বাংলাদেশের জন্য অভ্যন্তরীণ নদীপথে কন্টেনার পরিবহনের অপরিমেয় কৌশলগত গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো: আমরা এটিকে কীভাবে কার্যকর করব? একটি প্রাণবন্ত জলপথভিত্তিক লজিস্টিক করিডোরের স্বপ্ন নির্ভর করে কিছু বাস্তব বিবরণের উপর: যে জাহাজগুলো নদীতে চলাচল করবে, কন্টেনার স্থানান্তরের পদ্ধতি এবং এটিকে লাভজনক করার জন্য আর্থিক মডেল। সরকার যখন এই খাতটিকে উন্মুক্ত করতে চাইছে, তখন বিনিয়োগকারী, লজিস্টিক অপারেটর এবং পরিকল্পনাকারী সকলের জন্যই এর কার্যপ্রণালীর নীলনকশা এবং সহায়ক নীতি কাঠামো বোঝা অপরিহার্য। এই নিবন্ধটি পরিবহন কার্যক্রমের নির্দিষ্ট দিক, কার্যকর বার্জ প্রযুক্তি এবং সহজ অর্থায়নের সুবিধার্থে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করে।
নদীপথে কন্টেনার পরিবহন একটি বহু–ধাপের প্রক্রিয়া, যা সড়ক পরিবহন থেকে আলাদা এবং এর জন্য বিশেষ সমন্বয় প্রয়োজন।
মূল পরিবহন প্রক্রিয়া ও মডেল
সবচেয়ে কার্যকর মডেলটি হলো সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি হাব–অ্যান্ড–স্পোক সিস্টেম।
সমুদ্রবন্দর হাব:
চট্টগ্রাম (এবং পরবর্তীতে মাতারবাড়ি) বন্দরে, অভ্যন্তরীণ গন্তব্যের জন্য নির্ধারিত কন্টেনারগুলো মাদার ভেসেল থেকে নামানো হয় এবং বন্দরের নদীমুখী টার্মিনাল বা কাছাকাছি একটি ডেডিকেটেড অভ্যন্তরীণ নৌপথ টার্মিনালে অপেক্ষারত কন্টেনার বার্জে সরাসরি স্থানান্তর করা হয়।
নদীপথে পরিবহন:
এরপর বোঝাই করা বার্জটি নির্ধারিত অভ্যন্তরীণ নৌপথ (যেমন, মেঘনা নদী হয়ে চট্টগ্রাম–ঢাকা) দিয়ে ঢাকার পাঙ্গাওনের মতো একটি অভ্যন্তরীণ কন্টেনার টার্মিনালে (আইসিটি) বা নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ বা বরিশালের মতো আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর অন্যান্য নদী বন্দরে যাত্রা করে।
শেষ ধাপের সরবরাহ:
আইসিটিতে, কন্টেনারগুলো বার্জ থেকে নামানো হয়। এরপর সেগুলো ট্রাক দ্বারা তুলে নেওয়া হয় বা কারখানা, গুদাম বা বিতরণ কেন্দ্রে চূড়ান্ত সরবরাহের জন্য ছোট ফিডার জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। এই মডেলটি নদীকে একটি উচ্চ–ক্ষমতাসম্পন্ন চলমান কনভেয়র বেল্টে পরিণত করে, যেখানে সড়ক পরিবহন শুধুমাত্র অনেক ছোট প্রাথমিক এবং চূড়ান্ত অংশের জন্য ব্যবহৃত হয়।
টার্মিনাল এবং সংযোগ ব্যবস্থা
সাফল্য সম্পূর্ণরূপে সমন্বিত কেন্দ্রগুলোর উপর নির্ভর করে:
আধুনিক নদী টার্মিনাল: এগুলো সাধারণ জেটি নয়। এগুলোর জন্য প্রয়োজন:
কন্টেনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম: বার্জ থেকে ইয়ার্ডে দক্ষতার সাথে স্থানান্তরের জন্য মোবাইল হারবার ক্রেন বা ডেডিকেটেড পোর্টেবল ক্রেন।
স্টোরেজ ও স্ট্যাকিং ইয়ার্ড: কন্টেনার সংরক্ষণের জন্য পদ্ধতিগত বিন্যাসসহ পাকা, সুরক্ষিত এলাকা।
কাস্টমস সুবিধা: দ্রুত ছাড়পত্রের জন্য অন–সাইটে কাস্টমস অফিস, যা টার্মিনালটিকে একটি সত্যিকারের ‘শুষ্ক বন্দরে’ পরিণত করে।
আন্তঃমাধ্যম সংযোগ: প্রতিটি আইসিটি–র জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও যানজটমুক্ত সড়ক/রেল সংযোগ থাকা আবশ্যক। একটি কন্টেনার যদি টার্মিনালে ট্রাকের সারিতে ২ দিন অপেক্ষা করে, তবে বার্জের ৩ দিনের সুবিধাটি নষ্ট হয়ে যায়।
অর্থায়নের প্রতিবন্ধকতা:
একটি আধুনিক ৮০–টিইইউ স্ব–চালিত বার্জের দাম ১.৫ থেকে ২.৫ মিলিয়ন ডলার হতে পারে। এই উচ্চ পুঁজি বিনিয়োগ, এবং এর সাথে অনুভূত পরিচালনাগত ঝুঁকি (যেমন পলি জমা হওয়া), বেসরকারি অপারেটরদের জন্য একটি প্রধান বাধা।
সরকারকে কেবল নিয়ন্ত্রক হিসেবে না থেকে ঝুঁকি হ্রাসকারী এবং বাজার সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। অর্থায়ন সহজ করার জন্য এখানে একটি বহুমুখী কৌশল তুলে ধরা হলো:
১. একটি সহায়ক নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা
দীর্ঘমেয়াদী চার্টার গ্যারান্টি: সরকারি সংস্থাগুলো (যেমন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ – বিআইডব্লিউটিএ) প্রধান গ্রাহক হিসেবে কাজ করতে পারে, এবং সরকারিভাবে কেনা পণ্য বা বন্দরগামী পণ্য পরিবহনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের (যেমন ৫–৭ বছর) জন্য বার্জের ধারণক্ষমতা চার্টার করার গ্যারান্টি দিতে পারে। এই নিশ্চিত রাজস্ব প্রবাহ প্রকল্পগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জন্য আরও উপযুক্ত করে তোলে।
