দেশের প্রথম রেলওয়ে স্টেশন জগতিকে এখন শুটিং স্পট বলা যায়, কেননা জানতে পারলাম সেখানে নাকি মাসের মধ্যে ৫/৬ দিন নানা ছবি বা নাটকের শুটিং হয়। জগতি রেলস্টেশন কুষ্টিয়া জেলায় জগতি নামক স্থানে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বরে প্রথম রেল চলাচলের মাধ্যমে চালু হয়েছিল। তাই দিনটি ঐ অঞ্চলের বাঙালিদের জন্য এক ঐতিহাসিক স্মরণীয় দিন। কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেল যোগাযোগ চালুর মাধ্যমে রেল জগতে যুক্ত হয়েছিল এই অঞ্চলের মানুষ। তাই জগতি রেলস্টেশন এক অবিস্মরণীয় স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস।
এবার কুষ্টিয়া ভ্রমণকালে আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪তম ব্যাচের আট বন্ধু যথাক্রমে জাফর ছাদেক, জামসেদ আলম, রাশেদ মনোয়ার, কবির আহমদ মজুমদার, মোঃ ইউসুফ, মোঃ লোকমান, শীলব্রত বড়ুয়া ও আমি এই ঐতিহাসিক জগতি রেলস্টেশন দেখতে যাই।
জগতি স্টেশনে পৌঁছে দেখি সেখানে শুটিং চলছে। লোকজন আমাদের স্টেশনের কাছে যেতে বারণ করেছেন। দূর থেকে দেখছি উপরে ড্রোনে রেললাইনের ছবি শ্যুট করছে নিচেও ক্যামরা আছে। তখন বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনটা হুইসেল বাজিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে গেল। অভিনেতা অভিনেত্রীসহ শেডের লোকজন শুটিংয়ের কাজে ব্যস্ত। দীর্ঘ সময় শুটিং করে ১৫–২০ মিনিট পর তা শেষ করে সব গুছিয়ে দুই মাইক্রোবাসে চড়ে তারা চলে গেলেন। এবার কাছে গিয়ে দেখছিলাম সেই ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকা জগতি রেলস্টেশনকে। জরাজীর্ণ ভঙ্গুর ভূতের বাড়ির মত লালইটের পুরানো একতলা ভবন।
ঘুরে ঘুরে দেখতে না দেখতেই শুটিংয়ের জন্য আরেকদল হাজির। তবে তারা শুটিংয়ের জন্য আমাদের সামান্য সরিয়ে দিল মাত্র । মেকআপ, শেড, শুটিং সবই দেখতেছিলাম কাছ থেকে। পরে শেডের একজনের সাথে আলাপ করে জানলান তারা একটা নাটকের চিত্রায়নে শুটিং করছে। নাটকটি ভূতের কাহিনি নিয়ে নির্মিত হচ্ছে, নাম ‘অদৃশ্যছায়া’।
এদিকে সূর্য নেমে আসছিল। আমিও কিছু ছবি তুললাম এবং সুযোগ করে স্থানীয় একজনের কাছে জগতি রেলস্টেশন সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন জগতি রেলস্টেশনের জৌলুশ ও কোলাহল তিনি দেখেননি, তবে শুনেছেন এই রেলস্টেশন নাকি কুষ্টিয়া অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ছিল। সমস্ত মালামাল ও কৃষিজাত পণ্যসামগ্রী যেমন চিনি, পাট, ধান, গম ইত্যাদি রাজশাহী, পাবনা, যশোর, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে যেত। এই যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তখন উচ্চ শিক্ষা ও চাকরির পথও সুগম হয়েছিল।
বাংলাদেশের রেলপথের ইতিহাসে কুষ্টিয়ার জগতি নামক স্থানে প্রথম স্থাপিত জগতি রেলস্টেশন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের প্রথম রেলস্টেশনের নাম কী? প্রশ্নটি এখনো বহু পরীক্ষায় আসে। জানা যায়, পূর্ব ভারত রেলওেয়ের অধীনে কলকাতা রানাঘাট হয়ে দর্শনা পর্যন্ত যে রেললাইনটি ছিল, তা ব্রিটিশরা ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা স্টেশন থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত সমপ্রসারিত করে। তৎকালীন সময়ে জগতি ছিল আধুনিক ও সুন্দর রেলস্টেশন। এটি নির্মাণ করা হয়েছিল বৃটিশ স্থাপত্যশৈলীতে। লালইটের ভবনটির সামনে বিশাল প্ল্যাটফর্ম ও টিকেট কাউন্টার এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। ছাদ কোথাও কোথাও ধসে পড়েছে, দরজাজানালার কাচ ভেঙে গেছে।
ভবনের ছাদ খুব উঁচু, দূর থেকে দেখলে মনে হবে দ্বিতল ভবন। পুরানো কাঠের দরজাজানালা, রেলিং, রুমগুলো সেই প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করছে। স্টেশনে সিগন্যাল কেবিন ও কয়লা স্টোরেজের পাশাপাশি ওভারহেড ওয়াটার ট্যাংকও ছিল যাতে বাষ্পইঞ্জিনে পানি সরবরাহে ব্যবহার করা যায়।
জানা যায় জগতি রেলস্টেশন বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল। সেখান থেকে গোপনে পত্রিকা, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, বার্তা আদানপ্রদান হত। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও জগতি রেলস্টেশনের ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য। এখানে মুক্তিযোদ্ধারা পাকহানাদার বাহিনীর পথ রুদ্ধ করে দেয় এবং তাদের উপর আক্রমণ চালায়।
স্বাধীনতার পর স্টেশনটি চালু হলেও ক্রমাগতভাবে এর কার্যক্রম ও গুরুত্ব লোপ পায় ফলে যাত্রী সংখ্যা না থাকায় এর কর্মচাঞ্চল্য হারিয়ে যায়। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোগের অভাবে জগতি রেলস্টেশন এখন পরিত্যক্ত ও ধ্বংসের পথে।
এখন দেশের সেই প্রথম ঐতিহাসিক জগতি রেল স্টেশন পর্যটকরা দেখতে যায় এবং বিভিন্ন সময়ে এই রেলস্টেশনে টেলিফিল্ম ও নাটকের শুটিং হয়।
জগতি রেলস্টেশনের ঐতিহ্যের কারণে রেল কর্তৃপক্ষ যদি যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে ভবনটিকে হেরিটেজ রেল মিউজিয়াম হিসাবে গড়ে তুলে তাহলে তাতে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং একটা আয়ের পথও হতে পারে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সংগঠক।










