পবিত্র কাবা ঘর থেকে ২২ কি.মি দূরে দৃষ্টিনন্দন প্রশস্ত রাস্তা, মাঝখানে সারি সারি সবুজ গাছ দেখতে দেখতে মিনা ও মুজদালিফা পার হতেই মরুর বুকে বিশাল সবুজ চত্বর। আমাদের অতি পরিচিত নিমগাছের সাম্রাজ্য। এত নিম গাছ দেখে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সারি সারি, হাজার পেরিয়ে লাখ; এত নিমগাছ আরাফাত জুড়ে! ১০ হাত উচু উচ্চতা নিয়ে চিকন ডালে সবুজ ঘন পাতা মেলে ধরে মরুভূমিতে ছায়া বিলাচ্ছে আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশের নিমগাছ। যারা জানে না, তাদের অবাক হতে হয়। মনে প্রশ্ন জাগে, মরুর দেশে কী করে এলো এত নিমগাছ? তাও আবার এতটা ঘন সবুজ। অনুসন্ধানে জানা গেল, সালটা ছিল ১৯৭৭ ইংরেজি। বাদশাহ ফাহাদের আমন্ত্রণে সৌদি আরব যান বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আর উপহার হিসেবে সাথে নিয়ে যান বেশ কিছু নিমগাছের চারা। বাদশাহকে উপহার দেয়ার সময় বলেন, গরিব মানুষের দেশের গরিব রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে আপনার জন্য এই সামান্য উপহার। বাদশাহ ফাহাদ বহু দেশ থেকে বহু মূল্যবান উপহার পেয়েছেন; কিন্তু এমন মূল্যবান উপহার আর পাননি। আবেগে আপ্লুত বাদশাহ জড়িয়ে ধরেন রাষ্ট্রপতি জিয়াকে। তিনি বলেন, আজ থেকে সৌদি আরব ও বাংলাদেশ পরস্পর অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে অর্থ সাহায্য দিতে চান। জিয়াউর রহমান এ সময় বলেন, আমাদের দেশের মানুষ গরিব, কিন্তু তারা পরিশ্রম করতে জানে। আপনার দেশের উন্নয়ন কাজের জন্য হাজার হাজার শ্রমিক দরকার। একটি নব্য স্বাধীন মুসলিম দেশের জন্য যদি আন্তরিকভাবে সাহায্য করতে চান, তবে আমার দেশের বেকার মানুষদের কাজ দিন। বাদশাহ ফাহাদ রাজি হলেন। উন্মোচিত হলো এক নতুন দিগন্ত। সৌদি আরবে শ্রমিক রপ্তানি তখন থেকেই শুরু। আজ প্রেসিডেন্ট জিয়া নেই, আছে জিয়ার দেওয়া সেই নিমের চারাগুলো। আজ মহীরূহ হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আরবের বুকে ! ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সৌদি আরবে। মরুভূমিতে যেন টিকে গেছে বাংলাদেশের স্মৃতি উঁচু করে। আরাফাতের ময়দানে সবুজ শীতল ছায়া দিয়ে চলেছে অসংখ্য নিমগাছ। সৌদি আরবে এখন এসব গাছকে সবাই চেনে ‘জিয়া ট্রি‘ হিসেবেই। আরবিতে কেউ কেউ বলেন ‘সাজারাহতুল জিয়া’।
সৌদি সরকার যখন দেখল খেজুরগাছ নয়, নিমগাছই মরুভূমিতে শীতল ছায়া ছড়ানোর উপযোগী। এ গাছ কম পানিতে দীর্ঘ দিন টিকে থাকতে পারে, গাছের পাতায় প্রচুর পানি ধরে রাখে। বৃষ্টির জন্যও নিমগাছ যথেষ্ট সহায়ক। দেখা গেছে, যে এলাকায় নিমগাছ আছে সেখানে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে এবং মানুষের অসুখ–বিসুখও কম হচ্ছে। তখন তারা ব্যাপকভাবে নিমের চারা রোপণের কাজে হাত দেন। ১৯৮৩–৮৪ সালে সৌদি সরকার সর্বপ্রথম আরাফাত ময়দানে ব্যাপকভাবে নিমের চারা রোপণ করে। আরাফাত ময়দানে আজ তাই হাজার হাজার নিমগাছ। হাজিরা এই নিমগাছের শীতল ছায়ায় হজের সময় আরাফাত ময়দানে অবস্থান করেন। প্রচণ্ড গরমে নিমগাছের বাতাস তাদের প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। আরাফাতের ময়দানের জাবালে রহমতে (রহমতের পাহাড়) উঠে চার দিকে তাকালে দেখা যায়, পাহাড়ঘেরা বিশাল এলাকাজুড়ে শুধু নিমগাছ আর নিমগাছ। শুধু আরাফাত ময়দানে নয়, নিমগাছ এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সৌদি আরবেই। প্রশস্ত রাস্তার মাঝখানে ডিভাইডারে ও রাস্তার পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের নিম গাছ। সৌদি আরবে কৃষি বিপ্লবে যেমন সাফল্য দেখিয়েছে, তেমনি মরুর বুকে সবুজায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক।