ক্যাবোটেজ নীতির পরিমার্জন: দেশীয় কন্টেনার পরিবহনকে জাতীয় পতাকাবাহী জাহাজের জন্য সংরক্ষিত রেখে একটি সুরক্ষিত ক্যাবোটেজ নীতি বাস্তবায়ন স্থানীয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে, তবে শর্ত থাকে যে দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য এর সাথে সুস্পষ্ট কর্মক্ষমতার মানদণ্ড যুক্ত থাকতে হবে।
২. প্রত্যক্ষ আর্থিক উপকরণ ও প্রণোদনা
স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা: বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্প চালু করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ১,০০০ কোটি টাকার একটি তহবিল থেকে সবুজ অভ্যন্তরীণ নৌযান নির্মাণের জন্য ৭–৮% সুদে ঋণ প্রদান করা যেতে পারে, যা বাজারের প্রচলিত হারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
মূলধন ও সুদ ভর্তুকি: অনুমোদিত, শক্তি–সাশ্রয়ী বার্জ ডিজাইনের নির্মাণ ব্যয়ের উপর সরাসরি ২০–২৫% মূলধন ভর্তুকি প্রদান করা। এছাড়াও, পরিচালনার প্রথম ৫–৭ বছরের জন্য ঋণের সুদের একটি অংশে ভর্তুকি দেওয়া।
কর ও শুল্ক মওকুফ: দেশীয় কন্টেনার বাণিজ্যের জন্য জাহাজ নির্মাণের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত জাহাজ নির্মাণ ইস্পাত, ইঞ্জিন, নেভিগেশন সরঞ্জাম এবং কন্টেনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম আমদানির উপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফ করা।
৩. সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) এবং ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং উৎসাহিত করা
পিপিপি–র মাধ্যমে টার্মিনাল উন্নয়ন: অভ্যন্তরীণ কন্টেনার টার্মিনাল (আইসিটি) বিকাশের জন্য পিপিপি মডেল ব্যবহার করা, যেখানে সরকার জমি এবং মৌলিক জেটি সরবরাহ করবে এবং একটি বেসরকারি অংশীদার ক্রেন, ইয়ার্ড এবং সফটওয়্যারের জন্য অর্থায়ন ও পরিচালনা করবে। এটি টার্মিনাল বিনিয়োগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং (ভিজিএফ): প্রথম সারির অগ্রণী অপারেটরদের জন্য, সরকার এককালীন ভিজিএফ অনুদান প্রদান করতে পারে প্রকল্পের ব্যয়ের একটি অংশ মেটানোর জন্য, যেখানে আর্থিক মুনাফা সামান্য হলেও সামাজিক–অর্থনৈতিক সুবিধা (মহাসড়কে যানজট হ্রাস) অনেক বেশি।
৪. বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করা
সার্বভৌম গ্যারান্টি: বড়, কৌশলগত বার্জ–ফ্লিট প্রকল্পগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের আংশিক সার্বভৌম গ্যারান্টি প্রদান করলে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট হবে এবং ঋণের খরচ কমবে।
নিবেদিত বাস্তবায়ন ইউনিট: দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে, ড্রেজিং প্রতিশ্রুতি সমন্বয় করতে এবং বিনিয়োগকারীদের আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলো সহজভাবে পার হতে সহায়তা করার জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি একক–জানালার ম্যান্ডেটসহ একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিট (পিআইইউ) স্থাপন করা।
এক নতুন অর্থনৈতিক স্রোতে যাত্রা শুরু
একটি অভ্যন্তরীণ নদী কন্টেনার নেটওয়ার্কের উন্নয়ন একটি জটিল কিন্তু সমাধানযোগ্য সমীকরণ। এর জন্য আধুনিক, আন্তঃমোডাল টার্মিনালগুলোর মধ্যে একটি হাব–অ্যান্ড–স্পোক লজিস্টিক মডেলের অধীনে বিশেষায়িত, অগভীর ড্রাফটের নৌযানের প্রয়োজন। এই পুরো ইকোসিস্টেমের অনুঘটক হলো উদ্ভাবনী, সরকার–নেতৃত্বাধীন অর্থায়ন, যা একটি উচ্চ–ঝুঁকিপূর্ণ মূলধনী উদ্যোগকে একটি আকর্ষণীয়, ব্যাংকযোগ্য প্রস্তাবে রূপান্তরিত করে।
বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধা, ভর্তুকি, গ্যারান্টি এবং স্মার্ট পিপিপি মডেলের সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার প্রয়োজনীয় বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ করতে পারে। এর ফলস্বরূপ দেশের লজিস্টিকস ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে: ব্যবসার জন্য খরচ কমবে, মহাসড়কের যানজট কমবে এবং একটি সবুজ, আরও স্থিতিস্থাপক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে যা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ তার নদীগুলোকে পুরোপুরি কাজে লাগাবে। অর্থনৈতিক যুক্তির স্রোত জলপথের দিকে ঘুরছে; সঠিক নৌযান এবং সঠিক আর্থিক দিকনির্দেশনা থাকলে বাংলাদেশ সফলভাবে এই পথ পাড়ি দিতে পারবে।












