অর্থনীতি, জনসংখ্যা, প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি ও ভূরাজনৈতিক চাপ সামলিয়ে নিজের অস্তিত্ত্ব জানান দিতে বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। সবার আগে বাংলাদেশ শ্লোগান নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল (বিএনপি) এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। জনগণের সম্মতির মাধ্যমেই রাজনৈতিক ন্যায্য ক্ষমতা অর্জনে বিএনপি ফিরে পেল রাষ্ট্র মেরামতের সুবর্ণ সুযোগ। বহুদলীয় প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রই জনগণের শক্তি। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠার সুযোগ উঁকি দিচ্ছে। এতে করে জনগণের হয়ে কথা বলার সরকার পাওয়ার ব্যর্থতার গ্লানি মুছে গেলো। ফলে এর সাথে যুক্ত হয়ে জনগণের অভাবনীয় সম্মতিতে হ্যাঁ এর বাংলাদেশ হয়ে উঠবে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার ড্রাইভিং ফোর্স।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফুসে ওঠা জুলাই গণ–অভ্যূখানের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বার জন্ম নেয়া ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ আরেকবার ঘুরে দাঁড়াবার সাহস পেয়েছে। এ মুহূর্তে পৃথিবীর একমাত্র (২০২৫–২৬) রাষ্ট্রপ্রধান নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যিনি দীর্ঘ দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় দায়িত্বে ছিলেন। সারা দুনিয়ায় এ পর্যন্ত ২২ জন নোবেল বিজয়ী রাষ্ট্র প্রধান ছিলেন। নেলসন ম্যানডেলা, মিখাইল গর্ভাচেভ, উইনস্টোন চার্চিল–যাঁদের সিদ্ধান্তে বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য, মানবাধিকার আন্দোলন এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছিলেন। আজও বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষ ন্যায়বিচারের আইকন হিসেবে নেলসন ম্যানডেলাকে স্মরণ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও স্নায়ু যুদ্ধের শেষ হওয়ার প্রধান চালিকা শক্তি মিখাইল গর্ভাচেভ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে আধুনিক বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য গঠন করেন উইনস্টোন চার্চিল। তাঁকে যুদ্ধোত্তর বিশ্ব ব্যবস্থার স্থপতি বলা হয়ে থাকে। কূটনীতি, বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন ধারা সৃষ্টিতে বারাক ওবামা নিজের অবস্থান দৃঢ করে গেছেন। আপরদিকে গণতন্ত্র আন্দোলনের প্রতীক হয়েও অং সান সুকি পরবর্তীতে বিতর্কিত হয়ে রইলেন। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র –ফ্যাসিবাদ সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যালট নিজে গণতন্ত্র নয়–এটি শুধু একটি প্রক্রিয়া। যদি সেই প্রক্রিয়া স্বাধীন, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক না হয়, তাহলে ব্যালট গণতন্ত্রের প্রতীক নয়, বরং কর্তৃত্ববাদের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। ব্যালট –ক্ষমতা সবসময় জনগণের ক্ষমতা নয়; অনেক সময় এটি নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার বৈধতা দেয়ার মাধ্যম পরিণত হয়। প্রাচীনকালের মেলোড্রামার (নাটক বা অভিনয়) মতো, রেললাইনের সাথে খলনায়কদের দ্বারা আবদ্ধ কুমারী গণতন্ত্রকে দ্রুতগামী ট্রেন থেকে উদ্ধার করা হয়। শতাব্দীর শেষের দিকে উভয় প্রধান খলনায়ক– ফ্যাসিবাদ জোরেশোরে, কমিউনিজম তীব্র হুঙ্কারে ধ্বংস হয়ে গেছে। এরপর বিজয়ের এক মৌসুম শুরু হয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক দার্শনিক ইশাইয়া বার্লিন বলেছিলেন– পশ্চিমা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শতাব্দী। যার একটি সুখী সমাপ্তি হয়েছে। দুই শতাব্দী আগে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক ইমানূয়েল কান্ট তার ‘আইডিয়া ফর এ ইউনিভার্সাল হিস্ট্রি’ বইতে যুক্তি দিয়েছেন– প্রজাতন্ত্রের সরকার ব্যবস্থা অন্য সকলকে ছাড়িয়ে যাবে। অবশেষে ভবিষ্যদ্বাণীটি পূর্ণতা পেল। অন্যদিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন বলেছিলেন –এ গ্রহের মানুষ একনায়কতন্ত্রের চেয়ে গণতন্ত্রের অধীনে বেশি বাস করেন। সাবধানে পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর নিউ ইয়র্ক টাইমস দেখিয়েছেন– ৩.১ বিলিয়ন মানুষ গণতন্ত্রে বাস করে, ২.৬৬ বিলিয়ন মানুষ গণতন্ত্রের বাইরে রয়েছে। যদিও বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে পশ্চিমা উদার গণতন্ত্রের সর্বজনীনীকরণের প্রত্যাশায় উৎসুক মানুষ। যার ঢেউয়ের তোড়ে ভাসছে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া। এশিয়ার একমাত্র পূর্ণ–গণতান্ত্রিক দেশ তাইওয়ান। তাইওয়ান প্রণালী হল প্রশান্ত মহাসাগরের একটি সরু বাহু যা তাইওয়ান দ্বীপকে চীনের মূল ভূখণ্ডের ফুজিয়ান উপকূল থেকে পৃথক করেছে। তাইওয়ান এস্ট্রেট ও আশপাশের সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। তাইওয়ানকে বৈশ্বিক প্রযুক্তির অর্থনৈতিক হাব বলা হয়ে থাকে। তাইওয়ান নিয়ে চীন–যুক্তরাষ্ট্র চরম উত্তেজনা ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চল অশান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে পশ্চিমা নানা সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন– যখন জনগণ নির্বাচনে বৈধতা, ভারসাম্য, স্থিতিশীলতা ও যুক্তিসম্মত–সংস্কারের আকাঙ্ক্ষায় পেীঁছে। তখন রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়ে উঠে। আর শক্তিশালী রাষ্ট্রই ভূরাজনীতিতে ড্রাইভিং ফোর্স হিসেবে আভিভূত হয়। পরিষ্কার জনম্যান্ডেট নিয়ে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে নরওয়ে, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মত সমমর্যদার দেশ। তখন বাংলার জনগণ বুক চেতিয়ে বলতে পারবে–আমরাই বাংলাদেশ।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক।












