বাঁশখালীর লবণ উৎপাদন কুয়াশায় বাধাগ্রস্ত, দামে হতাশ চাষিরা

কল্যাণ বড়ুয়া, বাঁশখালী | শনিবার , ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের একমাত্র উপজেলা বাঁশখালীতেই বাণিজ্যিকভাবে লবণ উৎপাদন শুরু হলেও কুয়াশার কারণে আশানুযায়ী লবণ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন চাষিরা। বাঁশখালীর পশ্চিম পুঁইছড়ি, ছনুয়া, শেখেরখীল, গন্ডামারা, চাম্বল, ডিপুটিঘোনা, শীলকূপের পশ্চিম মনকিচর, সরল, কাথরিয়া ও খানখানাবাদ এলাকায় লবণ উৎপাদন হয়। প্রতি বছরের মতো, চলতি মৌসুমেও কয়েক হাজার লবণচাষি মাঠে কাজ চালিয়েছেন; তবে কুয়াশা এবং ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চাষিরা হতাশ, জানান তারা। আগের মৌসুমের শতশত মেট্রিক টন লবণও এখনও চাষিদের কাছে মজুদ রয়েছে।

লবণচাষিরা জানান, সাগরের লবণাক্ত পানি ব্যবহার করেই লবণ উৎপাদন করা হয়। জমি সমতল করার জন্য কাঠের রোলার ব্যবহার করা হয় এবং চারপাশে মাটির আইল দিয়ে ছোট ছোট প্লট তৈরি করা হয়। প্লটগুলো রোদে শুকানোর পর পলিথিন বিছানো হয়। জোয়ারের সময় নালা বা ইঞ্জিনচালিত শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে সাগরের পানি প্লটে প্রবেশ করানো হয়। এরপর ৪৫ দিন কড়া রোদে রাখলে পানি বাষ্পীভূত হয়ে পলিথিনের ওপর লবণ জমে ওঠে।

গ্রামে শীতের প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। এমন বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও ভোরের কুয়াশা ভেজা পিচ্ছিল মাটিতে খালি পায়ে কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকার লবণচাষিরা। অধিকাংশ চাষি দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে পারিবারিকভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিবছর অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিকে লবণ মাঠ তৈরির কাজ শুরু হয়ে উৎপাদন চলে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত। প্রায় ছয় মাস ধরে চলে এই শ্রমসাধ্য কর্মযজ্ঞ।

চাষিরা জানিয়েছেন, শীতের কুয়াশা লবণ উৎপাদনের জন্য ক্ষতিকর। উৎপাদিত লবণ পানি ঝরার পর ব্যাপারীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে এসব লবণ কারখানায় নিয়ে রিফাইনারি মেশিনে পরিশোধন শেষে বস্তা বা প্যাকেটে বাজারজাত করা হয়। উপজেলার অধিকাংশ উপকূলীয় এলাকায় মাঠের পর মাঠজুড়ে এখন পলিথিন বিছিয়ে লবণ উৎপাদনের দৃশ্য চোখে পড়ে। গন্ডামারা ইউনিয়নের বড়ঘোনা এলাকার চাষিরা জানান, বর্তমানে মণপ্রতি লবণের পাইকারি মূল্য ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। অথচ প্রতিমণ লবণে শ্রমিক খরচ পড়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এককানি জমিতে লবণ চাষে জমির লাগিয়ত বাবদ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা, পলিথিনে প্রায় ১০ হাজার টাকা এবং শ্রমিক, পানিসেচসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। চাষিরা অভিযোগ করেন, মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুবিধা থাকলেও দিনশেষে লবণচাষিরা না পান ন্যায্যমূল্য, না পান পরিশ্রমের সঠিক পারিশ্রমিক।

উত্তর পশ্চিম গন্ডামারা লবণ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেডের দায়িত্বশীল আবু আহমদ ও মো. ওসমান গণি বলেন, গত মাসে শুধু গন্ডামারা এলাকা থেকে মজুদকৃত প্রায় ৪০ হাজার মণ লবণ বিক্রি করা হয়েছে। তবে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় গন্ডামারাসরল এলাকায় এখনও ৩০ থেকে ৪০ হাজার মণ লবণ মজুদ রয়েছে। এতে চাষিরা চরম হতাশায় ভুগছেন। তিনি জানান, সমিতির আওতায় ৬ থেকে ৭ শত কানি জমিতে লবণ চাষ হলেও এখনও অনেক মাঠ পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে চাষিরা ধীরে ধীরে লবণ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

তারা আরও বলেন, একসময় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পকারখানার মালিকরা সরাসরি এলাকায় এসে লবণ ক্রয় করলেও বর্তমানে তারা আগ্রহ হারিয়েছেন। তাদের ধারণা, বাইরে থেকে আমদানিকৃত লবণ ও ইনপুট সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে দেশীয় লবণের দাম কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বিসিকের কোনো কার্যকর তৎপরতা বা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম না থাকায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। উপরন্তু শিল্পকারখানার জন্য আমদানিকৃত উদ্বৃত্ত লবণ আইন ও জনস্বাস্থ্য বিধি উপেক্ষা করে বাজারজাত হওয়ায় মাঠপর্যায়ের লবণের দরপতন এখনও অব্যাহত রয়েছে।

বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) ও লবণচাষি সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বাঁশখালী ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার একর জমিতে প্রায় ৩০ হাজার লবণচাষি লবণ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি লবণ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিসিক সূত্র জানা যায়, চলতি বছর শুধু বাঁশখালী উপজেলাতেই প্রায় ২৫ হাজার একর জমিতে লবণ উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি লবণ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরেললাইনের পাশে পড়ে ছিল মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির মরদেহ
পরবর্তী নিবন্ধকোতোয়ালীতে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ৭ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার