ফেব্রুয়ারি আসলে কেবল এক মাসের নাম নয়; এটি যেন ইতিহাসের বুকে খোদাই করা রক্তাক্ত একটি শপথ। যে শপথে উচ্চারিত হয় মাতৃভাষার মহিমা, যার প্রতিটি অক্ষরে মিশে থাকে শহীদের রক্তের অমলিন আভা। ভাষার মাস মানে কেবল স্মৃতির প্রদীপ জ্বালানো নয় এ মাস আমাদের শেখায় দায়িত্ববোধের পর্দা সরিয়ে ভাষার প্রতি নতুন করে প্রেমে পড়তে। কারণ ভাষা কেবল উচ্চারণ নয়, ভাষা হলো জাতিসত্তার গভীরতর প্রতিচ্ছবি, চেতনাবৃক্ষের মৌলিক মাটি, অনুভূতির নিজস্ব স্বরলিপি।
তাই ভাষার প্রতি শুদ্ধাচার মানে শুধু নিখুঁত বানান শেখা নয়; এর মানে ভাষাকে সম্মান করার নৈতিক দৃঢ়তা, শব্দচয়নকে প্রাসঙ্গিক রাখার দায়, আর ভাষাভঙ্গিকে পরিচ্ছন্ন রাখার অঙ্গিকার।
বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্যতম সুরম্য ভাষা তার গঠন, তার লয়ের নরম ওঠানামা, আর তার শব্দের পরম কোমলতা একে অতুলনীয় করেছে। কিন্তু এই সুরের মাধুর্য ধরে রাখতে চাই শুদ্ধ উচ্চারণ, যথার্থ বানান, অন্বয়সম্মত শব্দ প্রয়োগ এবং মননশীল প্রকাশভঙ্গি।
ভাষার ভুল ব্যবহার শুধু বাক্যের সৌন্দর্যই নষ্ট করে না, ধুলো লাগায় ভাবের স্বচ্ছতাকেও। এ কারণেই শুদ্ধাচার কোনো নিয়মকানুনের বেড়া নয় এটি ভাষার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধায় নম্র মাথা ঝোঁকানোর এক নৈতিক প্রয়াস, এক ধরনের অন্তর্দীপ্ত শুদ্ধতা।
ফেব্রুয়ারির প্রতিটি প্রভাত মনে করিয়ে দেয় একটাই সত্য মাতৃভাষা কোনো সাধারণ সম্পদ নয়; এটি রক্তে লেখা অর্জন। ১৯৫২ সালের উত্তাল রাজপথে যারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তারা উচ্চারণ করেছিল আত্মমর্যাদার সবচেয়ে নির্মল দাবি ‘আমাদের ভাষার অধিকার চাই।’
তাদের আত্মত্যাগে যে অধিকার আমরা পেয়েছি, সেটি কেবল ব্যবহার করার জন্য নয় রক্ষা করারও। তাই ভাষার মাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া হয়েছে, সে ভাষাকে শুদ্ধভাবে ব্যবহার করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য, সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও প্রজন্মগত অঙ্গিকার।
বাংলা ভাষার বড় অংশই মুখে–মুখে বিস্তার লাভ করে। তাই শুদ্ধতার অনুশীলন সবচেয়ে প্রয়োজন; শিশুদের হাতেখড়িতে, গণমাধ্যমের শব্দচয়নে, নাটক, সংবাদ ও উপস্থাপনায়, লেখালেখি ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মে।
যদি আমরা নিজেরাই ভাষাকে আহত করি, নতুন প্রজন্ম শুদ্ধ বাংলার আলো কোথায় খুঁজে পাবে? তাই ফেব্রুয়ারি শুধু স্মৃতিমাস নয় এ মাস ভাষাচর্চার অন্তর্লোক উন্মোচন করে, যেন ভাষা আয়নার মতো আমাদের মননকে প্রতিফলিত করে।
আঞ্চলিক ভাষা বাংলার ভুবনে বৈচিত্র্যের উজ্জ্বল রং বাংলা ভাষার বিস্তৃত ভূগোল যতটা বড়, ততটাই বড় তার আঞ্চলিক স্বরভঙ্গির ভাণ্ডার চট্টগ্রামের ঘন টান, সিলেটের সুরেলা স্রোত, বরিশালের মাধুর্য, রংপুরের ধীর ছন্দ, খুলনার মাটির গন্ধে ভরা অভিব্যক্তি। শুদ্ধাচার মানে কোনোভাবেই এই বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা নয়। বরং শুদ্ধাচার মানে প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ভাষার শোভন, সঠিক ও যথাযথ ব্যবহার।









