বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা বাড়াতে হবে

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ

| শনিবার , ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:২১ পূর্বাহ্ণ

আজ অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। বাঙালির মননে অনন্য মহিমায় ভাস্বর চিরস্মরণীয় একটি দিন। ইতিহাসের পাতায় রক্ত পলাশ হয়ে ফোটা সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউরের রক্তে রাঙানো অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ।

একুশ মানে মাথা নত না করা। আজ বিশ্বের কোটি কণ্ঠে ধ্বনিত হবে একুশের অমর শোকসংগীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি / আমি কি ভুলিতে পারি।’ ভাষা শহীদদের রক্তে শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছিল দুঃখিনী বর্ণমালা, মায়ের ভাষা। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের যে সংগ্রামের সূচনা সেদিন ঘটেছিল, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই বাঙালির কাছে চির প্রেরণার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আসে। আমরা পালন করি। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা ভাষার কি প্রচলন হয়েছে আজো? আমরা জানি, আমাদের দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশ পাওয়া গিয়েছিল ২০১৪ সালে। সেই আদেশে বলা হয়েছিল: ইংরেজিতে থাকা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিজ্ঞাপন, গাড়ির নামফলক, সব ধরনের সাইনবোর্ড ও নামফলক বাংলায় লিখতে হবে। একই সঙ্গে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনানুসারে সব ক্ষেত্রে অবিলম্বে বাংলা ভাষা ব্যবহারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও দিয়েছিল আদালত। আগেও আমরা এমন নির্দেশনা দেখেছিলাম। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হলো না। তা ভাবনার বিষয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একমাত্র ভাষা নির্ভর নির্ভেজাল এবং যথার্থ জাতীয়তাবাদী চেতনাই পারে গণতন্ত্রকে বিকশিত করে সকল মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে। তেমন প্রত্যাশা পূরণ আমাদের ক্ষেত্রে হয় নি। বারবার তা ব্যাহত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের যে সাংস্কৃতিক উন্মেষ ঘটেছিল তাও বারবার পথ হারিয়েছে। ভাষা আন্দোলনের চেতনার ধারাবাহিকতায় স্বাধিকার আন্দোলন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। ভাষার দাবিটিই মুক্তিযুদ্ধকে চূড়ান্ত করেছিল। স্বাধীনতার পর সেই বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হলেও রাষ্ট্রভাষার সর্বজনীন প্রচলন ঘটে নি। বরং বৈষম্যের শিকার বাংলা ভাষা সাধারণের ভাষায় পরিণত হয়েছে। অপরদিকে বিত্তবান ও মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে শিক্ষাদীক্ষা এবং ভাষাসংস্কৃতিতে বাংলার পরিবর্তে স্থান পেয়েছে হাওলাতি বিদেশি ভাষা। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা চরম আকার ধারণ করেছে। সমষ্টিগত উন্নতির বিষয়টিকে কেউ বিবেচনায় আনছে না। এই আত্মকেন্দ্রিকতার অবসান এবং সমষ্টিগত মানুষের মুক্তির মধ্য দিয়েই সমষ্টিগত মানুষের ভাষাসংস্কৃতি সর্বজনীন হতে পারবে। অন্য কোন বিকল্প পথে সম্ভব হবে না। মূল ব্যাধিটি বিদ্যমান ব্যবস্থা; সেটির আমূল পরিবর্তন কেবল জরুরি নয়অপরিহার্যও বটে।

আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, একুশের চেতনার একটি বিশেষ দিক ছিল জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার বিস্তার। এর অর্থ শিশুকিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী নারীপুরুষ বাংলা ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করবে; প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষায় বাংলা ব্যবহৃত হবে। উচ্চ আদালতেও বাংলা ভাষার প্রচলন হবে। বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের এই আকাঙ্ক্ষা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বাঙালির হাতেই বাংলা ভাষা উপেক্ষার শিকার হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ও অফিসআদালতে, ব্যবসাবাণিজ্যে, বিজ্ঞাপনে ইংরেজি ভাষার দখলদারি ক্রমপ্রসারিত হচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্রমবিস্তার, সাধারণ শিক্ষায় ইংরেজি পাঠ চালু করার ফলে বাংলার গুরুত্ব ক্রমেই কমছে।

ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, তরুণদের মধ্যে ভাষা ব্যবহারে অসচেতনতা দেখা যাচ্ছে। তারা যেনতেন ভাবে মনের ভাব প্রকাশ করতে চায়। তাই তারা বাংলা আর ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলে। মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা লেখার সময়ও তারা ইংরেজিটাই বেশি লিখছে। তাঁরা বলেন, আগে একটা সময় ছিল যখন সবকিছুতেই বাংলা ব্যবহারের চল ছিল। যেমন বাড়ি বা দোকানপাটের নাম রাখা, বিয়ের আমন্ত্রণপত্র ছাপানোএগুলোতে বাংলা ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সেই রীতিটা আর নেই। এখন সবাই ইংরেজি নাম রাখার দিকে ঝুঁকছে। এমনকি অল্প শিক্ষিত লোকজনও ভুলভাল ইংরেজিতে লোকজনকে নিমন্ত্রণ জানাচ্ছে, যেটা দুঃখজনক। এর জন্য তাঁরা মানুষের হীনম্মন্যতাকে দায়ী করছেন। তাঁরা বলেন, মানুষ এখন মনে করে ইংরেজিতে লেখাটা গৌরবের বিষয়। তাই তাঁরা সেটাই করছেন। আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা বাড়াতে হবে। শুদ্ধ চর্চা ও সুন্দর প্রয়োগের মাধ্যমে এ ভাষা আরো উজ্জ্বল ও বর্ণিল হয়ে উঠুকসেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে