বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের গবেষণা ও উচ্চতর ডিগ্রি : জ্ঞান সৃজন নাকি পেশাগত বাধ্যবাধকতা?

আলমগীর মোহাম্মদ | সোমবার , ১৬ মার্চ, ২০২৬ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রধান তিনটি দায়িত্ব হলো শিক্ষাদান, জ্ঞান সৃজন বা গবেষণা এবং জনসেবা। বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন এবং গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের মূল লক্ষ্য নিয়ে একাডেমিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই গবেষণাগুলো কি সত্যিই নতুন কোনো জ্ঞান যোগ করছে, নাকি এগুলো স্রেফ পদোন্নতি আর ইনক্রিমেন্টের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? এই আলোচনাটি বর্তমানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড নির্মিত হয় তার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গবেষণার মানের ওপর ভিত্তি করে। আদর্শগতভাবে একজন শিক্ষকের গবেষণার পেছনে প্রধান অনুপ্রেরণা হওয়া উচিত একাডেমিক দায়বদ্ধতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক চরিত্রই হলো এটি একটি ‘নলেজ হাব’ হিসেবে কাজ করবে, যেখানে শিক্ষকগণ বিদ্যমান সমস্যার সমাধান খুঁজবেন অথবা তাত্ত্বিক জ্ঞানের দিগন্ত প্রসারিত করবেন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই মহৎ উদ্দেশ্যের সমান্তরালে পেশাগত উন্নয়নের বাধ্যবাধকতা একটি বিশাল ফ্যাক্টর হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রমোশন বা পদোন্নতির কাঠামোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রকাশনা এবং উচ্চতর ডিগ্রি। সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক হওয়ার পথে প্রকাশনা একটি অপরিহার্য ‘চেক লিস্ট’ মাত্র। সমস্যাটি প্রকট হয় তখনই, যখন লক্ষ্যটি ‘জ্ঞান সৃজন’ থেকে বিচ্যুত হয়ে কেবল ‘পদোন্নতি’র সিঁড়িতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার কোটা পূরণ হয়ে গেলে শিক্ষকদের মধ্যে গবেষণার স্পৃহা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যা একজন আজীবন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কাম্য নয়।

পিএইচডি ডিগ্রিকে বিশ্বজুড়ে দেখা হয় স্বাধীনভাবে গবেষণা করার সক্ষমতা অর্জনের একটি চূড়ান্ত সনদ হিসেবে। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই একে দেখা হয় একটি অলঙ্কার বা সামাজিক মর্যাদা লাভের মাধ্যম হিসেবে। জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী পিএইচডি ধারী শিক্ষকদের অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। এটি শিক্ষকদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হওয়ার কথা থাকলেও, এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার গভীরতা বা বিষয়বস্তুর গুরুত্বের চেয়ে ‘তাড়াতাড়ি ডিগ্রি শেষ করা’ বেশি প্রাধান্য পায়। এর ফলে দেশে ও বিদেশে অনেক নিম্নমানের বা ‘প্রেডিটরি’ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেখানে গবেষণার মান যাচাইয়ের চেয়ে ফি পরিশোধ এবং নামমাত্র থিসিস জমা দেওয়াকেই বড় করে দেখা হয়। যখন একজন শিক্ষক এমন দায়সারা গোছের গবেষণার মাধ্যমে ডক্টরেট লাভ করেন, তখন তার নামের আগে একটি ‘ডক্টর’ পদবী যুক্ত হলেও সেটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে কোনো অবদান রাখতে পারে না। এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক মানদণ্ডকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে আমাদের বিদ্যমান আর্থসামাজিক এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলোও বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কেবল শিক্ষকদের সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করলে পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে উঠবে না। একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার জন্য যে পরিমাণ ল্যাব সুবিধা, ফিল্ড ওয়ার্কের সুযোগ এবং হালনাগাদ ডাটাবেস অ্যাক্সেস প্রয়োজন, আমাদের অধিকাংশ পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চরম অভাব রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দের পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ কম। জিডিপির অত্যন্ত সামান্য অংশ গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা দিয়ে মৌলিক বা যুগান্তকারী কোনো গবেষণা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। ফলে শিক্ষকরা অনেক সময় চাইলেও বড় পরিসরের কোনো কাজ হাতে নিতে পারেন না এবং ছোটখাটো ডাটা বিশ্লেষণ বা তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যেই তাদের প্রকাশনাকে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হন। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং প্রশাসনিক ব্যস্ততাও একটি বড় বাধা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব এতটাই প্রবল যে, অনেক মেধাবী শিক্ষক গবেষণার টেবিলে সময় দেওয়ার বদলে প্রশাসনিক পদ দখল বা রাজনৈতিক লবিংয়ে বেশি সময় ব্যয় করেন। যখন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পদোন্নতি বা প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে গবেষণার চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, তখন জ্ঞানচর্চার পরিবেশটি স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়ে পড়ে।

রিওয়ার্ড সিস্টেম বা পুরস্কার প্রদানের পদ্ধতির ত্রুটিও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। আমাদের বর্তমান সিস্টেমে গবেষণার ‘কোয়ালিটি’ বা মানের চেয়ে ‘কোয়ান্টিটি’ বা সংখ্যাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন শিক্ষক যদি একটি উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর সম্পন্ন নামী আন্তর্জাতিক জার্নালে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে তিনি যে সুবিধা পান; অন্য একজন শিক্ষক যদি কোনো নামসর্বস্ব লোকাল জার্নালে নামমাত্র পরিশ্রমে তিনটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, তবে তিনিই বেশি সুবিধা পান। এই ব্যবস্থার ফলে শিক্ষকরা কষ্টসাধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার চেয়ে সহজ ও দ্রুত প্রকাশযোগ্য প্রবন্ধের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন। এর একটি ভয়াবহ ফলাফল হলো একাডেমিক ইথিক্স বা নৈতিকতার অবক্ষয় এবং প্লেজিয়ারিজম বা চৌর্যবৃত্তির বিস্তার। সামপ্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের গবেষণায় অন্যের লেখা চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ইন্টারনেটের যুগে অন্যের গবেষণা হুবহু কপি করা বা সামান্য পরিবর্তন করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা শিক্ষক সমাজের ভাবমূর্তিকে জনসাধারণের কাছে ক্ষুণ্ন করেছে। এই চৌর্যবৃত্তি মূলত দ্রুত পদোন্নতির অসুস্থ প্রতিযোগিতারই একটি বিষময় ফল।

তবে এই মুদ্রার একটি উজ্জ্বল পিঠও রয়েছে। এতসব সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের অনেক শিক্ষক আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ রাখছেন। বিশেষ করে কৃষি গবেষণা, জলবায়ু পরিবর্তন, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষকদের অর্জন নেহাত কম নয়। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং গ্লোবাল কোলাবরেশনের সুযোগ বাড়ার কারণে এখন অনেক শিক্ষক দেশের সীমাবদ্ধ ল্যাব সুবিধার বাইরেও বিদেশের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথভাবে গবেষণা করছেন। এতে উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মানের ফান্ডিং পাওয়া সহজ হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেক শিক্ষক যারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোতে যাচ্ছেন, তারা দেশে ফিরে গবেষণার একটি নতুন ও স্বচ্ছ সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তারা গবেষণার ‘সাইটেশন’ এবং ‘এইচইনডেক্স’ এর গুরুত্ব বুঝতে পারছেন, যা আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃত অর্থে গবেষণার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে খোলনলচে বদলে ফেলা জরুরি। শুধুমাত্র পদোন্নতির জন্য প্রবন্ধ প্রকাশের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে গবেষণার মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রবন্ধের সংখ্যা না দেখে সেই প্রবন্ধগুলো কতবার অন্য গবেষকরা ব্যবহার করেছেন (সাইটেশন) এবং জার্নালের মান কেমন, তা কঠোরভাবে যাচাই করা উচিত। একই সাথে একাডেমিক চৌর্যবৃত্তি বা প্লেজিয়ারিজম রোধে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী সফটওয়্যার এবং একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। যদি কেউ অনৈতিক উপায়ে ডিগ্রি অর্জন বা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, তবে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণাকে জনপ্রিয় এবং কার্যকর করতে ‘ইন্ডাস্ট্রিএকাডেমিয়া লিংকেজ’ বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয় ঘটানো এখন সময়ের দাবি। দেশের শিল্প খাতের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা পরিচালনা করে, তবে একদিকে যেমন ফান্ডিংয়ের সমস্যা দূর হবে, অন্যদিকে গবেষণার বাস্তব প্রয়োগও নিশ্চিত হবে।

পরিশেষে বলা যায়, পিএইচডি বা প্রকাশনা কেবল একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের অংশ নয়, এটি একটি জাতীয় সম্পদ। শিক্ষকরা যখন শুধুমাত্র প্রমোশনের জন্য গবেষণা করেন, তখন তারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষা করেন ঠিকই, কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে পড়ি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মনে রাখতে হবে যে, তারা সমাজের শ্রেষ্ঠতম অংশ এবং তাদের প্রতিটি আবিষ্কার বা চিন্তার প্রতিফলন ঘটে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। রাষ্ট্রকেও গবেষণাকে বিলাসিতা মনে না করে একে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত গবেষণাগার, ডাটাবেস এবং জীবনযাত্রার সম্মানজনক মান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা রুটিরুজির চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে নিবিষ্ট মনে জ্ঞান সাধনা করতে পারেন। শিক্ষকদের নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার সমন্বয় ঘটলেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বিশ্বমানের জ্ঞান সৃজন সম্ভব হবে। ‘প্রকাশ করো নতুবা বিলীন হও’এই স্লোগানটি যেন কেবল ভয়ের বা বাধ্যবাধকতার না হয়ে আনন্দের সাথে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রেরণায় পরিণত হয়, সেটাই আমাদের কাম্য। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের গবেষণার লক্ষ্য হতে হবে কেবলই সত্যের অনুসন্ধান এবং মানবজাতির কল্যাণ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, বাইউস্ট। অনুবাদক ও অনুবাদ সম্পাদক, এনসিটিবি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলাইলাতুল কদর
পরবর্তী নিবন্ধলাইলাতুল কদর মানবজাতির জন্যে মহিমান্বিত রজনী