মহাজন বানাইয়াছে ময়ূরপঙ্খী নাও।

তিনি বলতেন ,’আমাদের এ জীবন অতি ক্ষণিকের ।পৃথিবীর রূপ, রস, সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ অতি সীমিত ।

তিনি বলেন, ‘আমি আছি আমার মাঝে আমি করি আমার খবর / আমি থাকলে সোনার সংসার আমি গেলে শূন্য বাসর।

২০০৯ ইংরেজি সনের ১২ সেপ্টেম্বর এ সাধক, তত্ত্ববিদ, বাউল সম্রাট চির নিদ্রায় যান। ভাগ্যের কি ফের, যে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করতে গিয়ে গান করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যৌবনে গ্রাম ছেড়েছিলেন, যাকে সমাজ বহিষ্কার করে তাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই মসজিদেই তাঁর জানাজা হয় এবং জীবন সায়াহ্নে নিয়তি তাকে এনে থামিয়েছে প্রিয়তমা স্ত্রী সরলার পাশে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, লোকসংগীত শিল্পী

পূর্ববর্তী নিবন্ধমারজিয়া খানম সিদ্দিকার ‘স্বপ্নে আঁকা কিশোরবেলার দিন’
পরবর্তী নিবন্ধজন্মশতবর্ষে অধ্যাপক ড. মুনীর চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি