বাঁশখালীর শুঁটকিপল্লীতে ব্যস্ততা

দেশ-বিদেশে বাড়ছে চাহিদা

কল্যাণ বড়ুয়া, বাঁশখালী | শনিবার , ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

শীত মৌসুমে বঙ্গোপসাগরের হিমেল ও শান্ত পরিবেশে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীতে জেলেদের ব্যস্ত সময় পার হচ্ছে। সাগর থেকে আহরিত বিভিন্ন প্রজাতির কাঁচা মাছ সংগ্রহ করে তা রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করছেন জেলে ও শ্রমিকরা। এসব শুঁটকি স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি চট্টগ্রাম শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।

বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকা সরলের কাহারঘোনা, পশ্চিম মিনজীরিতলা, শীলকূপের মনকিচর, শেখেরখীল ফাড়িরমুখ, গন্ডামারা উপকূল, বাহারছড়া উপকূল ও ছনুয়া এলাকায় বর্তমানে ব্যাপক হারে মাছ শুকানোর কার্যক্রম চলছে। জালিয়াখালী বাজারের পশ্চিমাংশ জলকদর খালের কাহারঘোনা এলাকায় সারি সারি মাছ শুকানোর দৃশ্য দেখে অনেকের কাছেই এটি যেন একটি শুঁটকি মৎস্যনগরীর রূপ নিয়েছে। এই শুঁটকি পল্লীগুলোতে কয়েক শত শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পুরুষ শ্রমিকরা দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকরা ৫০০ টাকা মজুরিতে শুঁটকি শুকানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। শ্রমিকরা জানান, গত কয়েক দিনে কুয়াশা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মাছ শুকাতে কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বর্তমানে ফাইস্যা, লইট্যা, ছুরি, পোঁকা ও মাছ শুকানো হচ্ছে।

শুঁটকি পল্লীতে কর্মরত শ্রমিকদের মতে, পর্যাপ্ত রোদ থাকলে মাছ দ্রুত শুকিয়ে যায়, এতে কষ্ট ও সময় দুটোই কম লাগে। নিয়মিত রোদে ফাইস্যা মাছ দেড় থেকে দুই দিনে, পোঁকা মাছ তিন দিনে, ছুরি ও লইট্যা মাছ পাঁচ দিনে শুকিয়ে যায়। তবে বড় আকৃতির কিছু মাছ শুকাতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগে। জেলেরা দাবি করেন, বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকায় কোনো ধরনের ইউরিয়া সার, লবণ বা বিষাক্ত পাউডার মিশ্রণ ছাড়াই শুধুমাত্র রোদের তাপে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। ফলে বাঁশখালীর শুঁটকি স্বাদে ও গুণমানে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দেশের কিছু এলাকায় কাঁচা মাছের সঙ্গে ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে শুঁটকি তৈরির প্রবণতাও রয়েছে।

বাঁশখালীর শুঁটকির চাহিদা চট্টগ্রাম শহরের চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও চকবাজারের গুদাম মালিকদের কাছে ব্যাপক। এখানকার জনপ্রিয় শুঁটকির মধ্যে রয়েছে লইট্যা, ছুরি, রূপচান্দা, ফাইস্যা, মাইট্যা, কোরাল, রইস্যা, পোঁহা ও চিংড়ি। এসব শুঁটকি বর্তমানে দুবাই, কাতার, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ওমান, কুয়েত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব যোগ করছে।

তবে আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ শুকানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর সাগর উপকূলে লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ নষ্ট হয়ে যায় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এদিকে সাগরে জলদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলে ও মাঝিমাল্লারা নিরাপদে মাছ আহরণের জন্য প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। অতীতে জলদস্যুদের হামলায় বাঁশখালীর কয়েকজন জেলে আহত হয়েছেন এবং মাছ লুটের ঘটনাও ঘটেছে। জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে ইলিশ মৌসুমে জলদস্যুতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে বাঁশখালী সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌসিব উদ্দিন বলেন, বাঁশখালীর শুঁটকি সারাদেশে জনপ্রিয়। এ পেশাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সরকার মৎস্যজীবীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিচ্ছে। শুঁটকি পল্লীগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে তাদের সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজন যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিএনপির হাল ধরলেন তারেক
পরবর্তী নিবন্ধআবাসিক সংকটে ব্যাহত রাতের মাতৃসেবা